ন্যায্য মজুরি ও কর্মঘণ্টা, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন ও হয়রানি, সীমিত সামাজিক সুরক্ষা এবং শ্রমিক হিসেবে মর্যাদার ঘাটতি এখনো বহু গৃহকর্মীর জীবনের বাস্তবতা। তাই আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবার, নিয়োগকরী ও সমাজের মানসিকতায় পরিবর্তন না এলে গৃহকর্মীদের অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে না।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকার আলোকিতে বাংলাদেশে অক্সফ্যামের আয়োজনে ‘হ্যান্ডস দ্যট হোল্ড হোমস: রাইটস, রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব ডমেস্টিক ওয়ার্কারস’ শীর্ষক দিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
কানাডা সরকারের সহায়তায় ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত সুনীতি—নারী গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষা প্রকল্পের সাত বছরের অর্জন, শিখন, নীতিগত অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরতেই এ আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির বলেন, গৃহকর্মীসহ যে কোনো সেক্টরের শ্রমিকদের অধিকার সরকারের একার পক্ষে শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে শিশু শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে কিনা তা সরকারের একার পক্ষে মনিটর করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সমাজে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সামাজিক সুরক্ষার অভাব, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং অধিকার সম্পর্কে সীমিত সচেতনতা এখনও গৃহকর্মীদের বড় চ্যালেঞ্জ। শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। সংশোধিত শ্রম আইনের আলোকে শ্রম বিধিমালা হালনাগাদের কাজও অনেক দূর এগিয়েছে, যা এ বছরের মধ্যেই একটা রূপ পাবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, সবকিছু পরিবর্তন করলাম, কিন্তু মানসিকতা পরিবর্তন না করলে হবে না। আমার গৃহকর্মীকে আমি কেন আমার সহকর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারি না?
এসময় তিনি কর্মজীবী মায়েদের জন্য কর্মস্থল ও আবাসিক ভবনে দিবাযত্ন কেন্দ্র নিশ্চিত করা এবং গৃহকর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনার আহ্বান জানান।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ২০২৬ সালের সংশোধিত শ্রম আইনে গৃহকর্মীদের স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও তা এখনো আংশিক।
তার মতে, সুনীতি প্রকল্পের বড় অর্জন হলো গৃহকর্মীদের সংগঠিত করা এবং তাদের নিজস্ব নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা।
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, নারী গৃহকর্মীদের কোনো কিছুই পূর্ণভাবে আমরা পাইনি। এখন পর্যন্ত ২০২৬ সালে আমরা যে আইনটা পেয়েছি, সেটাও কিন্তু আংশিক স্বীকৃতি। সুতরাং একটা দীর্ঘ যাত্রা যেমন আমরা অতিক্রম করে এসেছি, ঠিক তেমনি সামনেও একটা দীর্ঘযাত্রা রয়ে গেছে।
কানাডা সরকারের অ্যাক্টিং হেড অব করোপরেশন জেন পালমার বলেন, সুনীতি প্রকল্প গৃহকর্মীদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং সমষ্টিগতভাবে সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমরা আশা করি ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের কাজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক নিরান রামজুথান বলেন, গৃহকর্মীদের অদৃশ্য ও অনানুষ্ঠানিক অবস্থান থেকে আইনি সুরক্ষার কাঠামোয় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, গৃহকর্মীদের নিয়ে সমাজের প্রচলিত মানসিকতায় এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি এবং শিশুরা যেন ভবিষ্যতে গৃহকর্মে না আসে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের ইন্টেরিম কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিল পান্ত বলেন, আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি গৃহকর্মীদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অধিবেশনে গৃহকর্মীদের জাতীয় ফোরামের সভাপতি জাকিয়া সুলতানা বক্তব্য দেন। প্রকল্পের যাত্রা, অর্জন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ তুলে ধরেন বাংলাদেশে অক্সফ্যামের কর্মসূচি পরিচালক মাহমুদা সুলতানা।অনুষ্ঠানে সুনীতি প্রকল্পের সাত বছরের অভিজ্ঞতা, তথ্য-প্রমাণ, নীতিগত বিশ্লেষণ এবং গৃহকর্মীদের জীবনের দশটি গল্প নিয়ে প্রস্তুত প্রধান প্রকাশনার আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
পরবর্তী অধিবেশনে প্রকল্পের চূড়ান্ত মূল্যায়নের ফলাফল ও শিক্ষা উপস্থাপন করেণ অক্সফ্যাম কানাডার পুষ্পিতা সাহা। সঞ্চালনা করেন অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের তারেক আজিজ। এতে জানানো হয়, গৃহকর্মীদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা ২০১৯ সালে ছিল ১২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে ৭৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আর মজুরি নিয়ে দর-কষাকষির সক্ষমতা ২৩ শতাংশ থেকে ৬১ শতাংশে এবং লিখিত চুক্তির হার ৮ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ শতাংশ গৃহকর্মী বেশি মজুরি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন; তাদের মাসিক আয় গড়ে ৮৫০ টাকা বেড়েছে।
দুপুরের পর “স্বীকৃতি থেকে নিরাপদ ভবিষ্যৎ: অধিকার, শ্রমিক নেতৃত্ব, মর্যাদাপূর্ণ কাজ ও অংশীদারত্ব” শীর্ষক আলোচনায় সংশোধিত শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা, দক্ষতার স্বীকৃতি, নিয়োগকর্তার জবাবদিহি এবং গৃহকর্মীদের নিজস্ব নেতৃত্ব শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। দিনের শেষ অধিবেশন “সহনশীলতার কণ্ঠ”-এ গৃহকর্মীদের গল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়।









