সরকার এখনও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য কার্যকর কোনও গ্রেডিং বা শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা চালু করতে পারেনি। ফলে বিদেশে চাকরির জন্য টাকা দেওয়ার আগে কোনও রিক্রুটারকে যাচাই করার সরকারি উপায় পাচ্ছেন না কর্মীরা। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ‘ন্যায্য ও নৈতিক নিয়োগ: জবাবদিহিমূলক সাব-এজেন্ট’ শীর্ষক মাইগ্রেশন সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর এই ঘাটতির কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, নিজের নির্বাচনি এলাকার মানুষকেও তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কোনও রিক্রুটিং এজেন্সির সুপারিশ করতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু এজেন্সি শ্রেণিবিন্যাসে তেমন অগ্রগতি হয়নি বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী নুর।
এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এবং এফসিডিওর অর্থায়নে, উইটনেস ফাউন্ডেশন পেরি কর্মসূচির আওতায় ঢাকার হলিডে ইন ঢাকা সিটি সেন্টারে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো তাদের সাব-এজেন্টদের তথ্য জমা দেওয়ার জন্য যে সফটওয়্যার সুবিধা দরকার, তা এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। সেটা তৈরি হলে এজেন্সিগুলোকে তাদের প্রতিনিধিদের তালিকা জমা দিতে হবে, যা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে, যাতে কর্মীরা টাকা দেওয়ার আগে তাদের পরিচয় যাচাই করতে পারেন।
তিনি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোকে অভিবাসন তথ্য ও কর্মী ডাটাবেসের হাব হিসেবে এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোকে গ্রামের সম্ভাব্য অভিবাসীদের কাছে পৌঁছানোর প্রস্তাবে স্বাগত জানান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কোর্সগুলো বিদেশের চাহিদার সঙ্গে মেলে কিনা এবং কতজন প্রশিক্ষণার্থী বিদেশে চাকরি পাচ্ছেন, তার হিসাব রাখা হয় কি না।
সংলাপে তথ্য উপস্থাপন করে উইটনেস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ সিদ্দিকী বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরে বিদেশে কর্মসংস্থান ৩২ শতাংশ কমে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭৯ জনে নেমেছে। গত বছর একই সময়ে যা ছিল ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯২ জন। যদিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
অভিবাসীদের নিয়োগ খরচ তুলতে প্রায় ১৪ মাস লাগে বলে জানান তিনি।
তার উপস্থাপনায় ১৪১৪টি অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়, যার মধ্যে ৭৮৫টির সমাধান হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের ৬.৪৮ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
পারভেজ বলেন, কর্মীদের কাছে প্রায়ই অর্থ পরিশোধের রসিদ বা প্রমাণ থাকে না, ফলে মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা কঠিন হয়। তিনি একটি মাত্র বিদেশি শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়েও সতর্ক করেন বলেন, চলতি বছর জানুয়ারি-মে মাসে মোট গমনের ৭৩ শতাংশই ছিল সৌদি আরবে।
ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন সৈয়দ সাইফুল হক অভিযোগ করেন, এজেন্সিগুলো রসিদ ছাড়াই বড় অঙ্কের টাকা নেয়, আর মধ্যস্থতাকারীরা অর্থ লেনদেন সামলায় ফলে জবাবদিহি অস্পষ্ট থাকে। অনেক এজেন্সি ভিসা বেচাকেনা করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব কাজী আবুল কালাম বলেন, ২০২০ সালে চালু হওয়া রিক্রুটিং এজেন্সি শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা অকার্যকর রয়ে গেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এজেন্সিগুলো বিদেশে প্রতিনিধির বদলে ভিসা মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করে এবং কেন কিছু কর্মী তিন মাসের মধ্যে ফিরে আসে বা গিয়ে দেখে প্রতিশ্রুত চাকরি নেই।
সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজের আইনজীবী ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, প্রয়োগ ছাড়া সাব-এজেন্টদের আইনি স্বীকৃতি দিয়ে লাভ হবে না। ২০২৩ সালের আইন সংশোধন ও ২০২৫ সালের বিধিমালার প্রসঙ্গ টেনে তিনি নিবন্ধিত মধ্যস্থতাকারীদের হালনাগাদ তালিকা এবং সম্মতি পর্যবেক্ষণে বিএমইটির ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রস্তাব দেন।
আইএলও-এর ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার রেহনুমা সালাম খান বলেন, গভীর সমস্যাটি হলো সুশাসন। বিদেশে কতজন কর্মী পাঠানো হলো তা দিয়ে সাফল্য না মেপে তাদের দক্ষতা, কর্মপরিবেশ ও সুরক্ষা এবং অভিবাসীদের অভিযোগ কমছে কিনা তা মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি।
বায়রার সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব ফখরুল ইসলাম সাব এজেন্ট ছাড়াই শুধুমাত্র রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কার্যকর পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানো সম্ভব বলে জানান।
বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় চাকরিপ্রার্থীরা বিপজ্জনক অনিয়মিত পথে যাচ্ছে। তিনি শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ, চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং পাচারকারী নেটওয়ার্কের শাস্তির আহ্বান জানান।
আইওএম’র আহমেদ আজিজ অভিবাসন প্রক্রিয়া জুড়ে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ, সহজলভ্য অভিযোগ ব্যবস্থা এবং গ্লোবাল কমপ্যাক্ট ফর মাইগ্রেশনের জন্য বাংলাদেশের জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অধীনে পরিমাপযোগ্য অগ্রগতির আহ্বান জানান।
মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমাদুল হক বলেন, অভিবাসন ব্যয় পরীক্ষা করতে একটি কমিটি কাজ করছে। তিনি আরও সতর্ক করেন যে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর চাপ ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিয়োগ সীমিত করার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তোলে।