নিবন্ধন করে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ কী সম্ভব?

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। সড়কে চলাচলকারী অটোরিকশার সংখ্যা নির্ধারণ, অনিবন্ধিত যান চলাচল বন্ধ, জোনভিত্তিক চলাচল ও অনুমোদিত নকশায় যানবাহন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে আটটি জোনে ভাগ করে আলাদা রঙের অটোরিকশা চালানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু যানবাহনের নিবন্ধন দিয়ে কতটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, মালিকানা এবং যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারণ ছাড়া এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

চালকদের কেউ কেউ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি হলেও এটিই যথেষ্ট নয়। চালকের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, মালিকানা ও যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারণ একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বিদ্যমান অনিয়মই নতুন আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে যেতে পারে।

নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু, কী আছে বিধিমালায়

গত ২ নভেম্বর থেকে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ১ নভেম্বর সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এ ঘোষণা দেন। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ সংশোধনের মাধ্যমে ই-রিকশা নিবন্ধনের আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। আইনটির ১২০ ধারায় এ-সংক্রান্ত বিধান যুক্ত করার পর বিধিমালা প্রণয়ন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে তা গেজেটে প্রকাশ করা হয়।

বিধিমালা অনুযায়ী, দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা। এক বছর পর ফিটনেস পরীক্ষা শেষে নবায়ন ফি চার হাজার টাকা। চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা। একটি ই-রিকশা সর্বোচ্চ ১২ বছর চলতে পারবে।  

ই-রিকশা উৎপাদন তদারকি ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বুয়েটের অনুমোদিত নকশায় নতুন ই-রিকশা তৈরি এবং চলমান ই-রিকশা পরিবর্তন করতে হবে। নিবন্ধন ছাড়া চলাচল, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার ও ট্রাফিক সংকেত অমান্য করাসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য ব্যবস্থার বিধান রয়েছে।

ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিটিতে চারটি করে আট জোনে আলাদা রঙের অটোরিকশা চলবে। এক জোনের অটোরিকশা অন্য জোনে চলতে পারবে না। যানজট বিবেচনায় জোনপ্রতি সংখ্যা নির্ধারণের কথা থাকলেও মোট অটোরিকশার সীমা এখনো ঠিক হয়নি। প্রথম পর্যায়ে শুধু যানবাহনের নিবন্ধন হবে; পরে চালকদের লাইসেন্স এবং কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

নিবন্ধনে নিয়ন্ত্রণ আসবে, তবে আইনে দুর্বলতা

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে নিবন্ধন প্রক্রিয়া থাকতে হবে। নিবন্ধনের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, এর বিকল্প নেই। কিন্তু নিবন্ধন প্রক্রিয়ার আইনি ব্যবস্থাপনায় অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে।’ 

তিনি বলেন, ‘একটি এনআইডি বিপরীতে পাঁচটি অটোরিকশা নিবন্ধনের যে বিধান করা হয়েছে, সেটি কেন করা হলো? এর ফলে সমাজের সচ্ছল ব্যক্তিরা পরিবারের সদস্য ও পরিচিতজনদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে অনেক অটোরিকশা নিবন্ধন করাবেন। পরে সেগুলো মহাজনী কায়দায় পরিচালনা করবেন। অটোরিকশার চালকরা চালকই থাকবেন, আর বর্তমানে যারা মালিক আছেন, তারাই মালিক থাকবেন।’ 

সাইদুর রহমানের মতে, চালক নিজের এনআইডির বিপরীতে অটোরিকশা নিবন্ধন করে মালিক হবেন। আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলে সরকার ঋণ দিতে পারে। চালক প্রতিদিনের ভাড়ার টাকা দিয়ে কিস্তি পরিশোধ করে একপর্যায়ে গাড়ির মালিক হতে পারতেন। আইনে এমন কাঠামো থাকা প্রয়োজন ছিল।

তিনি বলেন, ‘এখন অটোরিকশার নিবন্ধন হবে, অথচ চালকদের নিবন্ধনের বিধান নেই। অর্থাৎ যেকোনও ব্যক্তি প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্স ছাড়াই অটোরিকশা চালাতে পারবেন। কৃষিকাজ, ইটভাটা, জোগালের কাজ কিংবা নির্মাণশ্রমে যুক্ত কেউও এ পেশায় আসতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোনও আইনি বাধা নেই। অর্থাৎ বিদ্যমান অনিয়মই আইনি প্রক্রিয়ায় বৈধতা পাবে।

প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স পরে কেন

সরকার বলছে, নিবন্ধন কার্যক্রমের পর চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স দেওয়া হবে। কিন্তু এটি পরে শুরু করার বিষয় নয় বলে মনে করেন সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, সমস্যা কখনও বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। শুরুতেই সমাধান করা গেলে পরবর্তী সময়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয় না। সমস্যাটি চরম নৈরাজ্যের দিকে যাওয়ার পর লাগাম টানার চেষ্টা করা হচ্ছে। এখনই প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের ব্যবস্থা করতে সমস্যা কোথায়?

একটি এনআইডির বিপরীতে পাঁচটি অটোরিকশা নিবন্ধনের সুযোগের অপব্যবহারের আশঙ্কা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একটি পরিবারের পাঁচজনের পাঁচটি এনআইডি থাকলে ২৫টি অটোরিকশা নেওয়া সম্ভব।’ তার ভাষ্য, ‘আমার পরিবারের পাঁচজনের পাঁচটি এনআইডি থাকলে আমি ২৫টি অটোরিকশা নিতে পারবো। সেগুলো দিয়ে হয়তো প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টাকা আয় করতে পারবো।’ 

তার মতে, এ সুযোগ বিত্তবানদের হাতে গেলে প্রকৃত চালকদের জীবনমানের উন্নতি হবে না; বরং অটোরিকশা ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি হবে। বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচল শুরু হলে চালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা কঠিন হবে।

জোনভিত্তিক চলাচল কতটা বাস্তবসম্মত

আট জোনে আট রঙের অটোরিকশা চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে সাইদুর রহমান বলেন, ‘বাস্তবায়নে সমস্যা রয়েছে। মোহাম্মদপুরের অটোরিকশায় ধানমন্ডি গেলে, ধানমন্ডি অন্য জোনে পড়লে সেটি সেখানে ঢুকতে পারবে না। তখন যাত্রী কীভাবে যাবেন? রাজধানী কি সেভাবে গড়ে উঠেছে, পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট কি তৈরি হয়েছে? এসব বাস্তবায়নে প্রস্তুতি প্রয়োজন।’ 

তার মতে, প্রস্তাবগুলো গবেষণাভিত্তিক নয়; মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত সমীক্ষা হয়নি। নগর পরিকল্পনাবিদ, যানজট বিশেষজ্ঞ, সামাজিক গবেষক, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ ও সরকারের প্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।

সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে জোনভিত্তিক সীমা জরুরি 

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধনের বিকল্প নেই। নিবন্ধন থাকলে সংখ্যা জানা যাবে এবং অনিবন্ধিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা সম্ভব হবে। প্রতিটি অটোরিকশাকে কিউআর কোডের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে, যাতে ঢাকা শহরে কতটি এবং কোন ধরনের অটোরিকশা চলছে, তা জানা যায়।’ 

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি জোনের জন্য অবশ্যই সীমা থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যা, সড়কের ধরন এবং ছোট সড়কের পরিমাণ বিবেচনায় নিবন্ধনের সংখ্যা নির্ধারণ করা যেতে পারে। সবাইকে নিবন্ধন দিলে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।’ 

এক জোনের অটোরিকশা অন্য জোনে চলতে না পারলে যাত্রীদের ভোগান্তি হবে কি না— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য অটোরিকশার ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে হলে যাত্রীকে একাধিক অটোরিকশা পরিবর্তন করতে হবে; এতে খরচও বাড়বে।’ 

প্যাডেলচালিত রিকশায় মোটর সংযোজন করে তৈরি অটোরিকশা বুয়েটের নকশা অনুযায়ী উন্নীত করা সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্যাডেল রিকশা ও বুয়েটের নকশায় তৈরি অটোরিকশার কাঠামো আলাদা।’ আগে প্যাডেল রিকশায় মোটর সংযোজন করে যেসব অটোরিকশা তৈরি হয়েছে, সেগুলো নির্ধারিত নকশায় উন্নীত করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন না।

চালকদের সমর্থন, তবে অভিজ্ঞতার প্রশ্ন

অটোরিকশাচালক মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘নিবন্ধন হলে চালকদের সুবিধা হবে। বর্তমানে নিবন্ধন ছাড়াই যে যার মতো অটোরিকশা কিনছেন ও চালাচ্ছেন।’ 

তিনি বলেন, ‘আমি সরকারি আইনকানুন মেনেই গাড়ি (অটোরিকশা) চালাই। আমি পায়ের রিকশা চালিয়েছি। তখনও আইন মেনেই গাড়ি চালিয়েছি। কিন্তু দেখা যায়, ১০০ জন চালকের মধ্যে ৯০ জনই আইন মানেন না। কি আর বলবো... আমি আমার জায়গা থেকে আইন মেনেই চলি। আর আইন মেনে চললে সবারই সুবিধা হবে।’ 

আরেক চালক মো. আলী হোসেন বলেন, ‘অ্যাক্সিডেন্ট কমাতে হলে নিবন্ধন করা দরকার আছে। নিবন্ধন হলে রিকশা কমবে তখন অ্যাক্সিডেন্টও কমবে।’  

তিনি বলেন, ‘ভালো হয়েছে এই সিদ্ধান্ত। আর গাড়ি (অটোরিকশা) যার নামে থাকবে, তারই চালানো উচিত। অনেক সময় একজন চালক গাড়ি চালিয়ে বাসায় থাকলে অন্য কেউ গাড়িটি নিয়ে বের হন। কিন্তু তিনি নিয়মিত গাড়ি চালান না। ফলে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা ও নিয়মকানুন সম্পর্কে না বুঝেই নিজের ইচ্ছামতো চালান। এ কারণেই এক্সিডেন্ট হয়।’ 

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিবন্ধন প্রয়োজনীয় হলেও একে একমাত্র সমাধান ভাবার সুযোগ নেই। যানবাহনের সংখ্যা, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, মালিকানা এবং জোনভিত্তিক চলাচলের বাস্তবতা একসঙ্গে বিবেচনায় না নিলে উদ্যোগটি প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।