রবিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৮টায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) মর্গে পাঠায়। সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে পরিবারের লোকজন সেখানে লাশটি শনাক্ত করেন। ঋদ্ধ ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিল। তার বাবার নাম নীলমনি ভট্টাচার্য।
ঋদ্ধকে যখন চিকিৎসকরা কাটাছেঁড়া করছিলেন, তখন মা তৃষ্ণা সরকার মর্গের সামনে বসে কাঁদছিলেন, ‘বাবু, তুই কেন জলে গেলি, তুই কেন পানিতে নামতে গেলি।’
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ঋদ্ধের স্বজনরা ভিড় জমিয়েছেন। স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। স্বজনরা বলছেন, চোখের সামনে যে ছেলে বড় হলো, যে ছেলে এত ভালো ছবি আঁকতো, সে কেন লেকের পানিতে ডুবে মরবে? তার পেছনে কারণই বা কী?
মা তৃষ্ণা সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রবিবার দুপুরে তিনি বাসায় ছিলেন না। বাসায় ফিরে শুনেছেন দুপুরে ছেলে ভাত খেয়েছে, তারপর বিকাল সাড়ে চারটার দিকে বাসা থেকে বেরিয়েছে। কিন্তু, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত, ভেবেছি ছেলে বৃষ্টিতে কোথাও আটকে গেছে। ফোন করি, কিন্তু ফোনটাও বন্ধ পাই। তখন আমার সন্দেহ হয়, ফোনটা কেন বন্ধ বাবুর! তারপর রাত ১২টার দিকে বাসাতেই মোবাইল ফোনসেটটি পেলাম। রাত যখন গভীর হচ্ছে, তখনও বাসায় না ফেরায় তার বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ৯৯৯ নম্বরে কল করে থানাগুলোতে খোঁজ নিই। কিন্তু, কেউ কোনও সন্ধান দিতে পারেননি।’
‘সন্ধ্যার সময় ধানমন্ডি লেকে তখন অনেক মানুষ থাকার কথা।’ মর্গে স্বজনরা এমন মন্তব্য করছিলেন। উত্তরও পাওয়া গেলো তাদের কাছ থেকেই। ‘কাল যে বৃষ্টি ছিল, হয়তো তেমন মানুষ ছিল না। তবে জানা গেলো, দুজন তরুণ-তরুণী সে সময় লেকের পাশে বসে ছিলেন, তারাই ঋদ্ধকে তলিয়ে যেতে দেখে চিৎকার করে লোক জড়ো করেছিল। পরে ফায়ার সার্ভিস আসে, ডুবুরি আসে। তারা সেখান থেকে উদ্ধার করে ধানমন্ডি থানায় লাশ নিয়ে যায়। পরে অজ্ঞাত হিসেবে ঋদ্ধকে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।’
ধানমন্ডি থানা ফেসবুকে ওর ছবি দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে, অথচ আমি জানিও না—এ মন্তব্য করে মায়ের দাবি, ‘এত ফেসবুকে থাকি, কিন্তু নিজের কথা আমি জানতে পারিনি। আমি সারা রাত থানায় ফোন করেছি, কেউ সন্ধান দিতে পারেনি। পরে সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরের দিকে খবর পেয়ে মর্গে এসে ঋদ্ধকে শনাক্ত করি।’
মর্গ থেকে ময়নাতদন্ত শেষে যখন ঋদ্ধকে ছায়ানটের উদ্দেশ্যে বের করা হচ্ছিল, তখন দেখা যায় সেখানে লেখা রয়েছে ‘অজ্ঞাতনামা’। জানা যায়, ধানমন্ডি থানা তাকে উদ্ধার করে অজ্ঞাতনামা হিসেবেই নথিবদ্ধ করে এবং অজ্ঞাত হিসেবেই তার ময়নাতদন্ত হয়। আর তখনই মর্গের খাতা হাতে নিয়ে মা তৃষ্ণা বলেন, ‘আমার ছেলে কেন অজ্ঞাত হিসেবে যাবে, ও তো আমার আরা নীলমনির (ঋদ্ধর বাবা নীলমনি ভট্টাচার্য) সন্তান। এই ছেলেকে আমি পেটে ধরেছি, জন্ম দিয়েছি; বড় করেছি। সেই ছেলেকে কেন অজ্ঞাত হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হবে।’ যদিও পরে ধানমন্ডি থানা থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়, সব প্রক্রিয়া শেষে অজ্ঞাত হিসেবে পুলিশের খাতায় লেখা ঋদ্ধের পরিচয় ঠিক করে দেওয়া হবে। আর সে আশ্বাসেই ঋদ্ধকে নিয়ে মর্গ ছাড়েন মা তৃষ্ণা সরকার।
মর্গ থেকে ঋদ্ধকে ছায়ানটে নিয়ে যাওয়া হয়। বন্ধুদের দেখানোর পর ঋদ্ধকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর বাসাবো কালীমন্দিরে। সেখানে তাকে সমাহিত করা হবে বলে জানান পরিবারের বন্ধু আতিকা রোমা।