দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি (বার)। প্রতিবছর কার্যনির্বাহী কমিটির মোট ১৪টি পদে আইনজীবীদের প্রত্যক্ষ ভোটে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আগামী ১০ ও ১১ মার্চ (বুধ ও বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সমিতির ২০২১-২০২২ সেশনের নির্বাচন। শেষ সময়ে এসে নির্বাচনকে ঘিরে প্রচারণায় ব্যস্ত আইনজীবী প্রার্থীরা। তবে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে নির্বাচনের আগেই বেশকিছু সমীকরণ দাঁড় করিয়েছেন আইনজীবী ভোটাররা।
এবারের নির্বাচনে ১৪টি পদের (৭টি সম্পাদকীয় পদ ও ৭টি কার্যনির্বাহী সদস্য পদ) বিপরীতে চূড়ান্তভাবে ৫১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৭টি সম্পাদকীয় পদের বিপরীতে ২৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এদের মধ্যে সভাপতি পদের বিপরীতে ৫ জন প্রার্থী, ২টি সহ-সভাপতি পদের বিপরীতে ৬ জন, সম্পাদক পদে ৪ জন, কোষাধ্যক্ষ পদে ৪ জন, ২টি সহ-সম্পাদক পদের বিপরীতে ৮ জন এবং ৭টি কার্যনির্বাহী সদস্য পদের বিপরীতে মোট ২৪ জন প্রার্থী রয়েছেন। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমান। এরপর ২০২০-২১ সেশনের নির্বাচনে সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট এএম আমিন উদ্দিন পুনরায় নির্বাচিত হন। অপরদিকে সম্পাদক পদে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী (নীল প্যানেল) ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের মধ্য সভাপতিসহ মোট ৬টি পদে এবং সম্পাদক পদ মোট ৮টি পদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নির্বাচিত হন বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীরা।
এর আগে সমিতির ২০১৯-২০ সেশনের নির্বাচনে সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন সরকার সমর্থক সাদা প্যানেলের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী (বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেল) এএম আমিন উদ্দিন। অপরদিকে সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি সমর্থক নীল প্যানেলের ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। ওই নির্বাচনে ১৪টি পদের মধ্যে সভাপতিসহ ছয়টি পদে সরকার সমর্থিত সাদা প্যানেল নির্বাচিত হয়। অপরদিকে সম্পাদকসহ আটটি পদে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত নীল প্যানেল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নির্বাচিত হয়।
ভোটারদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বিগত সময়ের তুলনায় এবার আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা অনেকাংশে বেশি। তবে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিতদের মধ্যে সম্প্রতি দুই আইনজীবীকে বহিষ্কার করায় তাদের সম্প্রীতিতে ফাটল ধরেছে। একইসঙ্গে দলের সমর্থন বঞ্চিতরা ভিন্ন প্যানেল ঘোষণা করে নিজেদের পক্ষে জোড় প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ কারণে বিএনপির প্রার্থীদের ভোট ভাগ হয়ে যাবে। তাদের ভোট ভাগাভাগির কারণে অতিরিক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কথা ভাবছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা।
সাদা প্যানেল থেকে সহ-সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন নারী আইনজীবী সাফায়াত সুলতানা রুমি। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে হাইকোর্টে প্রাকটিসের সুবাদে সমিতির সকল আইনজীবীর সঙ্গে আমার সম্প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সবাই জানেন, আমি খুব পরিশ্রমী। তাই আমার ওপর ভোটারদের আস্থা রয়েছে। আশা করছি, আমি নির্বাচিত হবো এবং আমার ওপর অর্পিত সকল দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারবো।’
কয়েকটি সূত্র থেকে জানা গেছে, বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেল ঘোষণার পূর্বে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। স্কাইপের মাধ্যমে ওই সাক্ষাৎকারের ঘটনায় এবং দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতিতে তারেক রহমান ভোটের বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও খবরদারি করায় ভোটাররা তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টেছেন। আইনজীবীদের যুক্তি হলো— তারা একটি স্বাধীন পেশায় নিয়োজিত। সেক্ষেত্রে দলের ঊর্ধ্বতন বা পেশার বাইরের কারও খবরদারি তাদের পছন্দ নয়। কেননা, সমিতির স্বার্থে আইনজীবীরা নিজেরাই নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। এদিকে বর্তমান কমিটির আমলে সুপ্রিম কোর্টে অবস্থিত সিদ্দিক এন্টারপ্রাইজে ওকালতনামার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠে। সাংগঠনিক পদমার্যাদা অনুসারে সমিতির বর্তমান সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল সেসব বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায়, আইনজীবীদের মাঝে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ,ওকালতনামার অর্থের মাধ্যমেই আইনজীবীদের বেনাভোলেন্ট ফান্ড বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। পাশাপাশি বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সরকারের অনুদানে সমিতির অবকাঠামো ও আর্থিক উন্নতি বৃদ্ধি পাওয়ায় এদিকেই ভোটের সংখ্যা বেশি থাকবে বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিদ্দিক এন্টারপ্রাইজের ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। করোনা এবং নির্বাচনকালীন কার্যক্রমকে ঘিরে ঘটনার তদন্তে সময় লাগছে।’
সার্বিক দিক বিবেচনায় জানা গেছে,এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবী প্রার্থীরা সভাপতি, সহ সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট শফিক উল্লাহ, কোষাধ্যক্ষ এবং সদস্যসহ ৪টি পদে জয়ী হবেন বলে প্রচারণা আছে। তবে সহসম্পাদক পদে সাদা প্যানেল থেকে একটি পদ পাওয়া সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে রয়েছে দোদুল্যমান পরিস্থিতি। বলা হচ্ছে, এবারের সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম আমলে আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় দেশের বিভিন্ন আদালতে অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি কাজ করেছেন। ফলে তার নামফলক এবং জনপ্রিয়তার কারণে সভাপতি পদে তাকেই উপযুক্ত ভাবছেন ভোটাররা। এদিকে বিএনপির সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। তাই আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি প্রার্থী হওয়ায় তার ওপর দলীয় আইনজীবীদের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। যদিও সুবক্তা হিসেবে তিনি আইনজীবীদের কাছে জনপ্রিয়। সবসময় আইনজীবীদের পাশে থাকার কারণে সম্পাদক পদে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের জনপ্রিয়তা বেশি রয়েছে। এ কারণে তার সঙ্গে সরকার দলীয় প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুল আলীম মিয়া জুয়েলকে বেশ কৌশলী হতে হচ্ছে। আর বিএনপির কোষাধ্যক্ষ প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মাহবুবের আচরণ আইনজীবী সুলভ না হওয়ায় ওই পদে তারা আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. ইকবাল করিমকে জয়ী করার কথা ভাবছেন।
আইনজীবীদের ভাষ্য, সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে নীল প্যানেল থেকে ৫ কিংবা ৬টি পদে এবং সাদা প্যানেল থেকে ৯ কিংবা ৮টি পদে জয় পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের হাতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বিগত বছরগুলোতে সরকার এই সমিতির উন্নয়ন কাজে বড় অঙ্কের অনুদান দিয়ে চলেছে। কিন্তু সেসব উন্নয়নকে বিএনপির প্রার্থীরা নিজেদের মতো করে আইনজীবীদের ভুল বুঝিয়েছেন। তাই সেসব ভুলের অবসান এবারের নির্বাচনে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ঘুচতে চলেছে বলে আশা রাখছি।
আওয়ামী সমর্থিত প্যানেলের সদস্য পদপ্রার্থী মাহফুজুর রহমান রোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছোট বেলা থেকেই স্কাউটের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করেছি। রাষ্ট্রপতির অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। বিগত সময়ে গণিত অলিম্পিয়ার্ডেও বিশেষ ভূমিকা রেখে এসেছি। এছাড়াও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি ল ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন সময়ে সফলভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। দীর্ঘদিনের পেশাজীবনে তরুণ আইনজীবীদের সঙ্গেও আমার সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে। তাই আমি নির্বাচিত হলে বারে তরুণদের প্রতিনিধি হিসেবে সবার সহযোগীতায় কাজ করে যেতে পারবো।’
এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার হওয়া আইনজীবী ওয়ালিউর রহমান খান ভিন্ন প্যানেলে সভাপতি ও মির্জা আল মাহমুদ সম্পাদক পদে নির্বাচন করছেন। আর বামপন্থী আইনজীবীদের ‘লাল প্যানেল’ হিসেবে পরিচিত প্যানেল থেকে ৮টি পদের প্রার্থিতা ঘোষণা করা হয়েছে। লাল প্যানেলে সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট কেএম জাবির ও সম্পাদক পদে মো. গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। রাজনৈতিক পরিচিতির বাইরে সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট মো. ইউনুস আলী আকন্দ আবারও প্রার্থী হয়েছেন। তবে এর আগে কোনোবারই জয়ের মুখ দেখেননি মো. ইউনুস আলী আকন্দ।