কাওরান বাজার সিগন্যালের পাশে নির্মাণাধীন এক বহুতল ভবনের সামনের ফুটপাতজুড়ে ছিন্নমূল মানুষের বাস। এরা সবাই আশেপাশের ৩ সিগন্যালে ছোটখাটো জিনিস বিক্রি করে দিন যাপন করে। লকডাউনের তৃতীয়দিনে সবাই এখানে অলস দিন কাটাচ্ছে। তাদের দাবি, সাতদিন বিক্রি বন্ধ কিন্তু কেউ তাদের কোনও সহায়তা দেয়নি। এই ভবনটি তৈরি কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা এখানেই বাসা বেধেছে, ভবন নির্মাণ শেষে অফিস চালু হয়ে গেলে অন্যকোনও ফুটপাত হবে আশ্রয়।
শনিবার বেলা দেড়টা। ‘ভ্যানের ওপর বসে আছেন কেন’ জিজ্ঞেস করতেই ফুল বিক্রেতা ১৪ বছর বয়সী সোনিয়া (ছদ্মনাম) বলে, ‘তিনি আমার নানী। লকডাউনে কারোর কাজ নাই। তাই বসে আছে’। ‘তুমি কী করো’—প্রশ্ন করতেই সোনিয়ার চটজলদি জবাব, ‘স্বাভাবিক সময়ে আমি ফুল ছোট তোয়ালে বিক্রি করি। দিনে দেড়শ টাকা মতো থাকে।’ ‘এখন কী তাহলে অস্বাভাবিক সময়’— সোনিয়ার উত্তর, ‘এখন লকডাউন। লোক নাই রাস্তায়। আমাদেরও কাজ নাই। কিন্তু আমাদের যাওয়ার জায়গা নাই। এখানেই আছি। সিগন্যালের মানুষ সিগন্যালেই আছে। আপনার কিছু লাগবো?’
এরই মধ্যে দশ পনেরো জন জড়ো হয়ে যায়। আপনারা করোনায় এভাবে না দাঁড়ায়ে একটু দূরে দূরে দাঁড়ান বলতেই হেসে উঠলো সবাই। সোনিয়ার নানী বলেন, ‘না রে মা, আমরা এভাবেই থাকি। আমাদের ওসব শুনলে পেটে ভাত জোটে না। এত মানুষ নাকি করোনায় মরে, আমদের মরণ নাই।’ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে ওঠে একজন। ‘মরণ নাই মানে, না খেয়ে তো মরারই দশা। তোমরা মরণ নাই বলো কেন?’
চন্দ্রিমা সিগন্যালে ফুল বিক্রি করেন সায়েনুর। লকডাউন শুরুর আগের দিনে এই সিগন্যালের কয়েকজন গ্রামে ফিরে গেছে। যাদের যাওয়ার মতো গ্রাম নেই তারা মনিপুরী পাড়ার রাস্তার বন্ধ দোকান ঘেঁষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমান। সকাল হলে সবাই একসঙ্গে থাকেন। কেউ কেউ পাড়ায় পাড়ায় চেয়ে চিন্তে কিছু আনা যায় কিনা সেই খোঁজেও বের হচ্ছেন। সিগন্যালের মানুষ সিগন্যাল ছেড়ে যেতে চায় না উল্লেখ করে বাঁশের নির্মিত ছোট ছোট টুকরি বিক্রেতা বলেন, ‘সে এক পলিটিক্স। আছে আছে’।