রাত গভীর হলে দোকানের ভেতরের আলো জ্বালিয়ে কফিন, কাফনের কাপড় আর দাফনের সরঞ্জামের মাঝে শুয়ে থাকেন এরশাদ তালুকদার। দোকানের নাম আল বিদায় স্টোর। রাজধানীর কাঁটাবনে বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটের দোকানটিতে তিনি একজন কর্মচারী। শুয়ে থাকেন বটে, তবে একটানা ঘুমের সুযোগ পান কম। প্রতি রাতেই কেউ না কেউ নক করে, উঠে কফিন বাক্স বা কাফনের কাপড় বিক্রি করতে হয় তাকে। তারপর আবার ঘুমের চেষ্টা চলে তার। এভাবে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই বিশ্রাম আর বিক্রি চলে একসঙ্গে। গত ২০ বছর ধরে এভাবেই কাজ করছেন। এক মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে ৩৫ বছর বয়স্ক এরশাদ তালুকদারের সংসার ফরিদপুরে।
লকডাউনের সপ্তম দিন বুধবার রাতে এরশাদ তালুকদারের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। ‘আল বিদায় স্টোরে’র সামনে বসে কথা হয় ব্যবসার হালচাল নিয়ে। সঙ্গে নিজের জীবনের কিছু কথাও জানান তিনি।
এরশাদ তালুকদার জানান, প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচজনের দাফন সরঞ্জাম বিক্রি হয়। এ সংখ্যা কখনো বেড়ে যায়। তবে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের পর বিকিকিনিতে বেশি প্রভাব পড়েনি।
এরশাদ তালুকদার বলেন, ‘এই তো আজকেও (বুধবার) পিজিতে দুইটা, স্কয়ারে দুইটা বাক্স ও কাফনের সেট দিয়ে এসেছি। তবে অন্য সময়েও এমনই হয়।’ ঢাকা শহরের অন্তত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটি কাফন-সরঞ্জামের দোকান রয়েছে বলে জানান তিনি। বলেন, হাসপাতালের ফ্রিজিং গাড়ি থাকায় কফিন বাক্সের বেচাকেনা কিছু কম। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বেশি কফিন যায় আল বিদায় স্টোর থেকে।
প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন ও দুই বেলা খাবার- এরই বিনিময়ে ‘আল বিদায় স্টোরে’ কাজ করছেন এরশাদ তালুকদার। বলেন, ‘আল্লাহর কাছে হাজার শোকর পরিবারসহ ভালোই আছি। আল্লাহর রহমতে করোনা ভাইরাস হয় নাই এখনও। তবে দুপুরের খাবার আগে প্রতি বাটি ৩০ টাকায় হলেও এখন সেটা ৫০ টাকার উপরে। দিনে প্রায় ১২০ টাকা খরচ হয় খাবারে। সেদিক থেকে কিছু চাপ তৈরি হয়েছে।’
এরশাদ তালুকদার জানান, কাফনের কাপড় আসে রাজধানীর ইসলামপুর থেকে আর কফিনের বাক্সের কাঠ নিয়ে আসা হয় কামরাঙ্গীরচর স’মিল থেকে।
আল বিদায় স্টোরে এরশাদ কেবলই একজন কর্মচারী। এর মালিক মনির হোসেন। মনির হোসেনের বাবা মৃত সাদেক মিয়া কাঁটাবন মার্কেটের প্রথম দাফন-সরঞ্জামের দোকান ‘চির বিদায় স্টোর’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই স্টোরটিই কাঁটাবন বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটের প্রথম দোকান বলে দাবি করেন এরশাদ।
‘চির বিদায় স্টোরে’র দেখভাল করেন মানিকগঞ্জ সিঙ্গাইরের অধিবাসী ৬৫ বছরের প্রবীণ কাবুল মিয়া। ১০ বছর ধরে তিনি কাজ করছেন এই দোকানে। কাবুল জানান, কাফন-সরঞ্জামের দোকানে কফিন, কাফনের কাপড়, চা-পাতা, কর্পূর, পলিথিন, গোসল-সেট বিক্রি করা হয়। গোসল-সেটে রয়েছে আতর, গোলাপ, সুরমা, খিলাল, আগরবাতি, কুলুপতেনা, সাবান, তুলা ও কর্পূর।
দাফন-সরঞ্জামের দরদামও জানান কাবুল। তিনি জানান, গোসলসেট তিনশ টাকা থেকে শুরু করে পাঁচশ-ছয়শ টাকা পর্যন্ত। কফিনের মূল্য এক-দেড় হাজার টাকা থেকে শুরু, বেশি দামেরও আছে। কাফনের কাপড়ের পুরো সেট ২৫শ থেকে শুরু হয়।
করোনাকালে দাফন-সরঞ্জামের বিকিকিনি নিয়ে কাবুলের মন খারাপ। তাছাড়া দোকানও এখন ছোট হয়ে গেছে। চিরবিদায় স্টোর প্রতিষ্ঠাকালে বেশ বড় থাকলেও এখন অর্ধেক জায়গায় পালিত পশুর দোকান দেওয়া হয়েছে।
কাবুলের ভাষ্য, ‘হুজুররা গোসল করায়, সব জায়গায় কাফনের কাপড় পাওয়া যায়, তাই এখন বেশি কাস্টমার নাই। মেডিক্যাল এলাকায়ও পাওয়া যায়। ব্যবসা ভালো না। করোনার রোগী তো প্রায় আসে না। খালি মহল্লার মানুষ কেউ মারা গেলে লোকজন আসে।’
কাবুলের চার সন্তান। চারজনই ছেলে। তিনি বলেন, ‘দুইজন দেশের বাইরে কাজ করে। দুইজন গ্রামে কৃষিকাজ করে।’ ঢাকায় কাবুল একাই থাকেন দোকানে, পরিশ্রম-বিশ্রাম ‘চিরবিদায় স্টোরে’ই। ছুটি পেলে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যান তিনি।
আল বিদায় স্টোরের সহকারী এরশাদ তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ঢাকা শহরের অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ টি কাফন-সরঞ্জামের দোকান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মিরপুর, খিলগাঁও, মিরপুর-সনি হল, আগারগাঁও, মগবাজার, জুরাইন, কোনাপাড়া, ধোলাইপাড়, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, চানখারপুল উল্লেখযোগ্য। অধিকাংশ দোকানের নামেই ‘চির বিদায়’, ‘আল বিদায়’, ‘বিদায় বেলা’ শব্দগুলো থাকে।
মগবাজারের ‘বিদায় বেলা স্টোর’র মালিক খন্দকার মামুনুর রহমান বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দাফন-সরঞ্জামের ব্যবসা ভালো না। দোকান ভাড়া, বিদ্যুতসহ নানা বিল দেওয়ার পর তেমন কিছু আর থাকে না হাতে। এই দোকানের আয় দিয়ে সংসার চলে না।’
মামুনুর রহমান বলেন, ‘করোনার রোগী মারা গেলে কেউ-কেউ আসে। তবে খুব কম। এই ব্যবসা রেগুলার না।’
ছবি: সালমান তারেক শাকিল