ডেঙ্গু কমার দাবি দুই মেয়রের, কৃতিত্বটা কার?

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিরুনি অভিযানের ফলেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু রোগী কমছে, এমনটা দাবি করেছেন দুই মেয়র। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক-দুই দিনের পরিসংখ্যান দিয়ে নিম্নমুখী বলা যাবে না। বর্তমান পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও যে হারে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে তাতে তৃপ্ত থাকার ‍সুযোগ নেই। আবার ধীরে ধীরে বৃষ্টি কমে এলে ডেঙ্গু এমনিতেই কমে আসে।

গত সপ্তাহে খিলগাঁও রেলগেট সংলগ্ন দক্ষিণ সিটির ১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের উদ্বোধন শেষে দক্ষিণের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘সেদিন ৫ নম্বর ওয়ার্ডে আপনারা দেখেছেন, একটি হাউজেই কী পরিমাণ লার্ভা পেয়েছি। তাই আশা করছি, ঢাকাবাসী আরও সচেতন হবেন। আমাদের সহযোগিতা করবেন। আমরা চিরুনি অভিযান চলমান রাখবো। আমরা ডেঙ্গুকে নিম্নমুখী করেছি।’

মেয়র আরও বলেন, ‘আমরা ডেঙ্গু রোগী সম্পর্কে যে তথ্য পাচ্ছি তাতে সুনির্দিষ্ট ঠিকানা পাচ্ছি না। রোগীর সঙ্গে যোগাযোগের পর দেখা গেলো তাদের কেউ চট্টগ্রাম বা কেউ এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে। কেউ অন্য জায়গা থেকে আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছেন। তাই ঢালাওভাবে বলা যাবে না, আশি ভাগ ডেঙ্গু রোগী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার।’

অপরদিকে নিয়মিত অভিযানের ফলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা নিম্নগামী বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির মেয়র আতিকুল ইসলাম। শনিবার (১৪ আগস্ট) সকালে রাজধানীর মধুবাগ এলাকায় বিভিন্ন বাসাবাড়ি পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘নগরবাসীকে বলেছিলাম, প্রত্যেক শনিবার সকালে ১০ মিনিট নিজেদের আঙিনা পরিষ্কার করতে। নগরবাসী সাড়া দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। যার কারণে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নিম্নগামী।’

এর আগের দিনের স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ২১০ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ঢাকা উত্তরের রোগী মাত্র ৩২ জন।

এদিকে, সারাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এখন এক হাজার ৪৯ জন রোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে ঢাকাতেই আছে ৯৬০ জন।

এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ছয় হাজার ১০০ রোগী ভর্তি হয়েছেন। ছাড়া পেয়েছেন ৫ হাজার ২৬ জন। ডেঙ্গু সন্দেহে ২৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনার জন্য রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিন্মমুখী বলা যাবে না। এটা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। গত কয়েকদিন ধরেই গড়ে প্রতিদিন ২২০ জনের মতো রোগী পাচ্ছি। তারা (মেয়ররা) এমন দাবি করে সবাইকে শান্ত রাখতে চান।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যে রেকর্ড- তাতে দেখা যায়, কোনও বছর আগস্টে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে, কোনও বছর সেপ্টেম্বরে। এ বছর হয়তো আগস্টে বেশি, আবার সেপ্টেম্বরে কমবে। বৃষ্টি ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। এ ঘটনার কৃতিত্ব নিতে চান মেয়ররা।’

ড. কবিরুল বাশার আরও বলেন, ‘এ কৃতিত্ব সমন্বিত। এখানে মিডিয়ার ভূমিকাও অনেক। গণমাধ্যমের চাপ না থাকলে কেউ কাজ করতো না। জনগণও সম্পৃক্ত হতো না। মিডিয়া, গবেষক, সিটি করপোরেশন এবং জনগণ এ চার কমিউনিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হয়তো পরিস্থিতি স্থির অবস্থায় রয়েছে। এটাকে এখন যদি খুব বড় অর্জন ভেবে বসে থাকি, তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে।’

কীটতত্ত্ববিদ ও বাংলাদেশ প্রাণীবিজ্ঞান সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকায় এক হাজারের বেশি হাসপাতাল আছে। সেখানে মাত্র ৪১টি হাসপাতালের তথ্য পায় সরকার। অনেক রোগী ভর্তি হওয়ার আসন পাচ্ছে না। অনেক হাসপাতাল এখন সাধারণ রোগী ভর্তিও নিচ্ছে না। যেখানে কী পরিমাণ আক্রান্ত হয়েছে সেটাই সঠিকভাবে জানা যাচ্ছে না, সেখানে ডেঙ্গু নিন্মমুখী বলা হচ্ছে কী করে?’

তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু থেকে রক্ষার জন্য সিটি করপোরেশন সঠিক পদক্ষেপই নিতে পারেনি। কিউল্যাক্স মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। সিটি করপোরেশনের কাজের ফলে ডেঙ্গু কমছে বলা যাবে না। প্রাকৃতিকভাবে একটা সময় এমনিতেই এর প্রকোপ কমে আসে।