রাজধানীতে ১৪ দিনে কাভার্ডভ্যানের চাপায় নিহত ১০

রাজধানীতে রাস্তায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইশা মমতাজ মিম নিহতের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কাভার্ডভ্যান চাপায় বৃহস্পতিবার তিন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। এভাবে গত ১৪ দিনে কাভার্ডভ্যানের চাপায় রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় নিহত হয়েছেন ১০ জন। ভোর ও সকালের দিকে ঢাকার রাস্তা কিছুটা ফাঁকা থাকায় বেপরোয়া গতিতে চলে কাভার্ডভ্যান। সড়কগুলোতে বিশেষ করে সকালের দিকে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে এই পরিবহনটি।

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইলিয়াস শরীফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর উত্তরা আজমপুরে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেলের তিন আরোহী নিহত হন। ঘটনার পর কাভার্ডভ্যানটি জব্দ করা হলেও চালক পালিয়ে যায়। চালককে গ্রেফতারে আমরা অভিযান চালাচ্ছি।’ 

এর আগে, ১ এপ্রিল সকালে উত্তরা থেকে মোটরসাইকেলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে যাওয়ার সময় কুড়িল ফ্লাইওভারে কাভার্ডভ্যানের চাপায় মারা যান মাইশা মমতাজ মিম। তাকে চাপা দিয়ে কাভার্ডভ্যানটি নিয়ে পালিয়ে যান চালক। পরে চট্টগ্রাম থেকে কাভার্ডভ্যান, চালক ও তার সহকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, ভারী যানবাহন চালালেও হালকা লাইসেন্স দিয়ে চালক কাভার্ডভ্যানটি চালিয়ে আসছিল। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

গত ৭ এপ্রিল সকালে ধানমন্ডির মিরপুর রোডে দ্রুতগতির কাভার্ডভ্যানের চাপায় পিষ্ট হয়ে মাহিনুর বেগম নামে ষাটোর্ধ্ব এক নারীর মৃত্যু হয়। এ সময় নারীকে চাপা দেওয়া কাভার্ডভ্যানটি নিয়ে চালক পালিয়ে যায়।

৪ এপ্রিল ভোরে রাজধানীর গুলশানে কাঁচামাল ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফকে (৪৮) চাপা দেয় একটি কাভার্ডভ্যান। পরে গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে, ৪ এপ্রিল ভোরে রামপুরা এলাকায় কাভার্ডভ্যানের চাপায় নিহত হন আদনান সাকিব (২৮) নামে এক যুবক।

২ এপ্রিল সবুজবাগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন সোহেলা বেগম (৪৫)। সকাল ৬টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে সিদ্ধেশ্বরীতে কাজে যাওয়ার পথে সবুজবাগ বৌদ্ধ মন্দির এলাকায় কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মারা যান তিনি।

যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় বেপরোয়া কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় ১ এপ্রিল সোহান নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। ১ এপ্রিল ভোরে পল্টন থানা এলাকার রাজউক ভবনের সামনে মুরগির ভ্যানকে চাপা দেয় একটি কাভার্ডভ্যান। এ সময় ভ্যানে থাকা মুরগি ব্যবসায়ী মান্নান ওরফে সোহাগ (২০) নিহত হন।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনার পর আমরা তদন্তে দেখতে পাই, অনেক চালক ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালায়। এতে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় আমরা দেখতে পেয়েছি, কাভার্ডভ্যান চালানোর জন্য ভারী লাইসেন্সের প্রয়োজন, কিন্তু চালকরা হালকা লাইসেন্স ব্যবহার করে কাভার্ডভ্যান চালিয়ে আসছে। এসব বিষয় আমরা নজরদারিতে রাখছি।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কগুলোতে যানজট এবং ঘাটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় পরিবহনগুলোকে। ভারী যানবাহনগুলোর ট্রিপ শেষ করতে ক্ষেত্রবিশেষে দুই থেকে তিন দিন সময় লেগে যায়। এ জন্য একটু রাস্তা ফাঁক পেলে তারা বেপরোয়া হয়ে যায়। এগুলোর চালকদের জন্য মহাসড়কগুলোতে বিশ্রামাগার, শৌচাগার নির্মাণ করা জরুরি। জাতীয়ভাবে একটি পলিসি নিতে হবে। পুরো বাংলাদেশে যেহেতু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে, অবশ্যই এসব কাভার্ডভ্যানের মুভমেন্ট বাড়বে। সেসব বিষয় মাথায় রেখেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডক্টর মো. হাদিউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহাসড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে ভারী যানবাহনগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের দুর্ঘটনার প্রবণতা সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। চালকরা রাতে যানজট ঠেলে পরিশ্রান্ত শরীরে গাড়ি চালাবেন এবং সকালে এসে যখন দেখেন রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে তখন চালকদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আসে। তারা চিন্তা করে কিছুটা গতি বাড়িয়ে যানজট বাড়ার আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার জন্য। আর এসব কারণেই সড়ক আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।’