দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর উদ্বোধন

রাজধানীতে ১১৪ দেশের ৪৯৩ শিল্পীর চারুকলা উৎসব

রাজনীতির উত্তাপের মধ্যেই রাজধানীতে শুরু হলো দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর ১৯তম আসর। এতে রয়েছে বাংলাদেশসহ ১১৪ দেশের ৪৯৩ জন শিল্পীর শিল্পকর্ম। বৃহস্পতিবার (৮ ডিসেম্বর) সকালে ঢাকার সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় ছিল এর উদ্বোধনী আয়োজন।

গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এশিয়া মহাদেশের প্রাচীনতম এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক চারুকলা উৎসব উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা এই সংস্কৃতি সেবা একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের কাছে নিয়ে যেতে চাই। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আমরা কাজ করছি, পাশাপাশি তাদের শিল্পমনের বিকাশ যাতে হয় সেই পদক্ষেপও নিচ্ছি।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে শিল্পকলা একাডেমি যাতে সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে সেই মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে। তিনি জানিয়েছেন, ঢাকার শিল্পকলায় জাতীয় নাট্যশালা, এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার, স্টুডিও থিয়েটার, সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তন, চারুকলা মিলনায়তন ও উন্মুক্ত মঞ্চ রয়েছে। এখানে আরও তিনটি মিলনায়তন নির্মাণের কাজ চলছে।

চারুশিল্প দেখছেন একজন দর্শক (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘আমরা ৬৪ জেলায় শিল্পকলা একাডেমির নতুন ভবন তৈরি করেছি। ৪৯৩টি উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমি স্থাপন করা হয়েছে। এসব জায়গায় দেশি-বিদেশি চিত্রকর্ম সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। চারুকলা, সংগীত, নৃত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত ও লোক-সংস্কৃতি উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি যাতে বিকশিত হয়, সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি ও আয়োজকরা

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবুল মনসুর, চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী এবং পোল্যান্ডের শিল্প-সমালোচক জ্যারোস্ল সুহান।

স্বাগত বক্তব্যে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ৪০ বছর ধরে এশিয়ান চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করে আসছে। এবারের আয়োজন যেন ১১৪টি দেশের শিল্পীদের অভূতপূর্ব এক মিলনমেলা। আমরা এই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর কোনও থিম নির্ধারণ করি না। কারণ আমরা জানি, প্রত্যেক শিল্পী নিজের ভেতরে শৈল্পিক দর্শন ধারণ করেন, যা তাকে পরবর্তী সময়ে শৈল্পিক বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করে। আমরা জানতে চাই, চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শিল্পীরা বর্তমান সময়কে কীভাবে চিত্রিত করেছেন এবং আপন মানসপটে শিল্পের কোন মাধ্যমে তারা নিজেদের ভাবনার কথা তুলে আনতে চান।’

শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনা

উদ্বোধনী আয়োজনে নির্বাচিত শিল্পকর্মের মধ্য থেকে পাঁচ সদস্যের জুরি বোর্ড ৯ জনকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন। জুরি বোর্ডের সভাপতি চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করেন। এরমধ্যে তিন জনকে গ্র্যান্ড পুরস্কার এবং ছয় জনকে সম্মানসূচক পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। গ্র্যান্ড পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন শিল্পীর প্রত্যেকে ৫ লাখ টাকা করে এবং সম্মানসূচক পুরস্কারপ্রাপ্ত ৬ জনের প্রত্যেকে ৩ লাখ টাকা করে অর্থমূল্য, ক্রেস্ট, স্বর্ণপদক এবং সনদপত্র পেয়েছেন।

উৎসবে গ্র্যান্ড ও সম্মানসূচক পুরস্কারপ্রাপ্তরা

বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। গ্র্যান্ড পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন বাংলাদেশের সুশান্ত কুমার অধিকারী, ইয়াসমিন জাহান নূপুর ও নেদারল্যান্ডের হ্যারল্ড স্কোলে। সম্মানসূচক পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশের ফারিহা জেবা, জয়তু চাকমা, মামুর আহসান মাহতাব, ময়নুল ইসলাম পল, সুমন চন্দ্র দাস ও পর্তুগালের এনা সিলভিয়া মালহাডো।

শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনা

দ্বিতীয় পর্বে ১১৪টি দেশের পতাকা নিয়ে কোরিওগ্রাফি পরিবেশন করে শিল্পকলা একাডেমির শিশুশিল্পীরা। রোহিঙ্গাদের দেশান্তর এবং তাদের বেদনা-গাঁথা নিয়ে ছিল কোরিওগ্রাফি ‘রোহিঙ্গানামা’। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে শিল্পকলা একাডেমি নৃত্যদল।

শিল্পকলা একাডেমির জনসংযোগ কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, সমকালীন শিল্পকলাকে প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিল্পপ্রেমী দর্শক ও সংগ্রাহকদের কাছে পরিচিত করে তোলার লক্ষ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আন্তর্জাতিক চারুকলা উৎসবের আয়োজন করেছে। এবারের প্রদর্শনীতে রয়েছে বিভিন্ন দেশের চিত্রকলা, ভাস্কর্য, আলোকচিত্র, স্থাপনাশিল্পসহ নানান মাধ্যমে নির্মিত শিল্পকর্ম।

জানা গেছে, শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত মাসব্যাপী চারুকলা প্রদর্শনী চলবে। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই আয়োজন। দর্শনার্থীরা অনলাইনে বিনামূল্যে নিবন্ধন করতে পারবেন (bsa.gov.bd/cms)। এছাড়া জাতীয় চিত্রশালায় তাৎক্ষণিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।