নির্যাতনের বিচার না পেয়েই তানিয়া বাড়ি ফিরে যাবে?

হাতে সুপারগ্লু ও মুখ স্কচটেপ দিয়ে বাঁধা। মাথার চুল ও ভ্রু ছাঁটা। শরীরজুড়ে নির্যাতনের অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন। এমন নৃশংস মারধরের ঘটনার বিচার না চেয়ে বনানীতে উদ্ধার গৃহকর্মী তানিয়া বেগম অনেকটা নীরবেই বাড়ি ফিরে যেতে চাইছে। ‘মামলার খরচ’ আর ‘প্রভাবশালী গৃহকর্ত্রী’র ভয়ে তানিয়ার মতো এমন অসংখ্য গৃহকর্মী কি তাহলে ন্যায়বিচার বঞ্চিতই থেকে যাবে?

গৃহকর্মী নির্যাতনের অনেক ঘটনার ভিড়ে রোমহর্ষক ছিল তানিয়ার ওপর ঘটে যাওয়া নির্মমতার ছাপ। ঘটনাটি গত ২০ ডিসেম্বরের।

পুলিশ সূত্র বলছে, গত ২০ ডিসেম্বর দুপুরে ৯৯৯-এ কল করে এক ব্যক্তি তাদের জানান, বনানীর ২৩ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির ৭ তলার ফ্ল্যাটে একজনকে নির্যাতন করা হচ্ছে। বাইরে থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ আসছে। এরপর বেলা সোয়া ২টার দিকে ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা যায়, একজনের (গৃহকর্মী) হাতে সুপারগ্লু ও মুখ স্কচটেপ দিয়ে বাঁধা রয়েছে। মাথার চুল ও ভ্রু ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। শরীরজুড়ে নির্যাতনের অসংখ্য ক্ষত। মারধরে মুখমণ্ডল ফুলে গেছে। পরে জানা গেছে, ভুক্তভোগীর নাম তানিয়া বেগম। ভবনটিতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতো সে।

পরে তাকে উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। তানিয়াকে উদ্ধারের পর গৃহকর্ত্রী সামিনা আলমকে আটক করে নেওয়া হয় বনানী থানায়। তবে ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে কোনও অভিযোগ কিংবা তাৎক্ষণিক এই ঘটনার কোনও আইনি ব্যবস্থা নেয়নি থানা পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগী গৃহকর্মীর পক্ষ থেকে কোনও মামলা করতে রাজি না হওয়ায় গৃহকর্ত্রী সামিনা আলমকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

গৃহকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি প্রণয়ন করে সরকার। ওই নীতিমালায় নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে ৭(১০) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—

(ক) কোনোক্রমেই গৃহকর্মীর প্রতি কোনও প্রকার অশালীন আচরণ অথবা দৈহিক আঘাত অথবা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। গৃহকর্মীর ওপর কোনও রকম হয়রানি ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে সুবিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকারের ওপর বর্তাবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ও সুস্পষ্ট নির্দেশাবলি প্রদান করবে।

(খ) নিয়োগকারী, তার পরিবারের সদস্য বা আগত অতিথিদের দ্বারা কোনও গৃহকর্মী কোনও প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যেমন অশ্লীল আচরণ, যৌন হয়রানি বা যৌন নির্যাতন কিংবা শারীরিক আঘাত অথবা ভীতি প্রদর্শনের শিকার হলে দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

(গ) গৃহকর্মী নির্যাতন বা হয়রানির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানা যেন দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, সে জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাফতরিক নির্দেশনা জারি করবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় গৃহকর্মীর প্রতি নির্যাতনের প্রতিকারে প্রয়োজনে আন্তমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে সরকারের কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে পারবে।

(ঘ) গৃহকর্মী কর্তৃক করা যৌন হয়রানি ও যৌন নির্যাতন কিংবা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের মামলা সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত হবে। যৌন হয়রানি বা যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের গাইডলাইন প্রযোজ্য হবে।

(ছ) নীতিতে যা-ই থাকুক না কেন, গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় ফৌজদারি মামলা করার ক্ষেত্রে কোনও বাধা কিংবা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জে আর খান রবিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থায় আইনের ব্যবহার অপরিসীম। মানুষের জান ও মালের নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই কোনও অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। আবার যদি কোনও ক্ষেত্রে আসামি বা অভিযুক্তকে খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে সেই ব্যর্থতাও রাষ্ট্রের।’

ভুক্তভোগী গৃহকর্মী ও তার পরিবার বলছে, ‘যারা নির্যাতন করেছে, তারা প্রভাবশালী। মামলা করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন। এ ছাড়া মামলার খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই আমাদের। এ কারণে মামলা করা হয়নি।’ তবে কেউ এগিয়ে এলে, রাষ্ট্র বা কোনও সংস্থার সহযোগিতা পেলে তারা আইনি ব্যবস্থা নিতে চান বলে জানান।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মাদ ইয়াছিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনের সুস্পষ্ট বিধান ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও আর কত তানিয়াকে বিচার না পেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হবে? তাহলে আইনের প্রয়োজন কেন? আইন কি শুধুই প্রভাবশালীদের জন্য থেকে যাবে? আমি মনে করি, থানা-পুলিশকে তাদের দায়িত্ব পালনে সচেতন হওয়া জরুরি। নয়তো মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলবে।’

নিজের অভিজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরে ন্যাশনাল ডমেস্টিক ওমেন ওয়ার্কার ইউনিয়নের (এনডিডব্লিউইউ) আইনজীবী জাহান আরা হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব নির্যাতনের ক্ষেত্রে ধরা পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেই অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীর সঙ্গে দ্রুত আপস করে ফেলে। সেটি তেমন প্রকাশ্যেও আসে না। যে কারণে ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করতে আগ্রহ দেখান না। কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী মামলা করতে না চাইলে পুলিশও বাদী হয়ে মামলা করতে চায় না। তবে বাংলা ট্রিবিউনের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর আমরা খোঁজ নেবো। যদি সুযোগ থাকে, তবে অবশ্যই আমরা বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেবো।’

এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভুক্তভোগী যদি বাদী হয়ে মামলা করতে না চায়, তাহলে এ মামলা টিকবে না। এখন হয়তো তারা ভয়ে মামলা করছে না। পরে দেখা যাবে কেউ সাক্ষীও দেবে না। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—ভুক্তভোগী গরিব হলে অনেকে আছে পয়সাকড়ি পেলে মত পাল্টে ফেলে। তখন তারা বলতে পারে, আমরা মামলা করতে চাইনি, পুলিশ জোর করে নিয়ে মামলা করিয়েছে। এমনটা অনেক হয়েছে।’

সাবেক এই পুলিশ প্রধান আরও বলেন, ‘যদি বড় ধরনের আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই মামলা করতে হবে। আর সেটা ভুক্তভোগীর পরিবার বা তাকে নিজেই বাদী হয়ে মামলা করতে হবে। এখন গৃহকর্মী যদি বাদী হয়ে মামলা করে, তাহলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সে টাকাপয়সা পাবে। এ ছাড়া পুলিশ বাদী হয়ে এই মামলা নিলে একসময় তা নষ্ট হয়ে যাবে।’