থার্টি ফাস্ট নাইট উদযাপনকে কেন্দ্র করে অতীতের বিভিন্ন সময় ঘটে যাওয়া নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায় শেষ পর্যন্ত পুলিশের ওপর আসে। তখন প্রশ্ন ওঠে, পুলিশ কি ঠিকমতো নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে? একদিকে উৎসবকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অন্যদিকে জঙ্গি তৎপরতার কোনও সুযোগ না হওয়া, এসব বিষয় মাথায় রেখেই এই রাতে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কঠোর হয় পুলিশ। তাই কোনও ধরনের বিতর্কে না জড়াতেই পুলিশ থার্টি ফাস্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে।
বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রাজধানীর শাহবাগসহ যেসব জায়গায় তরুণ-তরুণী কিংবা নানা বয়সী মানুষ জমায়েত হওয়ার চেষ্টা করে। সেসব জায়গায় বাড়ানো হয় গোয়েন্দা নজরদারি। পোশাকি পুলিশও দায়িত্ব পালন করে। থানা পুলিশও থানা এলাকায় টহল বাড়ায়। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন বার বন্ধ রাখা হয়। কেউ যেন মদ পান করে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর সুযোগ না পায়, সে অনুযায়ী পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়।
সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, থার্টি ফাস্ট নাইট উদযাপনে তরুণদের মাধ্যমেই বিশৃঙ্খলার ঘটনাগুলো আগে ঘটেছে। বিশেষ করে তরুণদের ভাবা দরকার, তারা নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছে যেন নতুন বছর কল্যাণ বয়ে আনে। এ সময় তারা যদি অপ্রত্যাশিত, শিষ্টাচার বা আচরণবহির্ভূত কোনও কাজ করে, তাহলে সেটি কোনও মঙ্গল বয়ে আনে না। এসব ঘটনা দেশীয় গণমাধ্যম ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও দৃষ্টিগোচর হয়।
তারা বলছেন, শুধু থার্টি ফার্স্ট নয়, যেকোনও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেই নিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়ে পুলিশের ওপর আঙুল তোলা হয়। যখনই পুলিশি নিরাপত্তা ভেদ করে কোনও ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়। থার্টি ফার্স্ট নাইট শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপন করে। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশ অতীত অভিজ্ঞতায় কোনও ধরনের ঝুঁকি নিতে চায় না, সে কারণেই এই রাত উদযাপনে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। খোলা জায়গায় অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেওয়া হয় না। শুধু চার দেয়ালের ভেতর নিজস্ব পরিসরে কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁয় যে যার মতো উদযাপন করতে পারবে।
তরুণ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা বলছেন, শুধু থার্টি ফার্স্ট নয়, উৎসব উদযাপনের জন্য নিরাপত্তা ও কড়াকড়ি থাকাটা যৌক্তিক। কারও সঙ্গে কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা, হাতাহাতি, মারামারি বা কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার সুযোগ থাকবে না, যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সজাগ থাকেন। আগেও থার্টি ফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে অনেক বিশৃঙ্খলার বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, যা তরুণ সমাজের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার জন্য। অনেক সময় আমাদের দেশের যে সংস্কৃতি, তার সঙ্গে মেলে না, এমন কাজকর্মের কারণে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। তখন দায় আসে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেনি বলেই এমন হয়েছে। সে কারণেই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে। আমাদের দেশে কিছু উচ্ছৃঙ্খল তরুণ-তরুণী রাস্তার ওপর বিভিন্ন ধরনের উত্তাপ তৈরি করে। এ ছাড়া অতীতে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নিয়েই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এদিকে জঙ্গিদের হুমকি তো আছেই। কারণ তারা উৎসবকে কেন্দ্র করে তাদের কার্যক্রম করার চেষ্টা করে। সে জন্যই এসব পদক্ষেপ যৌক্তিক বলে আমি মনে করি।’
ডিএমপির সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মিঞা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কড়াকড়ি করা হয়ে থাকে থার্টি ফাস্টের নামে একদল উচ্ছৃঙ্খল তরুণ-তরুণী বিভিন্ন রাস্তায় বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ ও অঙ্গভঙ্গি করে। উন্মুক্ত জায়গায় এমন কিছু করা যায় না, যা জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, সামাজিক প্রেক্ষাপটকে আঘাত করে এবং কারও মূল্যবোধে আঘাত করে। বাংলাদেশি সংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করবে, এমন কোনও কাজ করা যাবে না। কেউ যদি চার দেয়ালের মধ্যে বাসায় বা হোটেল-রেস্তোরাঁয় এ রাত উদযাপন করে, সেখানে কোনও বাধা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘যখন রাস্তায় কোনও ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তখন জঙ্গি সদস্যরা উৎসাহিত হয়। তারা সুযোগ পেয়ে যেকোনও ঘটনা ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলার বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। সে জন্য বলা হয়ে থাকে, চার দেয়ালের মধ্যে উদযাপন করার জন্য। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, সেসব কারণেই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।’
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অতীতে অনেক তিক্ত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের। যদিও থার্টি ফার্স্ট নাইট আমাদের কালচারের কিছু না। এটি একটি গ্লোবাল কালচারের অংশ। বিশ্ববাসী নতুন বছরকে স্বাগত জানায় কিন্তু বিষয়টি হলো আমাদের এখানে ফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে গিয়ে শিষ্টাচারগত যে বাড়াবাড়ি তা ভালোভাবে হয়েছে। অন্যের উদযাপন করার ওপর তার প্রভাব পড়েছে নেতিবাচক।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ করতে হয় অতীত অভিজ্ঞতা থেকে, যাতে সামনের দিনগুলোয় কোনও ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আমাদের দেশের তরুণদের ভাবমূর্তি এবং তাদের আচরণগত শুদ্ধতার জায়গা এবং শিষ্টাচারের জায়গাগুলো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তরুণরাও নিজের প্রতি খেয়াল রাখবেন, যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সবার প্রতি কল্যাণময়তা কামনা করে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে পারি। এমন কোনও কিছু যেন না করি, যাতে প্রশ্ন তৈরি না হয়। অন্যের সম্মানহানি হয়, এ কারণে পুলিশকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সেই অবস্থার সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তরুণদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’