কিছু দিন আগেও যে ময়লার ভাগাড় ছিল দৃষ্টিকটু ও বিরক্তির কারণ, আজ তা সেজেছে রঙিন রূপে। ময়লার ভাগাড়ের এই রূপ জনমনে তো বটেই, আবর্জনা পরিষ্কার করা কর্মীদের মনেও এনেছে পরিবর্তন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাদের কর্মক্ষেত্রের এমন সুন্দর ও রঙিন সাজে বেশ উচ্ছ্বসিত। এই উচ্ছ্বাস ইতিবাচকভাবেই প্রভাব ফেলবে মনোজগতে, বাড়বে কর্মস্পৃহা, এমনটাই মনে করছেন তারা।
ঢাকাকে সবুজ এলাকায় পরিণত করতে ‘মুক্তির সবুজায়ন প্রকল্প’ চালু হয়। এ প্রকল্পে গাছ লাগানো, শিশুদের জন্য পার্ক তৈরি ও সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) ভাগাড়কে দেওয়া হয় নতুন রূপ। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কর্মব্যস্ততার ও সুন্দর নগরের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে ভাগাড়ের দেয়ালে।
গত ২৬ মার্চ মিরপুরে জল্লাদখানা বধ্যভূমির বিপরীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে শক্তি ফাউন্ডেশন এবং মেটলাইফ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এই প্রকল্প উদ্বোধন করেন মেয়র মো. আতিকুর রহমান।
দেয়ালের রঙ মনে লেগেছে মন্তব্য করে জল্লাদখানা বধ্যভূমির এসটিএস ভাগাড় পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আবুল কালাম বলেন, ‘আমাদের সবার মনেই আনন্দ। আগের চেয়ে পরিবেশ ভালো, গেট চাপায়া কাজ করলে কেউ বুঝতেই পারে না ভেতরে ময়লা খালাসের কাজ চলে। কাজ করতেও ভালো লাগছে।’
মানুষ এখন ফিরে তাকায় মন্তব্য করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাসুম বলেন, ‘সুন্দর লাগতাছে, আগে সব ছিল এক কালার, যেন কিছুই নাই, এখন রঙ করায় ভালো দেখায়। একসময় মানুষ হাইট্টা গেলে কেউ আমাগো দিকে চাইতো (দেখতো) না, এখন আমাগো দিকে ঘুইরা তাকায়।’
এসটিএস ভাগাড়ের চিত্রকর্ম আকর্ষণ করছে পথচারীদেরও। চলতি পথে খানিক দাঁড়িয়ে দেখছিলেন ভাগাড়ের নতুন রূপ।
এ বিষয়ে পথচারী জাকির হোসেনের ভাষ্য, ‘এটার দিকে তাকালে মনে হয় সুন্দর কোনও কিছু। আগে ময়লার দিকে কেউ তাকাতো না, এখন অন্তত পেইন্টিংয়ের দিকে তাকায়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দেখে, ভাবে যে ওরা কত পরিশ্রম করে।’
প্রকল্পে নির্মিত শিশুপার্কে ছোট সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা আজাদ বলেন, ‘ময়লার ডাস্টবিন এত সুন্দর করে সাজানো যায়, এটা আসলে না দেখলে বোঝা যায় না। আমার মেয়েই তো মনে করছে ওইটা হয়তো খেলার জায়গা। আগে এসব ডাস্টবিন দূর থেকে দেখেই মাইন্ড সেট ছিল নাকে চাপ দিয়ে কত দ্রুত মাথা নিচু করে পার হওয়া যায়। এখন যেভাবে সাজানো হইছে দূর থেকে কেউ বুঝবেই না এইটা কী।’
এ বিষয়ে ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘সবার সহযোগিতায় আমি সিটি করপোরেশন থেকে পরিত্যক্ত এই জায়গাটিকে নান্দনিকভাবে সাজিয়েছি। এখন এই এলাকার জনগণের দায়িত্ব হবে জায়গাটিকে রক্ষণাবেক্ষণ করা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য শহর গড়তে হলে মাঠ ও পার্কের বিকল্প নাই। খেলার মাঠকে প্লট আকারে বরাদ্দ দিয়ে ভবন নির্মাণ করা যাবে না।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘পরবর্তীতে রাজধানীর বিভিন্ন দেয়াল ও মেট্রোরেলের পিলারেও দৃষ্টিনন্দন চিত্র এঁকে দেওয়া হবে, যাতে কেউ পোস্টার লাগাতে না পারে।’
শক্তি ফাউন্ডেশনের উপনির্বাহী পরিচালক ইমরান আহমেদ বলেন ‘শক্তি ফাউন্ডেশন এ প্রকল্পের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পরিত্যক্ত স্থানসমূহকে সবুজায়নের মাধ্যমে উন্মুক্ত গণপরিসরে পরিণত করছে। এতে শিশুবান্ধব গণপরিসর তৈরির পাশাপাশি ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের মাত্রা হ্রাস পাবে বলে আমরা আশা করি।’
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত অন্যতম স্থান ‘মিরপুর জল্লাদখানা বধ্যভূমি’কে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক ও সবুজ শিশুবান্ধব গণপরিসর গড়ে তোলার লক্ষ্যে জল্লাদখানা স্মৃতিসৌধের বিপরীতে পরিত্যক্ত জমিতে সর্বমোট ১০০০টি গাছ লাগানো হয়েছে। শিশুদের জন্য উন্মুক্ত খেলার জায়গায় লাগানো হয়েছে সবুজ ঘাস। এছাড়াও দুর্গন্ধযুক্ত ও দৃষ্টিকটু আবর্জনা ডাম্পিং করার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস)-কে বিখ্যাত কার্টুনিস্ট সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময় এবং সহশিল্পীরা সাজিয়েছেন নতুন সাজে। উক্ত জল্লাদখানা ও তার পাশের গণপরিসরটিকে আগামী দুই বছর রক্ষণাবেক্ষণ করবে শক্তি ফাউন্ডেশন। যাতে স্থানটি একটি টেকসই সবুজ এলাকায় পরিণত হয়। ডিএনসিসির উদ্যোগে কাজটিতে সহযোগিতা করছে শক্তি ফাউন্ডেশন এবং মেটলাইফ ফাউন্ডেশন।