ইচ্ছেমতো ‘ক্রসিং’ ও ‘ইউটার্নে’ ভোগান্তি বেড়েছে রাজধানীতে

নগরবাসীকে যানজট থেকে মুক্তি দিতে, সড়কে নির্বিঘ্নে যান চলাচল রাখতে—রাজধানীতে নতুন নতুন প্রজেক্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলেও যানজট ও সড়কের বিশৃঙ্খলা থেকে কিছুতেই রেহাই পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। দেখা গেছে, এসব  উন্নয়ন পরিকল্পনার নামে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যে কর্মযজ্ঞ চলছে— অনেক ক্ষেত্রে তা নগরবাসীর দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যানজট নিরসনের লক্ষ্যে যেসব ‘ক্রসিং’ ও ‘ইউটার্ন’ বন্ধ করে দিয়ে নতুন ইউটার্ন নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলোর ফলাফল খুব একটা কাজে আসেনি। পর্যাপ্ত জায়গা না নিয়ে এসব ইউটার্ন নির্মাণ করায় যানজট রয়ে গেছে আগের মতোই। ফলে অপরিকল্পিত এসব ইউটার্ন নগরে নতুন করে যানজট সৃষ্টি করছে বলে নগরবাসীর অভিযোগ।

রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ধানমন্ডি। সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে অনেক ভিআইপির বসবাস এখানে। এছাড়া এলাকাটিতে রয়েছে বিজিবির সদর দফতর, সরকারি-বেসরকারি বহু অফিস। ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোডজুড়ে দেশি-বিদেশি নামিদামি রেস্টুরেন্ট ও পার্টি সেন্টার। আছে ব্যাংক, বিমা ও হাসপাতালের মতো আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ফলে সকাল-সন্ধ্যা সবসময় মানুষের ভিড় থাকে ওই রাস্তাটিতে।

অপরিকল্পিত ইউটার্ন নগরে নতুন করে যানজট সৃষ্টি করছে বলে নগরবাসীর অভিযোগ (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

সাতমসজিদ রোডের পিলখানা গেট থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত নতুন করে সড়ক বিভাজন তৈরি করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। আর এটা করতে গিয়ে সড়কের বেশিরভাগ ইউটার্ন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির চলমান এই প্রকল্পের কারণে শৃঙ্খলার বদলে জেঁকে বসেছে বিশৃঙ্খলা। স্থানীয় বাসিন্দা, রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও বাসচালক এবং এ এলাকায় আগত  মানুষের অভিযোগ, সকাল-বিকাল তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে সাতমসজিদ রোডে। অনেক পথ ঘুরে ইউটার্নে পৌঁছাতে হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হচ্ছে তাদের।

দীর্ঘদিন ধরে ধানমন্ডি এলাকায় বসবাস করে আসছেন বেসরকারি চাকরিজীবী পুলক হাসান। অফিস কাওরান বাজারের দিকে হওয়ায় প্রতিদিনই বাসা থেকে রিকশায় চড়ে তাকে অফিসে যেতে হয়। তার অভিযোগ—প্রায় সব সড়ক ক্রসিং বা ইউটার্ন বন্ধ করে নতুন সড়ক বিভাজন নির্মাণকাজ চলছে অনেক দিন ধরে। ফলে রিকশা নিয়ে আগের মতো সড়ক পারাপার হতে পারছেন না। শুধু রিকশা নয়, সিএনজি অটোরিকশা, প্রাইভেটকারসহ কোনও যানবাহনই আর সহজে সড়ক পার হতে পারছে না। তিনি বলেন, ‘আগে কিছুক্ষণ পর পর ইউটার্ন ছিল। এখন নতুন করে সড়ক বিভাজন নির্মাণ করতে গিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে। আগের চেয়ে যানজটও বেড়েছে কয়েকগুণ।’ তিনি জানান, আগে রিকশা নিয়ে রায়ের বাজার থেকে ধানমন্ডি ১৫ নম্বর হয়ে সরাসরি কলাবাগান যাওয়া যেতো। এখন আবাহনী মাঠের উত্তর পাশ দিয়ে বা বিজিবি গেট ঘুরে যেতে হয়। এতে পথ যেমন বেড়েছে, ভাড়াও বেশি দিতে হচ্ছে।

রাস্তাটি সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সাতমসজিদ রোডের ৩/এ সড়কে আওয়ামী লীগের অফিসের প্রবেশমুখ বরাবর একটি ইউটার্ন, কাছেই আরেকটি আছে বিজিবি গেটের সামনে। এরপর আরেকটি ইউটার্ন আবাহনী ক্লাব মাঠের সামনে। এই দুটি স্থানের মাঝে দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার। অথচ আগে এ সড়কে ধানমন্ডি ২/এ, ৩/এ, ৬/এ, ৭/এ, ৬/এ,৮/এ, ৯/এ, ১০/এ এবং স্টার কাবারের সামনে ১২/এ, শংকরে ১৫/এ সড়ক বরাবর ইউটার্ন ছিল।

গত ৪ বছর ধরে ধানমন্ডি এলাকার বিভিন্ন সড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ট্রাফিক পুলিশের উপ-পরিদর্শক (টিএসআই) খবির উদ্দিন। রবিবার (১৪ মে) বিকালে তিনিসহ ট্রাফিকের পাঁচ জনের একটি টিম দায়িত্ব পালন করছিলেন সাতমসজিদ রোডে ৩/এ সড়কের ইউটার্নের সামনে। উল্টোপথে গাড়ি আসা, ইউটার্নে যানজট সৃষ্টি—এমন নানা বিশৃঙ্খলা সামলাতে হিমশিম খেতে দেখা যায় তাদের। ঝিগাতলা থেকে বের হয়ে সামনে ক্রসিং না থাকায় উল্টোপথে গাড়ি নিয়ে আসা কয়েকজনকে জরিমানা করতেও দেখা গেছে।

সাতমসজিদ রোডে নতুন সড়ক বিভাজনের কারণে নগরবাসীকে আরও বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

ট্রাফিক পুলিশের সদস্য খবির উদ্দিন বলেন, ‘নতুন করে রোড ডিভাইডার নির্মাণের পর সবচেয়ে বড় সমস্যা উল্টোপথে গাড়ি চলাচল। কাছে কোনও ইউটার্ন খুঁজে না পাওয়ায় চালকরা ঘুরে না গিয়ে উল্টোপথে আসছেন। ফলে মুহূর্তে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউটার্নের প্রবেশমুখগুলো ছোট। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে আরও নতুন ইউটার্ন তৈরি হয়েছে, এখানকারগুলো সেগুলোর মতো বড় না। যে কারণে দুদিক থেকে গাড়ি এসে যখন  ঘুরতে যায়, তখন অনেক গাড়ি চারদিকে আটকা পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। সকালে অফিস টাইমে এবং বিকাল ৫টার পর যানজট বেশি হয়। রাস্তা সংস্কার করায় যেমন সুবিধা হয়েছে, তেমনই অসুবিধাও হচ্ছে।’

রিকশাচালক আব্দুস সালাম বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে এ রোডে রিকশা চালাই। আগে অনেক কাটাপথ ছিল। ভেতরের গলি থেকে বের হয়ে সহজে বড় রাস্তা পার হতে পারতাম। এখন অনেক পথ ঘুরে যেতে হয়। যাত্রীদের কাছে বেশি ভাড়া চাইলে অনেকে দিতে চান না। এমন তো আগে ছিল না। দ্রুত যাওয়ার জন্য অনেক যাত্রী উল্টোপথে যেতে বলেন। তখন সমস্যা হয়, পুলিশ ধরে গাড়ি উল্টিয়ে রাখে।’

রাজধানীতে যানজট নিরসনে ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল তেজগাঁওয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ সরণি, বিমানবন্দর সড়ক ও উত্তরা হাউজ বিল্ডিং পর্যন্ত বিভিন্ন সড়কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ১০টি ইউটার্ন চালু করেছিল। এসব ইউটার্ন পর্যাপ্ত জায়গা নিয়ে নির্মাণ না করায় সড়কে প্রায়ই যানজট লেগে থাকে। বিশেষ করে মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে, তেজগাঁও নাবিস্কো মোড় এবং সাত রাস্তার বিজি প্রেস এলাকায় ইউটার্নগুলোতে যানজট লেগেই থাকে। অতিরিক্ত যানজটের কারণে তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগ ইতোমধ্যে বন্ধ করে রেখেছে সাত রাস্তার বিজি প্রেস এলাকার ইউটার্নটি।

এ প্রসঙ্গে ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের ডিসি মো. সাহেদ আল মাসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইউটার্নগুলো পর্যাপ্ত জায়গা নিয়ে নির্মাণ করা হয়নি। রাস্তার চারপাশে বড় বড় বিল্ডিং। সুতরাং, রাস্তার মাঝখানে ইউটার্নগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে রাস্তার একপাশ সরু হয়ে গেছে। এতে যানজট কমেনি। এ এলাকায় অতিরিক্ত যানজটের কারণে আমরা ইতোমধ্যে সাত রাস্তার বিজি প্রেস এলাকার ইউটার্নটি বন্ধ করে রেখেছি। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে নগরবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই বিষয়গুলো কোনও সাধারণ জ্ঞানের বিষয় না। এগুলো যথেষ্ট পরিকল্পনা, গবেষণা ও প্রকৌশলীদের সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে যথেষ্ট কারিগরি গবেষণা করে—তারপর ঠিক করা হয় কাজটি কীভাবে হবে। ধানমন্ডিতে সাত মসজিদ রোডের বিষয়ে আমি জানি। আমরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছি—সেখানে পথচারী ও যানবান্ধব কিছু করা যায় কিনা। তারপরও সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে কোথাও কোথাও ইউটার্ন নিয়ে যে পদ্ধতিতে সড়কটি করা হয়েছে, এটি একেবারে অপরিকল্পিত ও অপ্রকৌশলগত এবং অবৈজ্ঞানিক। রাজধানীতে রামপুরা ও বাড্ডার ইউটার্ন দুটি ছাড়া অন্যগুলো সেভাবে পরিকল্পনা করে নির্মাণ করা হয়নি। জমি অধিগ্রহণ করে তারপর সেগুলো নির্মাণ করা দরকার ছিল। এসব ইউটার্ন এখন বন্ধ হতে বাধ্য।’

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী সালেহ আহমেদকে ফোন করা হলে তিনি সাতমসজিদ রোডের প্রজেক্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. খায়রুল হাসানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। খায়রুল হাসানের কাছে ফোন করা হলে তিনি এ ব্যাপারে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. রাসেল সাবরিনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। রাসেল সাবরিনকে ফোন করলে তার অফিসের নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে এর আগে গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা জানিয়েছিলেন, ‘ট্রাফিক ও সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে শুধু ক্রসিং রাখা হয়েছে।’