রাজধানীর হাজারীবাগে ভূমি ব্যবসায়ী এখলাছকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী মনির হোসেন ওরফে কোম্পানি মনিরসহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগ (ডিবি)।
শনিবার (২২ জুলাই) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ এ তথ্য জানান।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো– আবদুর রহমান ওরফে রহমান কাল্লু, মো. এসহাক, ফয়সাল, মনির হোসেন ওরফে কোম্পানি মনির ও ঝন্টু মোল্লা।
শুক্রবার (২১ জুলাই) ডিবির প্রথম টিম রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড ও কেরানীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে আবদুর রহমান ও মো. এসহাককে গ্রেফতার করে। একই দিনে মাগুরা জেলা এবং যশোরের বেনাপোল পোর্ট থানা এলাকা থেকে ফয়সাল এবং মনির হোসেনকে গ্রেফতার করে ডিবির অপর দুটি টিম। এর আগে, বৃহস্পতিবার (২০ জুলাই) ঢাকা বিমানবন্দর এলাকা থেকে ঝন্টু মোল্লাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানায় ডিবি।
ডিবি প্রধান বলেন, ‘গত ২৮ জুন রাত সাড়ে ১০টায় ব্যবসায়ী এখলাছ বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেন না। আত্মীয়-স্বজন তাকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে থানায় জিডি করেন। ঈদের পরের দিন সকালে হাজারীবাগ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের পশ্চিম পাশে কাঁটাতারের বেড়াঘেঁষা প্রান্তে সাদা রঙের প্লাস্টিকের বস্তায় এক ব্যক্তি লাশ উদ্ধার করে কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশ। এখলাছের আত্মীয়-স্বজন সেখানে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। হত্যা এবং লাশ গুমের ধারায় ওইদিন একটি নিয়মিত মামলা হয় কামরাঙ্গীরচর থানায়। পরে হত্যা মামলাটির রহস্য উদঘাটনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগ ছায়া তদন্ত শুরু করে।’
মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘গুমের ঘটনায় ভ্যানচালক এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটনস্থলের টপ টেইলার্সের মালিককে গ্রেফতার করে কামরাঙ্গীরচর থানা-পুলিশ। আদালতের মাধ্যমে তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়। ৭ জুলাই মামলাটির তদন্তভার ডিবি লালবাগ বিভাগকে দেওয়া হয়। দুই জনের স্বীকারোক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে ডিবি পুলিশ ওই পাঁচ জনকে শনাক্ত করে।’
তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সমন্বয়কারীদের একজন ঝন্টু মোল্লা ঘটনার পর ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে যথাক্রমে থাইল্যান্ডে পালিয়ে যায়। ২০ জুলাই থাইল্যান্ড থেকে ঢাকায় আসার সময় বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকা থেকে পাসপোর্টসহ গ্রেফতার হয়। ঝন্টু মোল্লা মূলত শূন্য থেকে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়া মো. মনির হোসেন ওরফে কোম্পানি মনিরের ক্যাশিয়ার। ঝন্টু চার দিনের পুলিশ রিমান্ডে আছে। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে ডিবি লালবাগ বিভাগের একাধিক টিম অভিযানে নামে। পরে বাকি চার জনকে গ্রেফতার করা হয়।’
গ্রেফতারের পর কোম্পানি মনিরের কাছ থেকে দুটি বাংলাদেশি পাসপোর্ট, একটি মোবাইল ফোন, ২২ হাজার টাকা, পাঁচ হাজার ইন্ডিয়ান রুপি উদ্ধার করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পাসপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৫ জুলাই সকালে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে কলকাতায় পালিয়ে যায় সে।’
ডিবি প্রধান বলেন, ‘হত্যাকাণ্ড এবং কোরবানির ঈদ পরবর্তী চামড়ার ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু বিষয়ে গোপন কাজের জন্য থাইল্যান্ড থেকে ঢাকায় আসে ঝন্টু। কলকাতা থেকে চোরাই পথে বেনাপোল দিয়ে যশোরে প্রবেশ করে কোম্পানি মনির। কাজ শেষে আবার একই পথে পালিয়ে যাওয়ার সময় সে গ্রেফতার হয়।’
মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘হাজারীবাগ এবং সাভার এলাকায় একাধিক ট্যানারি কারখানার মালিক কোম্পানি মনির একজন ভূমি দস্যু। সে বিভিন্ন সময় এখলাছকে দিয়ে জায়গা দখল এবং ক্রয়-বিক্রয়ের কাজ করিয়েছে। কামরাঙ্গীরচর থানার সিএস ২২ দাগের একটা বড় জমিতে এখলাছের ৪০ শতক জায়গা আছে, যার অধিগ্রহণ মূল্য কোটি কোটি টাকা। কোম্পানি মনির এই জায়গাটি নিজের দখলে নিয়ে অধিগ্রহণ মূল্য গ্রাস করতে চেষ্টা চালায়। এই চেষ্টা রোধ করতে এখলাছ একাধিক মামলা দায়েরসহ ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ করেন। নানা কৌশল করে ব্যর্থ হয়ে কোম্পানি মনির এই হত্যার পথ বেছে নেয়।’
তিনি বলেন, ‘২০০২ সালে সিকদার পেট্রোল পাম্পের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় রুহুল আমিনকে। ওই হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ছিল কোম্পানি মনির। ২০১৫ সালে ইফতারের আগ মুহূর্তে জসিম ওরফে গুন্ডা জসিম নামে একজনকে হাজারীবাগ বাজারে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের বাহিনী দিয়ে গুলি করে হত্যা করায় সে।’
কোম্পানি মনির শূন্য থেকে চার-পাঁচটি ট্যানারির মালিক হয়ে ওঠে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘নোয়াখালীর দিনমজুর আবদুর রহিমের ছেলে মনির হোসেন ওরফে কোম্পানি মনির। ৭০ এর দশকে হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানায় ডেইলি লেবারের কাজ করতেন আব্দুর রহিম। ১৯৮০ থেকে ৮২ সালে তার সঙ্গে কোম্পানি মনির ট্যানারি কারখানায় অবস্থান করে চামড়ার গায়ের ময়লা পরিষ্কারের কাজ নেয়। পরে সন্ত্রাসী ইমনের পৃষ্ঠপোষকতায় নিজেই কাঁচা চামড়া কেনাবেচা শুরু করে। সঙ্গে চলে ভূমি দখল ও ভূমির ব্যবসা।’