ঢাকার বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে কেন

জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভয়াবহ যানজট, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ ও দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনার কারণে দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। বৈশ্বিক বাসযোগ্যতার সূচকেও আগের মতোই তলানির দিকে রয়েছে শহরটি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)-এর ‘গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬’ অনুযায়ী, ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৪২ স্কোর নিয়ে বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহরের তালিকায় রয়েছে ঢাকা।

বিশ্বের শহরগুলোর স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো; এই পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে প্রতিবছর তালিকাটি প্রকাশ করা হয়। ইআইইউ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার বাসযোগ্যতার উল্লেখযোগ্য কোনও উন্নতি হয়নি। বরং ধারাবাহিকভাবে অবনতি ঘটেছে। এমনকি দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভও বাসযোগ্যতার সূচকে ঢাকার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

বর্ষা এলেই রাজধানীতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

গত কয়েক বছরের অবস্থানও একই চিত্র তুলে ধরে। ২০২১ সালে ১৪০ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৩৭তম। ২০২২ সালে ১৭২ শহরের মধ্যে ১৬৬তম, ২০২৩ সালে ১৭৩ শহরের মধ্যে ১৬৬তম, ২০২৪ সালে নেমে যায় ১৬৮তম স্থানে। আর ২০২৫ সালে ১৭৩ শহরের মধ্যে ১৭১তম অবস্থানে ছিল ঢাকা। অর্থাৎ টানা কয়েক বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলোর অন্যতম হয়ে আছে রাজধানী।

এই ধারাবাহিক অবনতি স্পষ্ট করে যে ঢাকার জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার বদলে আরও নাজুক হচ্ছে। ফলে কীভাবে রাজধানীকে আবারও বাসযোগ্য শহরে পরিণত করা যায়; তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীও।

ঢাকার বাসযোগ্যতা নিয়ে ‘সিরিয়াস’ হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ইআইইউর বাসযোগ্যতার সূচকে ঢাকার অবস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বায়ুদূষণের বিভিন্ন ইনডেক্সে প্রায়শই শীর্ষে থাকে ঢাকা

সম্প্রতি রাজধানীর চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা-২০২৬’ এবং ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার কোনও সুযোগ নেই। ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে।

শুধু ঢাকাকে নয়, ভাবতে হবে পুরো দেশকে

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহ-সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঢাকার সমস্যা সমাধান করতে হলে শুধু রাজধানীকে নয়, পুরো দেশকে একসঙ্গে পরিকল্পনায় আনতে হবে।

তার ভাষায়, মানুষ যেখানে কর্মসংস্থান পায়, সেখানেই যায়। কিন্তু বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় পুরোপুরি ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষের ঢল থামছে না।

তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে কোন অঞ্চলে কী ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে তোলা হবে, সেই পরিকল্পনা নেই। স্বাধীনতার পর থেকেই এলোমেলো নগরায়ণের ফলে সব চাপ এসে পড়েছে ঢাকার ওপর।

যানজটও ঢাকার নিয়মিত চিত্র। ছবি: নাসিরুল ইসলাম

গার্মেন্টস থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানার অধিকাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় রাজধানীর ওপর চাপ ক্রমেই বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘জাতীয় স্পেশাল প্ল্যান ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়’

মেহেদী আহসানের মতে, কেবল মেট্রোরেল বা নতুন সড়ক নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

তিনি বলেন, জাতীয় জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে হবে। অন্যথায় মানুষ ঢাকায় আসতেই থাকবে, যানজট ও জনঘনত্বও বাড়তেই থাকবে।

‘ড্যাপ আছে, বাস্তবায়ন নেই’

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে আশু করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, সমাধানের পথ অজানা নয়। সমস্যা হলো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া।

ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)

তার ভাষায়, ২০০৮ সালে প্রণীত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) বারবার সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমান ড্যাপ নিয়েও আবার সংশোধনের দাবি উঠছে।

পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়নই না হয়, তাহলে ফল আসবে কীভাবে? স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে, বলেন তিনি।

‘জনসংখ্যার চাপ কমাতে হবে’

মেহেদী আহসানের মতে, ঢাকায় কত মানুষ থাকবে, চট্টগ্রাম, সিলেট, পঞ্চগড় কিংবা পাইকগাছায় কত মানুষ থাকবে—এ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সারাদেশ থেকে কাজের খোঁজে ঢাকায় আসে মানুষ। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমে আসবে।

‘দুর্নীতিগ্রস্ত নগর ব্যবস্থাপনাও বড় কারণ’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, একটি শহর বাসযোগ্য রাখতে হলে ভালো পরিকল্পনা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং জনসম্পৃক্ততা—এই তিনটি বিষয় জরুরি। কিন্তু ঢাকায় এর কোনোটিই কার্যকরভাবে হয়নি।

তিনি বলেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। বরং দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে।

তার মতে, পরিকল্পনার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পাওয়ায় খাল, জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থান ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে নগর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

‘রিয়েল এস্টেটের প্রভাবেই বদলে যায় পরিকল্পনা’

ড. আদিল মুহাম্মদ খানের অভিযোগ, নগর পরিকল্পনা অনেক সময় পরিকল্পনাবিদদের নয়, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রিয়েল এস্টেট খাতের স্বার্থে পরিবর্তন করা হয়।

কোটি মানুষের শহর ঢাকা

তিনি বলেন, ড্যাপ বারবার সংশোধনের পেছনেও এসব গোষ্ঠীর চাপ রয়েছে। ফলে পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

‘আইন প্রয়োগ না হলে বদলাবে না ঢাকার ভাগ্য’

তার মতে, শুধু নতুন প্রকল্প নয়, বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নই হতে পারে ঢাকাকে বাসযোগ্য করার সবচেয়ে বড় উপায়।

তিনি বলেন, রাজউক, পরিবেশ অধিদফতর ও সিটি করপোরেশন যদি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতো, তাহলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না।

দুই-একটি বড় প্রকল্প হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু একই সময়ে আরও অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ফলে ঢাকা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না, বলেন তিনি।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে জলাশয় রক্ষা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে রাজধানীর সংকট আরও গভীর হবে বলেও সতর্ক করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।