গাবতলী-পোস্তগোলা ৮ লেন সড়কের স্বপ্ন কি ভেস্তে যাবে?

ঢাকার যানজট কমাতে এবং রাজধানীর ভেতর দিয়ে আন্তজেলা যানবাহনের চাপ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হয়েছিল গাবতলী-পোস্তগোলা করিডোরকে আট লেনের সড়কে উন্নীত করার পরিকল্পনা। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরের মাত্র ৫ কিলোমিটার অংশে নির্মাণকাজ চলছে। ফলে উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্পটিও শেষ পর্যন্ত পরিত্যক্ত অবকাঠামো প্রকল্পের তালিকায় ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পটির মূল সময়সীমা ছিল ২০২৬ সালের জুন। অথচ এখনো করিডোরটির বড় একটি অংশ সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিকল্পনা, নকশা ও অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপে আটকে আছে।

গাবতলী-পোস্তগোলা করিডোরটি প্রস্তাবিত ৮৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ইনার সার্কুলার রিং রোডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই রিং রোডের মূল উদ্দেশ্য হলো পদ্মা সেতু ও দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা যানবাহনকে ঢাকার কেন্দ্রীয় অংশে প্রবেশ না করিয়ে সাভার, উত্তরা ও গাজীপুরের সঙ্গে যুক্ত করা। এতে রাজধানীর ভেতরের যানজট কমানোর পাশাপাশি আন্তজেলা যানবাহনের জন্য একটি বিকল্প পথ তৈরি হওয়ার কথা।

কিন্তু অর্থায়ন, প্রশাসনিক অনুমোদন, সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে বছরের পর বছর ধরে প্রকল্পটি এগোচ্ছে খণ্ডিতভাবে।

প্রস্তাবিত ৮৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার রিং রোডের মধ্যে এখন পর্যন্ত নির্মাণাধীন মাত্র প্রায় ৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ পুরো নেটওয়ার্কের মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অংশ বাস্তবায়নের পথে।

৫ কিলোমিটারে কাজ চলছে, বাকিটা অনিশ্চিত

গাবতলী-পোস্তগোলা করিডোরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে রায়েরবাজার স্লুইসগেট থেকে কামরাঙ্গীরচরের লোহার ব্রিজ পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার অংশ বাস্তবায়ন করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

‘ইনার সার্কুলার রিং রোডের রায়েরবাজার স্লুইসগেট থেকে লোহার ব্রিজ পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্পটি ২০২৩ সালের শেষ দিকে একনেকে অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং কাজ শেষ করার সময়সীমা ছিল ২০২৬ সালের জুন।

প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ ফুট প্রশস্ত বিদ্যমান সড়কটি প্রায় ১৪০ ফুটে প্রশস্ত করে আট লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি লেন দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য এবং চারটি সার্ভিস লেন স্থানীয় যানবাহনের জন্য ব্যবহারের কথা।

এ ছাড়া তিনটি যানবাহন ওভারপাস, তিনটি ফুটওভারব্রিজ, ছয়টি যাত্রী ছাউনি, ছয়টি বাস-বেস, ফুটপাত, কংক্রিটের ড্রেন, রিটেইনিং ওয়াল ও এলইডি সড়কবাতি নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি।

ডিএসসিসির প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মিঠুন চন্দ্র শীল বলেন, প্রকল্পের দুটি অংশের মধ্যে একটির প্রায় ৪৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

তিনি বলেন, “অন্য অংশের কাজ এখনো শুরু হয়নি। এর নকশা ও ডিজাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে কাজ শুরু হয়নি। ওই অংশের তদারকির দায়িত্ব ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ)। প্রয়োজনীয় নথিপত্র আমরা তাদের দিয়েছি।”

অপরদিকে লোহার ব্রিজ থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার অংশ এখনো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। গাবতলী থেকে রায়েরবাজার অংশও পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজে যায়নি।

অর্থাৎ ১৭ কিলোমিটার করিডোরটির কোনও অংশেই এখন পর্যন্ত একটানা নির্মাণকাজ এগোচ্ছে না।

রিং রোডের প্রকল্প, কিন্তু নেই সমন্বিত পরিকল্পনা

প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (আরএইচডি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ইনার সার্কুলার রিং রোড প্রকল্পের জন্য বর্তমানে আরএইচডিতে কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্প পরিচালক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নেই।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে তারা নির্দিষ্ট কোনও বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

সূত্রটি আরও জানিয়েছে, প্রকল্পটি নতুন করে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা ডিপিপি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেওয়ার একটি প্রস্তাব করা হয়েছে। সেটি এগোলে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে আবারও নতুন পরিকল্পনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।

অর্থাৎ বছরের পর বছর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পরও প্রকল্পটি আবার নতুন করে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ঢোকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, সমস্যার মূল জায়গাটি হলো সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব।

তিনি বলেন, “ইনার সার্কুলার রোডের পরিকল্পনা অনেক আগে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটি নির্মাণের জন্য কখনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।”

তার মতে, বিভিন্ন সংস্থা সড়কটির বিভিন্ন অংশ বাস্তবায়ন করছে।

তিনি বলেন, “কোনও অংশ সিটি করপোরেশন, কোনো অংশ সড়ক ও জনপথ অধিদফতর এবং কোনও অংশ সেতু কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে একটি সড়ক নির্মাণে টুকরো টুকরো পদ্ধতি তৈরি হয়েছে।”

এ কারণে কোন অংশ আগে হবে, বিভিন্ন অংশ কখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং পুরো রিং রোড কবে চালু করা সম্ভব হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা নেই।

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “রিং রোডের উদ্দেশ্য হলো শহরের অভ্যন্তরীণ চলাচল কমানো এবং আঞ্চলিক যানবাহনকে শহর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া। সে জন্য শুরু থেকেই একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল। সেই পরিকল্পনার অধীনেই সব বাস্তবায়নকারী সংস্থার কাজ করা উচিত ছিল।”

শুধু ইউটিলিটি সরাতেই লাগবে ১২০ কোটি টাকা

প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন ইউটিলিটি বা সেবা সংযোগ স্থানান্তরও।

শুধু রায়েরবাজার-লোহার ব্রিজের ৫ কিলোমিটার অংশেই ৫৬৫টি বিদ্যুতের খুঁটি ও আটটি টাওয়ার সরাতে হবে। এ কাজের জন্য ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) আওতায় প্রায় ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় শহরের সড়ক প্রকল্প শুরুর আগেই সংশ্লিষ্ট সব ইউটিলিটির পূর্ণাঙ্গ ম্যাপিং করা জরুরি। তা না হলে নির্মাণকাজের সময় বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগের সংযোগ সরাতে গিয়ে প্রকল্পের সময় ও ব্যয়—দুটিই বাড়ে।

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সড়ক প্রশস্ত করার ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ, স্থাপনা সরানো এবং বিভিন্ন সেবা সংযোগ স্থানান্তরের মতো বিষয়ও শুরুতেই পরিকল্পনায় রাখতে হয়।

পরিকল্পনার পর্যায়ে এসব বিষয়ে সমন্বয় না থাকলে একই জায়গায় বারবার নির্মাণকাজ করতে হয়। এতে যেমন প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে, তেমনি দীর্ঘ সময় ধরে ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরবাসীকে।

অর্থায়নেও কাটেনি অনিশ্চয়তা

ইনার সার্কুলার রোডের বৃহত্তর প্রকল্পটি অর্থায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সরকারি অর্থায়ন ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এখনো একটি সুস্পষ্ট ও স্থায়ী অর্থায়ন কাঠামো নিশ্চিত হয়নি।

এ ছাড়া প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন এবং কারিগরি প্রয়োজনীয়তার পরিবর্তন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব কারণেই রিং রোডের বিভিন্ন অংশের কাজ ধীরগতিতে এগিয়েছে।

ফলে ঢাকার যানজট কমাতে এবং আন্তজেলা যানবাহনকে রাজধানীর কেন্দ্র এড়িয়ে চলাচলের সুযোগ দিতে যে ইনার সার্কুলার রিং রোডের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, সেটি কবে বাস্তবে পূর্ণাঙ্গ রিং রোডে পরিণত হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।