মাস্টার্স পাস করে বাস চালাবেন। সিদ্ধান্তটি শুনে পরিবার-পরিজনের অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের প্রশ্ন, মাস্টার্স পাস করা একজন নারী কেন বাসচালক হবেন? তবে সেই প্রশ্নকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন মোসা. রাবেয়া খাতুন। তার কাছে বাস চালানো শুধু একটি পেশা নয়, বরং নতুন কিছু করার এবং দেশ পরিবর্তনের চেষ্টার অংশ।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে নারীদের জন্য বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’-এর উদ্বোধন করা হয়। এর আগে রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের।
রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘এই কাজটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। পরিবার তো আসলে কখনোই এর পক্ষে না। তারা বলছেন, আমি মাস্টার্স পাস। ঢাকা ইউনিভার্সিটির অধীনে তিতুমীর কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেছি। সেহেতু তাদের ধারণা, বাংলাদেশ আসলে এটা ডিজার্ভ করে না যে একজন মাস্টার্স পাস মেয়ে একজন চালক হিসেবে কাজ করবে।’
তবে রাবেয়া বাসচালক হিসেবে নিজের পরিচয়টাকে অন্যভাবে দেখতে চান। তিনি বলেন, ‘কিন্তু এটাকে চালক না ভেবে যদি আমি নিজেকে পাইলট ভাবি, তাহলে আমার অপরাধটা কী? কোনও অপরাধ নাই। আমি তো এটাই ভেবে কাজ করতে পারি।’
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাবেয়া বলেন, ‘আমি যখন ব্র্যাকে জব করতাম, তখন আমার সামনে, আমার হাত দিয়ে অনেক ভালো ভালো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং বড় বড় ফ্যামিলির সন্তানরা, যারা ব্র্যাকে ড্রাইভিং শিখে গিয়েছে বা বিআরটিসি ড্রাইভিংয়ের যে প্রশিক্ষণ সেন্টার, সেখানে ড্রাইভিং শিখে বাইরের কান্ট্রিতে তারা পার্টটাইম হিসেবে কাজ করে।’
তার ভাষ্য, বিদেশে গিয়ে অনেকেই ড্রাইভিং করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি পড়াশোনার খরচ চালান। বাংলাদেশ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে পড়াশোনা করতে গেছেন, এমন লোক খুবই কম। সেখানে তারা নিজেরাই রোজগার করে চলার চেষ্টা করেন।
রাবেয়া প্রশ্ন রাখেন, ‘তো এটা যদি বহির্বিশ্বে গিয়ে আমরা করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে এটা কেন করতে পারবো না?’
তার উত্তরও স্পষ্ট। বলেন, ‘আমরাই নতুন করে সৃষ্টি করবো, আমরা আমাদের দেশটাকে চেঞ্জ করার চেষ্টা করবো, যদি নতুন কিছু করা যায়। আমি সেটার লক্ষ্যেই আছি।’
‘নারীদের জন্য বেশি ভালো হবে’
পিংক বাসের আরেক চালক সুপ্রিয়া কুন্ডুর কাছেও এটি নতুন কিছু শেখার সুযোগ। নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবাই তো ড্রাইভিং করে। দেশের বাইরে যাক বা দেশের মধ্যে থাক, সবাই ড্রাইভিং করে। কিন্তু আমার শেখার ইচ্ছা ছিল। তারপর যখন আমার এখানে জয়েনিং হলো, আমি এখানে আসলাম। এরপর আমাদের বাস সার্ভিসের জন্য ট্রেনিং দেওয়া হলো। তো অনেক ভালো লাগলো যে নতুন একটা জিনিস শিখবো।’
সুপ্রিয়া বলেন, যেকোনও কিছু শেখার প্রতি তার আগ্রহ রয়েছে। পিংক বাসে নারী চালক ও কন্ডাক্টর থাকায় নারীদের জন্য এটি বেশি ভালো হবে বলেও মনে করেন তিনি।
তার মতে, বর্তমানে অনেক ছোট ছোট মেয়েকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এ কারণে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে মায়েদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে। নির্দিষ্ট রুটে পিংক বাস চললে সন্তানদের নিরাপদে যাতায়াত নিয়ে মায়েরা নিশ্চিন্ত হতে পারবেন।
তিনি বলেন, ‘তারা যদি দেখে যে তাদের রুটের ভেতর তাদের গাড়িটা চলে, তাহলে তারা নিশ্চিন্তে থাকবে যে এই গাড়ি এই টাইমিংয়ে আসে বা এই সময়ে যায়, ওই বাসগুলোতেও উঠছে। তার মানে আমার মেয়েটা সেফলিভাবে বাসায় আসতে পারবে।’
সড়কে চলাচলকারী অন্য যানবাহন চালকদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন না সুপ্রিয়া। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় যারা ড্রাইভার থাকবেন, তারা আমাদের প্রতিযোগী না। তারা আমাদের সহযোগী।’
সিএনজি, রিকশা বা অটোরিকশার চালকদের কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যাই চালান না কেন, তারা আমাদের কোনও প্রতিযোগী না। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তো আমরা নামিনি। আমরা এসেছি মহিলাদের একটা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য।’
‘একজন নারী হিসেবে খুবই আনন্দিত’
আরেক চালক রিমাও পিংক বাসের অংশ হতে পেরে আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, ‘আমি একজন নারী চালক। এই পিঙ্ক বাস যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে, আমি এই পিঙ্ক বাস পরিচালনার একটি অংশ হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পেরে খুবই আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।’
নারীদের পেশা নিয়ে প্রচলিত ধারণার কথাও তুলে ধরেন তিনি। রিমা বলেন, ‘আমরা নারী বলতে খুবই নরম স্বভাবের হয়ে থাকি। আমরা শুধু নারী সেক্টরকে বোঝাই, গার্মেন্টস সেক্টর, বিভিন্ন নরমাল যে আমরা বেসরকারি বা সরকারি খুব ছোট প্রফেশন, আমরা বোঝাই। তো সেখানে আমরা যে এত বড় পিঙ্ক বাস সার্ভিস পরিচালনা করবো, আমি একজন নারী হিসেবে এখানে অংশগ্রহণ করতে পেরে খুবই আনন্দিত।’
প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে রিমা বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মাননীয় কর্মকর্তাদের। আমাদের নারীদের শুধু এখানে কর্মসংস্থান নয়, মহিলা যে যাত্রীদের আমরা নিয়ে যাবো এবং সঠিকভাবে গন্তব্যস্থলে নিয়ে আসবো, এটার আমাদের সাহস প্রদান করার জন্যও ধন্যবাদ।’
১৩ রুটে ১৪ বাস
নারী যাত্রীদের যাত্রা যাত্রীবান্ধব ও নিরাপদ করতে মঙ্গলবার ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’ চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। নারীদের জন্য বিশেষ এই গোলাপি রঙের বাসে চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নারীরা।
নারীদের জন্য ১৪টি বাস ১৩টি রুটে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি রুটে ১০টি বাস চলবে। একটি বাস একতলা এবং বাকি নয়টি দ্বিতল। চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস এবং বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
রাবেয়াদের কাছে তাই পিংক বাসের স্টিয়ারিং শুধু একটি গাড়ি চালানোর দায়িত্ব নয়; প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের মতো করে নতুন কিছু করারও একটি সুযোগ।