জ্বালানি তেলের বাড়তি দামে উত্তপ্ত কাঁচাবাজার

তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তবে এর একদিন পর থেকেই রাজধানীর বাজারে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। গতকাল থেকে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কোনও কোনও পণ্যের দাম বেড়েছে আরও বেশি। ফলে স্বস্তির বদলে নিত্যপণ্যের বাজারে আবারও অস্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।

দাম বাড়ার এ চাপে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ। সীমিত আয়ের সঙ্গে বাড়তি খরচ সামলাতে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে অনেককেই পণ্যের পরিমাণ কমাতে কিংবা প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য কেনা বাদ দিতে হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

বেড়েছে বেশিরভাগ সবজির দাম

সবজির বাজারে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা দেখা গেছে। গত সপ্তাহে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া গোল বেগুন এখন ১৬০ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। লম্বা বেগুন অবশ্য আগের মতোই ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ঝিঙের দামও ২০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে।

১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া গাজর এখন ১৪০ টাকা। লাউয়ের দামও বেড়েছে। গত সপ্তাহে প্রতিটি লাউ ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা। মিষ্টি কুমড়ার দাম ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা কেজি হয়েছে।

ধুন্দুল, চিচিঙ্গা ও করলা আগের মতো ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ঢেঁড়স ৬০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকা, শসা ৬০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ধুপখোলা বাজারের সবজি বিক্রেতা ইয়ামিন মোল্লা বলেন, ‘পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। তাই কিছু সবজির দাম বেড়েছে। তবে সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়েনি।’

সবজি কিনতে আসা শিমুল মিয়া বলেন, ‘বাজারে এসে দেখছি প্রায় প্রতিটি সবজির দামই আগের তুলনায় বেড়েছে। প্রয়োজনীয় বেশিরভাগ সবজি বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তেল-গ্যাসসহ বিভিন্ন জিনিসের দাম বাড়লে তার প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়ে। এতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় মধ্যবিত্তদের।’

মাছের বাজারে এখনই প্রভাব নেই

মাছের বাজারে আপাতত বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। পাঙাশ প্রতি কেজি ২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০ টাকা, চিংড়ি মানভেদে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ট্যাংরা ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং মাঝারি আকারের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছের দাম হাজার টাকার বেশি।

ইলিশের দাম অবশ্য কেজিতে প্রায় ৩০০ টাকা কমেছে। আগে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হওয়া ইলিশ এখন ১ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ১ হাজার ৬০০ টাকার ইলিশের দাম কমে হয়েছে ১ হাজার ৩০০ টাকা। সব আকারের ইলিশের দামই কমেছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

রায়সাহেব বাজারের মাছ বিক্রেতা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মাছের দাম মূলত সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। আড়ত থেকে যে দামে মাছ কিনে আনি, তার ওপর ভিত্তি করেই খুচরা দাম নির্ধারণ করতে হয়। এখন পর্যন্ত মাছের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে। তবে সবকিছুর দাম বাড়তে শুরু করেছে, ফলে মাছের দামও বাড়তে পারে।’

মুরগি-ডিমের দামও চড়া

বাজারে তুলনামূলক চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ফার্মের মুরগি ও ডিম। বৃহস্পতিবার ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দেড় মাস আগে এর দাম কেজিতে প্রায় ২০ টাকা কম ছিল।

বর্তমানে বাদামি রঙের ফার্মের ডিম প্রতি ডজন ১৫০ টাকা এবং সাদা ডিম ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকানে দাম আরও বেশি। গতকাল সোনালি মুরগি প্রতি কেজি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং হাইব্রিড বা কালারবার্ড সোনালি মুরগি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত এক-দুই সপ্তাহে এসব পণ্যের দাম কমেনি।

ডিম বিক্রেতা মহসিন হাসান বলেন, ‘অতিবৃষ্টি ও গরমে অনেক খামারে ডিম পাড়া ও ব্রয়লার মুরগির সংখ্যা কমেছে। পাশাপাশি মুরগির খাবারের দামও বেড়েছে। তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। সব মিলিয়ে ডিমের দাম কমার সম্ভাবনা নেই, বরং সামনে আরও বাড়তে পারে।’

মুরগি কিনতে আসা আসাদ রহমান বলেন, ‘ডিম ও মাংসের দাম কয়েক সপ্তাহ ধরে একই রকম রয়েছে। এতে মোটামুটি স্বস্তি ছিল। কিন্তু দুই দিন আগে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব হয়তো ডিম-মুরগির বাজারেও পড়তে পারে। ইতিমধ্যে সবজির বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।’