ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন

মনোনয়ন নিয়ে তৃণমূল আ. লীগে কোন্দল বেড়েছে!

ইউপি নির্বাচন-২০১৬সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ভেতর দিয়ে স্থবির হয়ে পড়া তৃণমূলের রাজনীতি চাঙ্গা করার পরিকল্পনা ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। এরই অংশ হিসেবে দলীয় প্রতীকে পৌরনির্বাচন করা হয়েছে। একই পদ্ধতিতে শুরু করা হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনও। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচনি উৎসব শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আওয়ামী লীগ-তৃণমূলের রাজনীতি চাঙ্গা করতে পারেনি বলে মনে করছেন রাজনীতিবিদরা। তাদের মতে, ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলে বিভেদ-বিরোধ ও কলহ বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি নানা অভিযোগ ও ক্ষোভ বেড়েছে তৃণমূলের। আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী মহল ও তৃণমূলের নেতারা এমন তথ্য জানান।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে তৃণমূলের ভেতরে একটি বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। নির্বাচনের আগে তৃণমূলের ভেতরের ক্ষোভ দূর করতে হবে।
জানতে চাইলে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বড় সংগঠন। এ দলে নেতাকর্মী ও নিবেদিত সৈনিক বেশি। এখানে সবার চাওয়া রক্ষা করা সম্ভব হয় না। ফলে ক্ষোভ-বিক্ষোভ তৈরি হয়। আবার ঠিকও হয়ে যায়।

নীতি-নির্ধারণী মহলের নেতারা মনে করেন, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষ করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র ও তৃণমূলের রাজনীতিতে বিভেদের দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। এ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের ভেতরে বিরাজমান স্থবিরতা কাটিয়ে তোলার যে পরিকল্পনা ছিল তার চেয়ে কলহ বেশি সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে তৃণমূল যাকে যোগ্য হিসেবে বাছাই করে, ভোট দিয়ে সমর্থন জানিয়েছে কেন্দ্র থেকে বাছাইয়ে সেই প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, কেন্দ্র থেকে যে প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে তৃণমূল আওয়ামী লীগে চরম অসন্তোষ কাজ করছে। এ কারণে এবারের ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর সম্ভাবনাও বেশি রয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে।   

এদিকে, তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে এই নিয়ে কথা হলে তারা বলেন, প্রার্থী বাছাই করার ক্ষমতা তৃণমূল আওয়ামী লীগের কাছে দেওয়া হয়েছে ঠিকই আসলে সব হয় কেন্দ্র থেকে। তারা বলেন, এবারও অধিকাংশ ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে তৃণমূল আওয়ামী লীগ যাকে সমর্থন জানিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা তাকে চূড়ান্ত না করে সুযোগ খুঁজে তাদের নিজের লোককেই কেন্দ্রের সমর্থন দিয়েছেন।

নোয়াখালী জেলার দায়িত্বশীল এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলার চর ওয়াপদা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে নাম পাঠান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক আবদুল মান্নানের। তিনি সর্বাধিক ভোটও পেয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রে এসে তার নাম বাদ পড়ে যায়। তিনি বলেন, কেন্দ্রের সমর্থন পান বর্তমান চেয়ারম্যান মনির আহমেদ। অথচ তাকে তৃণমূল আওয়ামী লীগ চাননি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মনোনয়ন বঞ্চিত নেতা আব্দুল মান্নান বলেন, তৃণমূল আওয়ামী লীগ আমাকে এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে আমাকে বাদ দিয়ে মনির আহমেদকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষমতা তৃণমূলকে দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা খাটাচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতারাই। এটা দুঃখজনক।

কক্সবাজার জেলার মাতারবাড়ি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বৈঠক করেন। সেখানে বতর্মান চেয়ারম্যান এনামুল হক চৌধুরী ছাড়া অন্য যে কাউকে প্রার্থী করার প্রস্তাব করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু কেন্দ্র থেকে এনামুল হককেই মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ ক্ষোভে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ উল্লাহসহ আরও কয়েকজন প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

মহেশখালী কালারমারছড়া ইউনিয়নে তৃণমূলের প্রস্তাব ছিল তারেক বিন ওছমান শরীফকে প্রার্থী করার। কিন্তু দেওয়া হয়েছে তারেকের বাবার হত্যা মামলার আসামি সেলিম চৌধুরীকে। সে কারণে মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারেক।

পটুয়াখালীর বাউফলে ১১টি ইউনিয়নের বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। পটুয়াখালী জেলার দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা বলেন, ১১ টি ইউনিয়নে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, সবাই জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজের লোক বলে পরিচিত। কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌর মেয়র জিয়াউল হকসহ স্থানীয় একটি পক্ষ ১১টি ইউনিয়নেরই আলাদা প্রার্থী তালিকা পাঠায় কেন্দ্রে। কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড ফিরোজের লোকদেরই মনোনয়ন দেয়।

সূত্র জানায়, এসব ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেকেই।

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ধলবাড়িয়া ইউনিয়নে সজল মুখার্জী এবং দক্ষিণ শ্রীপুরে গোবিন্দ মণ্ডল তৃণমূল আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রে এসে তৃণমূলের সমর্থন পাওয়া সজল মুখার্জী ও গোবিন্দ মণ্ডল মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন।

জানতে চাইলে সজল মুখার্জী বলেন, তৃণমূলের সমর্থন পাওয়া অনেক নেতাকে কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। অথচ প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে তৃণমূলের বাছাইকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল বাছাই করে পাঠালেও কেন্দ্রীয় নেতারা অজানা কারণে প্রার্থী পরিবর্তন করে ফেলেছেন। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।  

 

/এমএনএইচ/