গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ১১টি জেব্রার মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ীদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সেইসঙ্গে প্রাণীর মৃত্যুরোধ ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য করণীয় বিষয়ে ১১টি স্বল্পমেয়াদি, ৪টি মধ্য-মেয়াদি এবং ৯টি দীর্ঘ মেয়াদি সুপারিশ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, স্বল্পমেয়াদি সুপারিশের মধ্যে রয়েছে— সাফারি পার্কের বিভিন্ন প্রাণী বা পাখির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও অধিকতর উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল দ্রুত পদায়ন করা। সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণীর নিয়মিত ‘ডিজিজ সার্ভিলেন্স, মনিটরিং এবং বর্তমান ও অতীতের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর মৃত্যুর কারণ, আক্রান্ত রোগগুলো ও অন্যান্য বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য একজন ‘ভেটেনারি এপিডেমিওলোজিস্ট সাফারি পার্কে সংযুক্তি বা পদায়ন করা। নিরাপত্তা কর্মী, অ্যানিমেল স্কাউট বা অ্যাটেনডেন্টসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সংযুক্তি পদায়ন করা। পার্কে স্থায়ীভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য রাজস্ব খাতে থাকা ১৩৮ পদের বিপরীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমোদিত প্রস্তাবনা দ্রুত বাস্তবায়ন। প্রাণী খাদ্যের সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ, বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত ও স্বাস্থ্য সম্মত খাদ্য নিশ্চিত করার স্বার্থে পার্কে ভেটেরিনারি কর্মকর্তাকে প্রধান করে পদায়ন করা। প্রথম শ্রেণী বা দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তার সমন্বয়ে ৪/৫ সদস্যের একটি শক্তিশালী প্রাণী খাদ্য গ্রহণ কমিটি গঠন করা। এছাড়া প্রাণী ও পাখির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ১০ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এই ১০ দফার মধ্যে রয়েছে— (ক) প্রাণী সেড ও বিশ্রামাগার (খ) খাবার পানি শোধন (গ) কৃমিমুক্তকরণ (ঘ) নিয়মিত টিকা প্রদান (ঙ) পরিণত ও স্বাস্থ্যসম্মত ঘাস গ্রহণ। ঘাস গ্রহণের পর পানিতে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে চপার মেশিনে কেটে সরবরাহ করা। (চ) দানাদার খাদ্য ও সরবরাহকৃত মাংসের গুনণগত মান যাচাইপূর্বক গ্রহণ (ছ) জেব্রার জন্য পৃথক বেষ্টনী নির্মাণ (জ) সরবরাহকৃত শাকসবজি, ফলমূল ও ঘাস ধোয়ার জন্য চৌবাচ্চা নির্মাণ (ঝ) নাইটভিশন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা। (ঞ) মুক্ত স্থানে ঘাস চাষ করা।
এর বাইরে স্বল্পমেয়াদি সুপারিশের আরও আছে— সাফারি পার্কের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ রক্ষার জন্য ডিজিটাল ডিভাইসে সবাইকে সংযোগ করা। পরিচালক, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অন্যান্য কর্মকর্তাসহ সব স্টাফকে নিয়ে প্রতিমাসে একবার সভা আহ্বান করা। সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে অবগত হওয়া ও তাৎক্ষণিক সমাধান করা। অস্বাভাবিক কোনও ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রধান বন সংরক্ষককে লিখিতভাবে অবহিত করা। সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন। ওই কমিটি প্রতি দুই মাস পর পর সভা করে সাফারি পার্কের কার্যক্রম তদারকি করবে। সাফারি পার্কে ও প্রাণীসম্পদ অধিদফতরে কর্মরত অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ ভেটেরিনারিয়ানদের সমন্বয়ে একটি ভেটেরিনারি মেডিক্যাল বোর্ড পুনঃগঠন করা।
মধ্যমেয়াদি সুপারিশে বলা হয়, জরুরি প্রাণী-পাখির স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের লক্ষ্যে ওয়াল্ড লাইফ ভেটেরিনারি হসপিটালে প্রয়োজনীয় ভেটেরিনারি ওষুধ ও যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত মজুত রাখা-সহ হাসপাতালের অন্যান্য সুযোগ বাড়ানো। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক কিটস, রিএজেন্টসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি (ব্লাড এনালাইসার,কম্পাউন্ড মাইক্রোস্কোপ,এইচপিএলসি ইত্যাদি) মজুত রেখে একটি ভেটেরিনারি মিনি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা। জরুরি প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষ বা কমিটি প্রয়োজন মনে করলে দেশের অভ্যন্তর থেকে আরও ভেটেরিনারি এক্সপার্ট এবং ওয়াল্ডলাইফ বায়োলোজিস্ট সম্পৃক্ত করতে পারবেন। এমনকি প্রয়োজনে বিদেশ থেকে (সাউথ আফ্রিকা বা অন্যান্য দেশ) বিশেষজ্ঞ আনার ব্যবস্থা রাখা। সাফারি পার্কের মৃত প্রাণীর যথাযথ এন্টি মরটেম ও পোস্ট মোরটেম পরীক্ষা আরও বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা।
দীর্ঘ মেয়াদি সুপারিশে বলা হয়েছে— সাফারি পার্কের অভ্যন্তরে রোগাক্রান্ত পশুকে চিকিৎসার স্বার্থে ভেটেরিনারি হাসপাতালে বা অন্যত্র (ঢাকা বা অন্য স্থানে স্থানান্তরের জন্য একটি মোবাইল ভেটেরিনারি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা রাখা। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সব কমকর্তার (ভেটেরিনারি অফিসার/ সার্জন, ওয়াল্ডলাইফ বায়োলজিস্ট, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইত্যাদি) দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা। প্রাণী স্বাস্থ্য পুষ্টি ও ব্যবস্থাপনার ওপর সমসাময়িক সময়ে জ্ঞান আহরণের জন্য ভেটেরিনারি চিকিৎসা সংক্রান্ত সব ধরনের রেফারেন্স বই (ভেটেরিনারি মেডিসিন, সার্জারি, প্যাথোলজি, মাক্রোবায়োলজি, প্যারাসাইটোলজি ইত্যাদি) সহ দেশি-বিদেশি জার্নাল সংগ্রহের মাধ্যমে একটি মিনি লাইব্রেরির ব্যবস্থা রাখা। প্রাণীর স্বাস্থ্য তদারকি ও ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের জন্য ভেটেরিনারি মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যদের প্রতি দুই মাস অন্তর বোর্ড মিটিংয়ের ব্যবস্থা রাখা।
প্রতিটি বোর্ড মিটিংয়ে প্রকল্প পরিচালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপস্থিত থাকা। জরুরিভিত্তিতে আকাশমনিসহ অপ্রয়োজনীয় বৃক্ষ অপসারণ করে বন্যপ্রাণী-সহায়ক বাগান ও বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী বিভিন্ন প্রজাতির ফলবাগান তৈরি করতে হবে। বেষ্টনী উন্নয়নের মাধ্যমে শিয়ালসহ বহিরাগত প্রাণীর প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। পার্কের অভ্যন্তরে যেখানে-সেখানে গো-চারণ ও মানুষের যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সাফারি পার্ক চত্বরে ২৪ ঘণ্টা অবস্থানের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা রাখা এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখা।