বাংলা ট্রিবিউনকে ফাহমিদা সাইদ সাকী

‘নারীদের এগিয়ে চলার সাহস থাকতে হবে’

নিজ কার্যালয়ে ফাহমিদা সাইদ সাকী

নারীরা যখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন,তখন থেকেই তাদের কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া নারীর সংখ্যা এখনও সামান্যই। একসময় স্কুল কলেজে পড়ানোর বাইরে নারীর কাজের কথা ভাবাই যেত না।  সেই না-ভাবার জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে নারীরা এখন সাংবাদিকতা করছেন, হিমালয় জয় করছেন, চাকরি করছেন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তেমনই একজন নারী ফাহমিদা সাঈদ সাকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়া সাকি মধুমতি ব্যাংকে সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। সম্প্রতি নারীর জীবন,নারীর কর্মক্ষেত্র নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তার বিশ্বাস জীবনের নানা সময় মুখ খুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু লক্ষ্য ঠিক থাকলে আবার উঠে দাঁড়ানো যায়।

ইংরেজি সাহিত্যে পড়ে ব্যাংকে কাজ করবেন এমনটা ভেবেছিলেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়েছি তখন অনেক কিছু স্বপ্ন দেখতাম। আমি যখন পাস করে বের হই,তখন বেসরকারি ব্যাংকের চল কেবল শুরু হচ্ছে। এক ধরনের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার অভ্যাস তো আমার ছিল। আর ছিল অদম্য ইচ্ছা কিছু একটা করার। আমি কিন্তু একেবারে ছোট থেকে কাজ শিখে শিখে নিজের জায়গা করে নিয়েছি। আর ভেবেছি, নিশ্চয়ই পরের প্রজন্ম সেটাকে স্মরণ করবে,মনে রাখবে। সবসময় মনে করেছি এমন একদিন আসবে যেদিন মেয়েদের আলাদা করে কাজের অনুভূতি জিজ্ঞেস করা হবে না।

ক্যারিয়ার হিসেবে নারীদের জন্য ব্যাংক কেমন বলে মনে করেন?

যদি নারী চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সাহসটা মনে রাখেন,তাহলে যেকোনও জায়গা তার জায়গা হয়ে উঠবে। আমি তো আমার সঙ্গে যে নারীরা কাজ করে তাদের সবসময়ই বলি এগিয়ে চলার সাহসটা রেখে সততার সঙ্গে কাজ করলে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী একদিন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেই। ব্যাংকে নারীদের জন্য বরং বিশেষ কিছু সুবিধাই রয়েছে। এখানে ডেস্কজব বেশি। এখানে নিজের এরিয়া অনুযায়ী কাজটা শেখার সুযোগ থাকে। ফলে একেবারে শুরু থেকে যারা ব্যাংকিংকে ক্যারিয়ার হিসেবে ভাববেন তারা আসলেই নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন। তবে তাকে নিজের সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। কারণ,যেকোন পেশার মতোই এখানেও তাকে পেছন দিকে টেনে নেওয়ার নানা জায়গা আছে। এসব এড়ানোর রাস্তা নারীরাই ভাল জানেন,বুঝেন।

আপনাকে কখনো বাঁধার মুখোমুখি হতে হয়েছে? বিশেষ করে নারী হিসেবে?

না। তেমন বড় ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি।তাই বলে কেউই পড়েন না, তা না। ১৯৯৫ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে জেনারেল ব্যাংকিংয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার হিসেবে জয়েন করে টানা ২০১২ পর‌্যন্ত কাজ করেছি। একেবারে শুরু থেকে ম্যানেজার হিসেবে আমি সেখানে দায়িত্ব পালন করি। এই পুরো পথটা চলা মোটেই সহজ ছিলো না। আমার মনে আছে,আমি কাজ পারছি কিনা সেটা নিয়ে আমার অনেক পুরুষ সহকর্মী সতর্ক থাকতেন। কাউকে ছাড়িয়ে যেতে যেন না পারি সেজন্য কোন বাঁধা হয়তো তৈরি করেননি, কিন্তু একটা মানসিক টেনশন থাকতোই। 

নারীরা সংখ্যায় অনেক কাজে নেমেছেন বটে।কিন্তু সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যেতে পারছেন না কেন?

দেখুন, কাজে নামার ইতিহাসতো বেশিদিনের না। নানা পেশায় কাজে নেমেছেন নারীরা,সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে তো সময় লাগবে। তারপরও সাংবাদিকতা পেশায়, বিজ্ঞাপন নির্মাণে,বিশেষ করে ক্রিয়েটিভ পেশায় কিন্তু নারীরা এগিয়ে গেছেন আগে। আবার আমাদের পেশায় আমরা অনেক এগিয়েছি বলব না,কিন্তু যারা এগিয়ে গেছেন তারা অন্যদের জন্য একটা পদচিহ্ন রেখে যেতে সক্ষম হচ্ছেন। ফলে আগামীতে অসাধারণ একটা পরিবর্তন আমরা দেখতে পাবো আশা করছি।

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নারীদের নিরাপত্তার কথা জানিয়ে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অফিস ত্যাগের নিয়ম করেছে, সেটা নিয়ে যদি একটু বলেন? আপনারা ৬টার মধ্যে বের হয়ে যেতে পারছেন?

তার আগে কিছু কথা আছে। যদি ৬টায় নারী কর্মীকে বের হয়ে যাওয়ার কথা বলেন এবং পুরুষরা কাজ চালিয়ে যান তাহলে কিন্তু নিরাপত্তার নামে মেয়েটির পেশা হুমকিতে পড়বে। সবার জন্য এক নিয়ম করে দেওয়া যেতে পারে। যদি তা না হয় তাহলে অফিস ভাববে ৬টায় চলে যাচ্ছে যে কর্মী সে স্বভাবতই পুরুষ কর্মীর চেয়ে কম কাজ করছে, ফলে তার উন্নতির গতি কমিয়ে দেবে অফিস। এ ধরনের সিদ্ধান্ত অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। নারীর নিরাপত্তার জন্য আপনি ভাবছেন সেটা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক, কিন্তু তাই বলে আপনি নারীর চাকরির নিরাপত্তায় টান দিতে পারেন না।

অবসর পান এখন?

হ্যাঁ, নিজের মতো করে সময় বের করতে হয়। আমার দুই মেয়ে। তাদের পড়ালেখা আর ছুটিছাঁটার মধ্যে আমরা ঘুরতে যাওয়ার সময় বের করি। আমার মেয়েদের আমি সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছি এবং তাদের সঙ্গে আমি আমার জীবন শেয়ার করি। ফলে তারা তাদের সেই স্বাধীনতার অমর্যাদা করে না। একজন নারী হিসেবে আমি চাই তাদের জন্য সেই সমাজ গড়ে উঠুক যে সমাজে নারীকে আলাদা সুযোগ দেওয়ার বিষয়গুলোর মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। আমার বিশ্বাস,আমরা যে মধ্যবর্তী একটা সময় কাটালাম, আমার পরের প্রজন্ম সেটার সুফল ভোগ করবে।

নারীদের জন্য কোনও বার্তা দিতে চান?

কেবল সহনশীলতা থাকলে চলবে না। কাজটা শিখে নিতে হবে। নারীদের ঘরের কাজের পাশাপাশি বাইরের কাজ করতে হয়। তাদের জীবনের ধরণটাই পুরুষরা বেশিরভাগ সময় ধরতে পারেন না। ফলে,কিছু আশা না করে নিজের কাজটা করে যাওয়ার বিকল্প নেই। আর পারত পক্ষে বাসা এবং অফিসের কাজের বিষয়কে এক না করে ‘ইন্ডিভিজুয়্যাল’ পরিবেশ ধরে রাখার প্রচেষ্টাটা বড় চ্যালেঞ্জ।

/ইউআই/এমএসএম/এইচকে