বাংলা ট্রিবিউনকে ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন

সার্ভিক্যাল ক্যান্সার: ভাঙতে হবে অচলায়তন

ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন‘জননীর কাছে সবার আছে জন্মঋণ, জরায়ুমুখে ক্যান্সার সচেতনতায় অংশ নিন’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে এখন থেকে প্রতিবছর জানুয়ারি মাস সার্ভিক্যাল ক্যান্সার (জরায়ুমুখের ক্যান্সার) সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হবে। চলতি বছর এই সচেতনতা মাস শেষ হবে আর দুদিন পরেই। এর আগেই বৃহস্পতিবার প্রাণঘাতী এই রোগটি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন।  ডা. হাবিবুল্লাহ গত ২৩ বছর ধরে ক্যান্সার নিয়ে কাজ করছেন। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে বসে কথা হয় তার সঙ্গে।

বাংলা ট্রিবিউন: সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের ব্যাপকতা নিয়ে কিছু বলবেন।

ডা. হাবিবুল্লাহ: আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) ২০১২-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারাবিশ্বে প্রতিবছর ৫ লাখ ২৮ হাজার নারী এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। মৃত্যুবরণ করেন ২ লাখ ৬৬ হাজার। এর মধ্যে বেশিরভাগ রোগী আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর। বিশ্বে নারীদের ক্যান্সারের তালিকায় সার্ভিকাল ক্যান্সারের স্থান চতুর্থ। আর সার্বিকভাবে এর স্থান সপ্তম। আইএআরসির হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন ১১ হাজার ৯৫৬ জন আর মারা যান ৬ হাজার ৫৮২ জন। অন্যদিকে, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউটের সর্বশেষ প্রকাশিত ২০১৪ সালে হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন প্রতিবেদন অনুযায়ী সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের অবস্থান দ্বিতীয় (১৭.৯ শতাংশ) এবং প্রথম স্তন ক্যান্সার (২৭.৪ শতাংশ)। সহজভাবে বললে, প্রতি পাঁচজন নারীর একজন সার্ভিক্যাল ক্যান্সারে ভুগছেন।

বাংলা ট্রিবিউন: সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের কারণগুলো কী?
ডা. হাবিবুল্লাহ: এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু আর্থ-সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণ রয়েছে। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হলে এবং ঘনঘন সন্তান নেওয়া সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের প্রধান কারণ। এর সঙ্গে রয়েছে ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও অপুষ্টি। কারণ, অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়ে অন্য কারণগুলোকে উৎসাহিত করে। এছাড়া, এই রোগের অন্যতম আরেকটি কারণ হলো, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)নামক একটি ভাইরাস। এই ভাইরাসকে বলা হয় প্রধান কালপ্রিট। এই ভাইরাসের সংক্রমণ যদি বারবার হয়, তাহলে সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।   

একান্ত আলাপচারিতায় ডাক্তার হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন ও জাকিয়া আহমেদ

বাংলা ট্রিবিউন: এই ক্যান্সার কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়?
ডা. হাবিবুল্লাহ:
 এই রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধযোগ্য। স্টেজ দুই পর্যন্ত এই ক্যান্সার অস্ত্রোপচার করে নিরাময় করা যায়। তবে প্রাইমারি প্রিভেনশন হলো, রোগ হবার আগে করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপ হলো, খুব দ্রুত ডায়াগনোসিস এবং চিকিৎসা। ভালো করতে পারব না, তবে তার সামাজিক এবং ব্যাক্তিগত কষ্টগুলো লাঘব করাটা খুব জরুরি। যদি স্টেজ দুইয়ের মধ্যে রোগটি ধরা পড়ে, তাহলে অস্ত্রোপচার করে টিউমার ফেলে দেওয়া যায়। যদিও পরবর্তী সময়ে তার আরও কিছু চিকিৎসা দরকার হয়। তবে, এই ধাপটি যদি পার হয়ে যায়, তাহলে আর অস্ত্রোপচার করা যায় না। তখন কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি দিয়ে একটু নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে অস্ত্রোপচার করা যেতে পারে। আর এর পরের ধাপে যদি চলে যায়, তাহলে আর তাকে কিউরেটিভ চিকিৎসা দেওয়া যায় না। তখন কেবল তার কষ্ট কমানোর চেষ্টা করা হয়।

বাংলা ট্রিবিউন: সার্ভিক্যাল ক্যান্সার নিয়ে এই মাসে আপনারা অনেক কাজ করেছেন। এর কারণ কী?

ডা. হাবিবুল্লাহ: এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এইরকম একটি বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলতে পারি না। লজ্জা, সংকোচ আমাদের ঘিরে ধরে। অথচ এটি লজ্জার কোনও বিষয়ই নয়। আর সব অসুখের মতোই এটি একটি রোগ, এটা বোঝাতে হবে সবাইকে। এই মাসকে উপলক্ষ করে ক্যান্সার প্রতিরোধ ও গবেষণা কেন্দ্র ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বেশ কিছু সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করেছে। ভিকারুন্নেছা নুন স্কুল, গার্মেন্ট কারখানায় গিয়ে দেড় হাজার মেয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। বস্তিতে গিয়ে মায়েদের সঙ্গেও কথা বলেছি। আমরা দেখলাম, ক্যান্সার আগে ধরা পড়লে কী কী সুবিধা হতে পারে, সেটা বেশিরভাগ মানুষই জানেন না। সবাই মিলে যদি একটা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারি, তাহলে এই ক্যান্সারের শুরুতেই ব্যবস্থা নিতে পারব।

বাংলা ট্রিবিউন: এ ধরনের অনুষ্ঠান করতে সহযোগিতা কেমন পাচ্ছেন?
ডা. হাবিবুল্লাহ:
 লিফলেট পোস্টার ছাপাতে হয়, অনেক খরচের বিষয় আছে। কিন্তু সেখানে আমরা অনেককেই পাই না। যেমন ক্যান্সারের যারা ওষুধ সরবরাহ করে বা বানায় তারা সেমিনার করে সোনারগাঁয়ে, শেরাটনে। তারা লাখ-লাখ টাকা খরচ তাতে কোনও সমস্যা নেই, কিন্তু এ ধরনের কাজে তাদের পাই না। ছোট-ছোট কোম্পানিগুলো অনেক সময় এগিয়ে আসে কিন্তু যারা জায়ান্ট। যারা এই খাত থেকে অনেক বেশি রোজগার করে তাদের কাছ থেকে সাড়া পাই না। কিন্তু ক্যান্সার প্রিভেনশনে একটা র‌্যালি হবে কিংবা কিছু লিফলেট ছাপানো হবে সেক্ষেত্রে তাদের সাড়া পাই না। দুঃখ লাগে খুব, তারা কেয়ারই করেন না। একেবারে ব্যাক টু ব্যাক বিজনেস। এর বাইরে তারা চিন্তাই করেন না। তবে দুই-একটা ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে।

তবে ভালো লাগার বিষয়ও আছে। যখন আমরা বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানা, বস্তি এলাকায় যাই, তাদের সঙ্গে কথা বলি, তারা যখন আমাদের কথা শোনে তখন খুব ভালো লাগে। তবে নারী চিকিৎসকদের কাছ থেকে আমরা অনেক বেশি সহযোগিতা পেয়েছি। তবে যাদের কাছে আশা করি তারা সাড়া দেন না কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে অনেকের সহযোগিতা পেয়ে যাই, এখানেই আমাদের শক্তি।

বাংলা ট্রিবিউন: গত কয়েক বছর ধরে ক্যান্সার নিয়ে কাজ করছে সেন্টার ফর ক্যান্সার প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ (সিসিপিআর) অর্থ্যাৎ ক্যান্সার প্রতিরোধ ও গবেষণা কেন্দ্র। এ প্রসঙ্গে কিছু বলবেন।

ডা. হাবিবুল্লাহ: ক্যান্সার প্রতিরোধ ও গবেষণা কেন্দ্র কাজ করছে গত কয়েক বছর ধরেই। এখানে সরকারি বেসরকারি অনেকেই আছে। এখানে সরকারি কোনও প্রকল্প, বেসরকারি ফান্ড নেই, কোনও ওষুধ কোম্পানির স্পন্সর নেই। অথচ তারা অনেক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করে যাচ্ছে। তবে আমরা আগামী ৩০ তারিখে প্রমাণ করে দিতে চাই, টাকা না মূল হচ্ছে মানুষের আন্তরিকতা, তাদের কাছে যাওয়া। সাধারণ মানুষের রেসপন্সই একটা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। আমরা আশা করছি, ব্যাপক সাড়া পাব। আর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি শুধু জানুয়ারি মাসই নয়, সার্ভিক্যাল ক্যান্সার নিয়ে সারা বছর কাজ করব, যেমনটা করেছি ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে। সমাজের বিত্তবান যারা আছেন তাদের কাছে এজন্য একটু সহযোগিতা চাচ্ছি। ইতোমধ্যে আমরা ৫৮টি জেলায় সিসিপিআর থেকে কাজ করেছি। একটু সহযোগিতা পেলে আমরা পুরোদেশের আনাচে-কানাচে যেতে পারি সচেতনতা বাড়াতে। আগামী ৩০ জানুয়ারি এই সার্ভিক্যাল ক্যান্সার সচেতনতায় শনিবার সকাল ৯টায় শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজের সামনে থেকে ‘জননীর জন্য পদযাত্রা’ করবে সিসিপিআর। পদযাত্রাটি শেষ হবে মিরপুরে গিয়ে।
ছবি: নাসিরুল ইসলাম।

/এসএম/এমএনএইচ/