একান্ত সাক্ষাৎকারে বিরূপাক্ষ পাল

জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৮ থেকে ৬.৯ শতাংশ

বিরূপাক্ষ পালচলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬.৮ থেকে ৬.৯ শতাংশ হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল। তিনি বলেন,  প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস ঠিক নয়। সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যালয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।

বাংলা ট্রিবিউন: আইএমএফ বলেছে, চলতি (২০১৫-১৬) অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৩ শতাংশ, আসলে প্রবৃদ্ধি কত হতে পারে?

বিরূপাক্ষ পাল: বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফ  যাই বলুক না কেন, আমি মনে করি, এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭ শতাংশের কাছাকাছি।

বাংলা ট্রিবিউন: আইএমএফের দৃষ্টিতে প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার কারণ কী?

বিরূপাক্ষ পাল: আইএমএফ  হয়ত মনে করছে, দেশে অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক উত্তেজনা লেগে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে কি আইএমএফের পর্যবেক্ষণ ভুল?

বিরূপাক্ষ পাল: জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের দেওয়া তথ্য ভুল বলেই মনে করি। তবে, আইএমএফের অন্যান্য পর্যবেক্ষণ ঠিক আছে। সংস্থাটি সুদের হার কমাতে বলেছে, ব্যাংকগুলোয় সুশাসনের অভাবের কথা বলেছে। এইগুলো ঠিক আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার দৃষ্টিতে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে?
বিরূপাক্ষ পাল: চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৮ থেকে ৬.৯ শতাংশ হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: বিনিয়োগ খরা কেটে যাচ্ছে এর পক্ষে যুক্তি কী?
বিরূপাক্ষ পাল: বর্তমানে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশে উপনীত হয়েছে। ব্যাংক ঋণের এই প্রবৃদ্ধি বিগত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সুতরাং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দিয়েই বিনিয়োগ বেড়েছে বলা যায়। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করে এখন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেই ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগ বাড়ছে। এছাড়া, আগের বিনিয়োগের চেয়ে এখন বিনিয়োগের গুণগত মানও বেড়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এই মুহূর্তে আপনি কিভাবে দেখছেন?
বিরূপাক্ষ পাল: এই মুহূর্তে আমি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ইতিবাচকভাবে দেখি। আমার এই দেখাকে হয়ত কেউ-কেউ মনগড়া বলবেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে-ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। গত বছরের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে এই ধরনের কথা বলতে পারিনি। তখন ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা।

 

বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছেন বিরূপাক্ষ পাল

বাংলা ট্রিবিউন: ৩ বছর ধরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ শতাংশের ঘরে। কিন্তু কী কারণে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে হঠাৎ ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশের বেশি হলো?
বিরূপাক্ষ পাল: এখন দেশের পরিবেশ ভালো হয়েছে।  রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে। মানুষ আশা করতে শুরু করেছেন। ব্যবসায়ীরা মনযোগ দিতে শুরু করেছেন। এর প্রভাব পড়েছে আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রেও। বর্তমানে আমাদানি-রফতানির সূচকগুলো ইতিবাচক। যার সার্বিক প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণের ওপর। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি এখন ১৪ ভাগ অতিক্রম করেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: এই ঋণের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি যাচ্ছে কোন খাতে?
বিরূপাক্ষ পাল: এখন সবচেয়ে বেশি ঋণ দেওয়া হচ্ছে এসএমই খাতে। কৃষিখাতেও ঋণ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। স্বল্পসুদে কৃষকেরা এখন ঋণ পাচ্ছেন। এই ঋণের গুণগত মানও বেড়েছে। এ কারণে এখন অল্পঋণ দিয়েই বেশি আউটপুট আসছে।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রবৃদ্ধি বাড়ার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
বিরূপাক্ষ পাল: অবকাঠামো খাতের বিশৃঙ্খলা এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ। যেমন, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডে কোনও শৃঙ্খলা নেই। পণ্য রাস্তায় পড়ে থাকে অধিকাংশ সময়। এই সড়ক দিয়ে গেলে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে থাকতে হয়। অবকাঠামোগত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে আগে নিয়মকানুন ঠিক করা দরকার।দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও। রাস্তাঘাট হচ্ছে খুবই ধীরগতিতে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড নির্মাণের কাজ আরও আগে শেষ হতে পারত। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে। এতে অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান এই অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিতে কেবল রাস্তাঘাট ঠিক করলেই হবে না, রেল খাতকেও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ, এখন মানুষ যাতায়াত করতে চায়। এখন গ্রামের মানুষ সকালে ঢাকা আসছেন, আবার বিকালেই গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন।এ জন্য সবধরনের রাস্তাঘাটের উন্নতির দিকে বেশি মনযোগ দিতে হবে। তা না হলে অর্থনীতিতে সত্যিকার পরিবর্তন আসবে না। কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধিও হবে না।অবকাঠামোর শৃঙ্খলা বিধান করা গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে। মামলা মোকাদ্দমার ধীরগতির কারণেও প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়ে। ঋণ সংক্রান্ত মামলার ধীর গতির কারণে সময় মতো ঋণের টাকা উদ্ধার করতে পারে না ব্যাংক।

বাংলা ট্রিবিউন: বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এরপরও ব্যাংক খাতে  খেলাপি ঋণ বাড়ছে। কারণ কী?
বিরূপাক্ষ পাল: কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেও খেলাপির পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য দিক নির্দেশনা দেওয়া আছে। ব্যাংকগুলোকে আগের চেয়ে জবাবদিহিতার মধ্যে আনা হয়েছে। তবে ঋণখেলাপিরা আদালতে যাওয়ার কারণে অনেক সময় ব্যাংক ঋণ আদায় করতে পারে না। এ জন্য  ঋণ খেলাপিদের জন্য আইন কঠোর করা জরুরি।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

/এপিএইচ/এমএনএইচ/