একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. মইনুল খান

স্মাগলিংয়ের অর্থের একটি অংশ জঙ্গিবাদে ব্যবহৃত হচ্ছে

সোনা চোরাচালানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থের একটি অংশ দেশে জঙ্গিবাদসহ বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ডক্টর মইনুল খান। তিনি বলেন, অবৈধ পথে আসা সোনার একটি ছোট অংশ স্থানীয় বাজারে গহনা তৈরির কাজে ব্যবহার হয়। এর একটি অংশটি ব্যবহার হয় বিভিন্ন রকম অপরাধের অর্থায়নে- যেমন, মানি লন্ডারিং, অস্ত্র কেনা, বোমা বানানো, মাদক পাচার, আগুন সন্ত্রাস, রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং নারী ও শিশু পাচারের ক্ষেত্রে । এসব অপরাধের পেমেন্ট হিসেবে ফরেন কারেন্সির বদলে সোনাই তাদের কাছে বেশি মূল্যবান ও জনপ্রিয়। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. মইনুল খানদেশের রাজস্বখাতের প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তা ডক্টর মইনুল খান বলেন, সামাজিক অপরাধ, ইয়াবার চালান, নারী ও শিশু পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে নিশ্চয়ই অর্থের সংযোগ আছে। এগুলোর পেমেন্ট কীভাবে হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর অবৈধ পথে  প্রায় ৫০ লাখ গরু আসে। বিনিময়ে আমরা এখান থেকে ঘোড়া রফতানি করছিনা। ছাগলও যায়না। যাচ্ছে টাকা। সেটা কীভাবে যাচ্ছে ? বাংলাদেশের টাকাতো অন্যদেশে চলবে না। এখানে ফরেন কারেন্সির বদলে সোনাই তাদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। এভাবে যতোরকম ট্রান্সজেকশন ও স্থানীয় যে অপরাধ আছে, সে অপরাধের অর্থায়ন হিসেবে অবৈধ পথে আসা সোনা ব্যবহৃত হচ্ছে। সেজন্য এর চোরাচালান বন্ধ করা যায়নি। তবে নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্থিতিশীলতার জন্যেই এটা বন্ধ করতে হবে ।
মইনুল খান বলেন, এতোদিন কাস্টমসের ভূমিকা ছিলো শুধুমাত্র রাজস্ব আদায় করা। এখন কিন্তু সেটা নয়। রাজস্ব আদায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, দেশের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য দু’টোকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বৈধ পথে যাতে অবৈধভাবে কোনও পণ্য ও ব্যক্তি ঢুকতে না পারে সেজন্য এনফোর্সমেন্টের দিকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, এতে যে শুধু সামাজিক নিরাপত্তা বেড়েছে তা-ই নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেটা আছে, সেটারও কিন্তু সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
বিপুল পরিমাণ সোনা আটকের পরও অবৈধ উপায়ে সোনাসহ বিভিন্ন পণ্য দেশে ঢুকছে, এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলা ট্রিবিউনকে মইনুল খান বলেন, এটা বন্ধ করার জন্য দু’টি পদ্ধতিতে আমরা কাজ করছি। একটি হচ্ছে, এনফোর্সমেন্ট আর অন্যটি হচ্ছে পলিসি। এখন কোনও দেশে যদি চাহিদা থাকে, তাহলে সরবরাহ হবেই। এটাই দুনিয়ার নিয়ম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সোনার চাহিদা আছে। এই চাহিদা দূর করতে হবে।আমরা চোরাচালান বন্ধ করতে পেরেছি তা বলছিনা। তবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। আগে অবাধে আসতো, এখন অবাধে আসতে পারছে না। এটা নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। তাদের ঝুঁকিটা আমরা বাড়িয়ে দিয়েছি। খরচটা বাড়িয়ে দিয়েছি। তাদের ব্যবসায়িক লাভ কমিয়ে দিয়েছি। খরচ যতো বাড়বে, ঝুঁকি যতো বাড়বে তারা ততো হিসাব নিকাশ করবে। এটাই আমাদের কাজ। বিগত তিন বছরে আমরা প্রায় তিন হাজার কেজি সোনা আটক করতে সক্ষম হয়েছি। যার ফলে আগে যেভাবে সোনা আসতো এখন আর সেভাবে  আসছেনা।

তিনি বলেন, তবে এখন নানা অভিনব পদ্ধতিতে ঝুঁকি নিয়ে সোনা আনা হচ্ছে। একবার নয় পিচ সোনা উদ্ধার করার জন্য একজনের পেট কাটার (অপারেশন) উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তার আগে আরেকজনের পেট থেকে সোনা বের করেছি। এটা বের করার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ্ করা হয়। আগে যেমন পকেটে, ব্যাগে ও প্লেনে করে সোনা নিয়ে আসা হতো, সেটা এখন আর হচ্ছেনা। এখন অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে মানুষ এ কাজটি করছে। এতো ঝুঁকি নেওয়ার পরও তারা ধরা পড়ছেন।

কেবল বাহককে ধরেই সোনা চোরাচালান বন্ধ করা যাবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মইনুল খান বলেন, আমাদের কাজ হচ্ছে বাহককে ধরা। কারণ মূল কারবারীদের কানেকশন হচ্ছেন বাহক। তিনি কারও না কারও কাছে সোনা হস্তান্তর করবেন। তাকে সহায়তা করার জন্য কেউ না কেউ বসে থাকবেন। তাই বাহককে যদি ধরা যায়, সঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়, তার মোবাইলফোন নম্বর, প্রোফাইল এবং তার ব্যবসায়িক যে কানেকশনগুলো আছে সেগুলো যদি বের করা যায়, তাহলেতো বিভিন্ন ধাপে বসে যারা একাজটি করছেন, তাদের ধরা যাবে।

তিনি বলেন, এই তদন্তের কাজটি কাস্টমসের কাজ নয়। অন্য সংস্থার কাজ। তারপরও আমরা প্রকৃত স্মাগলার ও গডফাদারদের ধরছি। যেমন পল্টন থেকে কিছুদিন আগে ৬২ কেজি সোনা ও পাঁচ বস্তা টাকাসহ মোহাম্মদ আলী নামের একজনকে ধরা হয়েছে। তার দোসর হচ্ছে রিয়াজ। তিনি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান। এমন গডফাদারও ধরা হয়েছে। কেউই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকছে না।

মইনুল খান বলেন, যাদের ধরা হচ্ছে তাদের সাজা হচ্ছেনা জনমনে এটা একটা প্রশ্ন। এটা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এর সঙ্গে অন্য সংস্থার তদন্ত ও আইন-আদালতের বিষয় জড়িত। আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার চেস্টা করছি। তবে আমরা একটি সাজা নিশ্চিত করছি, সেটা হচ্ছে আর্থিক জরিমানা। যিনি কোটি কোটি টাকার সোনা নিয়ে আসছেন, ধরার পর সেই সোনা আর তিনি ফেরত পাচ্ছেন না। এগুলো বাজেয়াপ্ত করে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিচ্ছি।

তিনি বলেন, মানুষ অপরাধ করে লাভের জন্য। আর সেই জমা চালান যদি আমরা কেড়ে নেই, তাহলে তিনিতো রাস্তার ফকির হয়ে গেলেন। এই অর্থনৈতিক জরিমানা কিন্তু বড় জরিমানা। এটা আমরা প্রয়োগ করতে পারছি।

তিনি বলেন, কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গত তিন বছরে প্রায় তিন হাজার কেজি (৮০ মন) সোনা আটক করেছে। এর মূল্য প্রায় ১৫ শ’ কোটি টাকা। এই সোনা দিয়ে বাংলাদেশ কিন্তু ধনী হচ্ছে ।

তিনি বলেন, এই যে ১৫শ’ কোটি টাকার সোনা উদ্ধার হয়েছে এর একটি অংশ যদি বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদে খরচ হতো, তাহলে পুরো দেশে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো। টুইন টাওয়ারের মতো কতগুলো হামলা করা সম্ভব হতো। তবে সব সোনা যে সন্ত্রাসবাদে ব্যবহার হচ্ছে তা নয়। কিন্তু একটি অংশ যে ওই কাজে ব্যবহার হচ্ছে না, এটার নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারছি না। কিন্তু আমরা সন্দেহ করছি এর একটি অংশ জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদে ব্যবহার হচ্ছে।

তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা স্মাগলিংকে কেনো বেছে নিচ্ছেন, তারা বড় ধরণের ইনভেস্টমেন্টে যায় না। তারা খুব স্বল্প সময়ে দ্রুত অর্থ (কুইক মানি) সংগ্রহ করতে চায়।  আর এটা স্মাগলিং ছাড়া সম্ভব নয়। রিক্রুটমেন্ট, অস্ত্র কেনা ও প্রতিদিন পেমেন্ট করার জন্য কুইক মানি তাদের দরকার হয়।

এই অর্থ দুইভাবে আসে। একটি হচ্ছে চ্যারিটির মাধ্যমে। আরেকটি হচ্ছে স্মাগলিংয়ের মাধ্যমে। এ টাকা তারা অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে থাকেন। বর্তমানে ফান্ড ট্রান্সফারের বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারি করা হয়। সেজন্য চ্যারিটি এখন জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। এখন জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে স্মাগলিং। বিভিন্ন রকম অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত টাকাই হচ্ছে তাদের অর্থের উৎস।

চোরাচালানিদের তালিকাও আছে কাস্টমসের গোয়েন্দা ইউনিটের কাছে। এ প্রসঙ্গে  মইনুল খান বলেন, কে কতবার শুল্ক ফাঁকি দিয়েছেন, দেশ থেকে বিভিন্ন দেশে যাওয়া আসা করেছেন সেই তথ্যও আমাদের কাছে আছে। কার ইতিহাস কী রকম, কোন দেশ আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সব তথ্যই সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানান তিনি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় আমরা কাজ করে থাকি। কাউকে ছাড় দিয়ে কাজ করছিনা। এজন্য সরকারের  সদিচ্ছাও আছে। সুশাসনকে সামনে রেখে কাজ করছি। সরকারের সদিচ্ছা না থাকলেতো কাজ করতে পারতাম না।

সরকারের ২০২১ সালের যে রূপকল্প রয়েছে সেটা বাস্তবায়ন করার জন্য এদেশে অপরাধ কমাতে হবে, রাজস্ব বাড়াতে হবে এবং ধনী গরীবের বৈষম্য কমাতে হবে। যেমন- শত শত কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে যারা এই অবৈধ সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করছেন, তারা দুইভাবে অপরাধ করেছেন। একটি হচ্ছে টাকাগুলো দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।আমরা যে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের কথা বলি  সেটাও ক্ষতির মুখে পড়ছে। অন্যদিকে সরকার ন্যায্য শুল্ক পাচ্ছে না। এ জন্য শুল্ক ফাঁকির বিরুদ্ধে শক্ত  অবস্থান তৈরি করতে আমরা বদ্ধপরিকর।

এ কাজ করতে গিয়ে হুমকি-ধমকি পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরাতো হুমকি-ধমকির মধ্যেই আছি। তিনি বলেন, শুল্ক স্টেশনগুলো হচ্ছে বৈধ সীমান্ত। এখান দিয়ে পণ্য যেমন আসা-যাওয়া করে, ঠিক তেমনি যাত্রীও আসা-যাওয়া করেন। এই বৈধ পথে যেনো অবৈধ পণ্য ও নিষিদ্ধ কোনও পণ্য না আসতে পারে সেজন্য কাস্টমস সেখানে অব্যাহতভাবে কাজ করছে।

/এপিএইচ/

/আপ: এইচকে/