একান্ত সাক্ষাৎকারে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ

শ্রম খাতে সরকারের মনোযোগ এখন পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক নয়

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সরকার এখনও বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছে। শ্রম খাতে বৈষম্য দূর করতে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, সব শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা ও সর্বজনীন আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে বিদ্যমান কাঠামোর বাইরে গিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, শ্রম খাত নিয়ে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও এ খাতে তাদের মনোযোগ এখনও পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শ্রম সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কমিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া। সে সময় আপনারা কী কী সুপারিশ করেছিলেন?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: প্রথমেই বলতে চাই, শ্রম সংস্কার কমিশন গঠন জুলাই অভ্যুত্থানের একটি অপরিহার্য অংশ ছিল। এই অভ্যুত্থান মূলত বৈষম্যের বিরুদ্ধে হয়েছিল। যদিও এর প্রতীকী বিষয় ছিল— চাকরিতে কোটা, কিন্তু বাস্তবে মানুষ গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতি, বৈষম্য এবং জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল। অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ— সব ক্ষেত্রেই মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল। এই আন্দোলনে শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। শহীদদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই ছিলেন শ্রমজীবী মানুষ, এমনকি শিশুশ্রমিকও ছিলেন। আবার যখন ছাত্রদের আন্দোলন তীব্র দমন-পীড়নের মুখে পড়ে, তখন নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাব ও যাত্রাবাড়ী এলাকার হকার, দোকানকর্মচারী, রিকশাচালকসহ বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেন। তাই শ্রমিকদের বিষয়ে নতুন সরকার কার্যকর ভূমিকা নেবে, এটা খুব  জরুরি ছিল।

৫ আগস্টের পর আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপকভাবে রাজনীতিকরণ হয়ে পড়েছিল। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ সুযোগও নিয়েছিলেন। এসব কারণেই  শ্রম সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল— বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের জন্য বৈষম্যহীন ও ন্যায্য শ্রমব্যবস্থা গড়ে তোলা। একইসঙ্গে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমের প্রতি এক ধরনের অবহেলা রয়েছে। এখনও অনেকেই মনে করেন, যিনি কায়িক শ্রম করেন, তিনি সমাজে ততটা মর্যাদার অধিকারী নন। এই মানসিকতার পরিবর্তন এবং শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। রাষ্ট্রে শ্রমিকদের প্রতি সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নও আমাদের উদ্দেশ্যের অংশ ছিল।

আমরা সংবিধানের ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদকে ভিত্তি হিসেবে নিয়েছি। সেখানে শ্রমের মর্যাদা, কাজের অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বিভিন্ন কনভেনশনকেও ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: কমিশনের প্রতিবেদনে মূল ফোকাস কী ছিল?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: আমাদের অন্যতম নীতি ছিল সর্বজনীনতা (ইউনিভার্সালাইজেশন)। অর্থাৎ, শুধু কোনও নির্দিষ্ট শ্রেণির শ্রমিক নয়, সব শ্রমজীবী মানুষের জন্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দেশের বড় একটি অংশ এখনও আইনের সুরক্ষার বাইরে। আমরা কয়েকটি জাতীয় মানদণ্ড তৈরির সুপারিশ করেছি। যেমন- একটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি মানদণ্ড নির্ধারণ করা, যার ভিত্তিতে বিভিন্ন খাত নিজেদের মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে পারবে। সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা, যাতে কর্মহীনতা, অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে শ্রমিক সুরক্ষা পান। প্রতিটি শ্রমিকের জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা, যাতে তার শ্রমিক পরিচয় নিবন্ধিত থাকে। শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা। আর শ্রমিকের অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কমিশনের প্রতিবেদনের শুরুতেই আমরা এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।

এছাড়া নীতিমালা, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, সে বিষয়েও সুপারিশ করেছি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে বর্তমানে দুটি অধিদফতর থাকলেও আমরা আরও দুটি অধিদফতর— সামাজিক নিরাপত্তা অধিদফতর এবং কর্মসংস্থান অদিফতর গঠনের প্রস্তাব দিয়েছি। কারণ মন্ত্রণালয়ের নাম কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় হলেও কর্মসংস্থান নিয়ে আলাদা অধিদফতর নেই। অথচ বেকারত্ব বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা।

আমরা আরও প্রস্তাব করেছি, উপজেলা পর্যায়ে শ্রম অধিদফতরের অফিস না থাকলেও সমাজকল্যাণ বা নারী বিষয়ক দফতরের মাধ্যমে যেন শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হলে অভিযোগ জানাতে পারেন।

বাংলা ট্রিবিউন: আর কী কী সুপারিশ ছিল?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ:  এছাড়াও হকার উচ্ছেদ, জেলেদের জাল পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা রিকশা ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোর বিরোধিতা করেছি। আমরা বলেছি, কেউ আইন ভঙ্গ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তার জীবিকার উপকরণ ধ্বংস করা উচিত নয়। কোনও আইনেই এমন শাস্তির বিধান নেই। সব মিলিয়ে আমাদের মূল নীতি ছিল— বাংলাদেশের সংবিধান শ্রমিকদের যে অধিকার দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের পথ তৈরি করা।

বাংলা ট্রিবিউন:  আপনারা যে সুপারিশ করেছিলেন, তার মধ্যে এমন কোনও সুপারিশ আছে, যেটি বাস্তবায়ন হয়নি?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: পুরোপুরি বলতে গেলে কোনও সুপারিশই সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। তবে বাস্তবায়নের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা একটা জিনিস বলেছিলাম... যে সুপারিশগুলো করলাম, আর বিভিন্ন সংগঠন যে সুপারিশগুলো করেছে, সেগুলোকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে নিয়ে আসার জন্য একটা জাতীয় সামাজিক সংলাপ গঠন করা। সরকার এখন সেটিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনেছে এবং সে অনুযায়ী কিছু কাজও শুরু হচ্ছে। কিছু সুপারিশ আইনে এসেছে, কিছু বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। যদিও সব সুপারিশ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলা ট্রিবিউন:  এমন কোনও সুপারিশ ছিল, যা নিয়ে মতবিরোধ বা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: কমিশনে আলোচনা ও বিতর্ক অবশ্যই হয়েছে। কারণ সেখানে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি, সরকারের সাবেক কর্মকর্তা, আইনজীবী এবং ছাত্র প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পক্ষের সদস্য ছিলেন। তবে সব আলোচনা শেষে আমরা একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছি এবং সবাই প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছি। আমরা শ্রমিকের অধিকার, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, শিল্পের উন্নয়ন এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের মধ্যে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা করেছি। অর্থাৎ শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত হলে শিল্পের উন্নয়ন হবে, আর শিল্পের উন্নয়ন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে। আমরা বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখিনি।

বাংলা ট্রিবিউন:  সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত না হলে শ্রমিকদের কি কোনও ক্ষতি হবে বলে মনে করেন?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: শুধু শ্রমিকদের নয়, এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে বাংলাদেশের। কারণ দেশে লাখ লাখ মানুষ হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সচিবালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন, কিন্তু তাদের চাকরির কোনও নিশ্চয়তা নেই। আবার লাখ লাখ ফুড ডেলিভারি কর্মী আছেন, যাদের কাছ থেকে দ্রুত সেবা প্রত্যাশা করা হয়, কিন্তু তাদের নিজের জীবনের কোনও নিরাপত্তা নেই। একইভাবে গৃহশ্রমিক, শিশুশ্রমিকসহ বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। এর ফলে শুধু একজন শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং পুরো সমাজে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হয়। একজন রিকশাচালক ৫০ বছর কাজ করার পরও জানেন না, ৬৫ বছর বয়সে তার জীবিকা কী হবে। এই অনিশ্চয়তার মূল্য শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকেই দিতে হয়।

বাংলা ট্রিবিউন:  বাংলাদেশের শ্রম খাতে এমন কোনও সমস্যা আছে, যেটি নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়, কিন্তু বাস্তবে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: আমার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা। এ নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও এটি সবচেয়ে বড় সমস্যা।

বাংলা ট্রিবিউন:  রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে শ্রম খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করেন?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: এক-দুই বছর নয়, ছয় মাসের মধ্যেই অনেক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এটি কোনও রকেট সায়েন্স নয়। আমাদের প্রয়োজনীয় আইন রয়েছে। সেগুলোকে আরও বিস্তৃত করতে হবে। শ্রমিকদের একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা, জাতীয় ন্যূনতম মজুরির মানদণ্ড নির্ধারণ করা, কিংবা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণ— এসব করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং সরকারের কাছেই রয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় পেনশন স্কিম ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় করে অন্তত কিছু শ্রেণির শ্রমিককে দ্রুত এর আওতায় আনা সম্ভব। এগুলো ছয় মাস বা ১৮০ দিনের কাজ— এর বেশি সময় লাগার কথা নয়।

বাংলা ট্রিবিউন:  বর্তমান সরকারের কাছে আপনার কী প্রত্যাশা?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: সরকারের ১৮০ দিন এখনও পূর্ণ হয়নি। তবে শ্রম খাতে তাদের যে মনোযোগ, সেটি আমাকে এখনও খুব বেশি উৎসাহিত করেনি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম উপদেষ্টার আন্তরিকতায় আমি কোনও ঘাটতি দেখি  না। কিন্তু এটাতো একটা সমন্বিত উদ্যোগ, অনেক কিছু যুক্ত এর সঙ্গে। কিন্তু  পরিবর্তনের চিন্তা করে যে পরিকল্পনা, সেটাএ ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে।

সরকারের সদিচ্ছা আছে, উদ্যোগও আছে। কিন্তু তারা এখনও বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছে। বর্তমানে নির্ধারিত মজুরির আওতায় ৪২টি খাত রয়েছে। সেখানে আরও কিছু খাত যুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সমাধান হতে হবে জাতীয়ভাবে একটি  মজুরি মানদণ্ড ঠিক করা।

একইভাবে বিদ্যমান আইনে শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার থাকলেও সেটি সীমিত। সেখানে গৃহশ্রমিকদের যুক্ত করা উচিত। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। সব শ্রমিকের পরিচয়পত্র থাকতে হবে, সবার সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং সবার সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং, ফ্রেমওয়ার্কের বাইরে গিয়ে চিন্তা করাটা অনুপস্থিত আছে। এটি মূলত ২০২৪ চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ সেখানে বৈষম্য দূর করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু আমরা আইনের মাধ্যমেই বৈষম্য করছি। এবং ওই আইনটা একইভাবে করছি, ফলে বৈষম্য বাড়ছে। 

বাংলা ট্রিবিউন: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের শ্রম খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী বলে মনে করেন?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের কারণে দক্ষতার ঘাটতি। এই পরিবর্তনের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত প্রস্তুতি দরকার, সেখানে আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে শুধু নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশকারীরাই নয়, বর্তমানে কর্মরত অনেক শ্রমিকও চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। এখনই যদি তাদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে না নেয়া যায়। তাই দক্ষতা উন্নয়নের কার্যকর কর্মসূচি নিতে হবে এবং যারা কাজ হারাবেন, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের এখনও প্রচুর সম্ভাবনা আছে। যেমন- আমাদের কৃষি, হর্টিকালচারসহ বিভিন্ন খাতে প্রচুর প্রযুক্তিনির্ভর কাজের সুযোগ  আছে। এগুলো যদি এক্সপ্লোর করা যায়... আমাদের প্রচুর যুব কর্মশক্তি আছে, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানোরও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেটাকে আমাদের এক্সপ্লোর করতে হবে, প্রস্তুতি নিতে হবে। না-হলে আগামী পাঁচ বছর পর বাংলাদেশের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা কতটা জরুরি?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: এটি একেবারেই অত্যাবশ্যকীয়। কারণ এখনইতো ব্যবসায় সঙ্গে শ্রম অধিকার সম্পর্কিত করা হয়। কিন্তু ২০২৯ সালে বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হবে, তখন অনেক সামাজিক এবং শ্রম অধিকার মানতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন:  শ্রম অধিকার নিশ্চিত না হলে রফতানি বাণিজ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ এরজন্য যে মেধা, যে পরিশ্রম যাবে, যে ব্যবসা লস হবে— তার থেকে অনেক কম খরচে শ্রমিক অধিকার রক্ষা করা যায়।

বাংলা ট্রিবিউন:   যদি আপনি এক বছরের জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা হতেন, তাহলে প্রথম তিনটি সিদ্ধান্ত কী নিতেন?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ:  প্রথম আমি যেটা করতাম সেটা হচ্ছে, এখনকার যে যত স্কিম আছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় শ্রমিকদেরকে টার্গেট করে বা নিম্ন আয়ের  মানুষকে টার্গেট করে, সেটার একটা সমন্বিত এবং সুনির্দিষ্ট শ্রমজীবী গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে আমি কিছু স্কিম চালু করতাম। সারা বাংলাদেশের শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, ৭০ বছর ঊর্ধের অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং যারা বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কাজ হারিয়েছেন, তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতাম। এটা এক নম্বর করতাম, যা আছে তাই দিয়ে।

আর দুই নম্বরে সব শ্রমিকের ডাটাবেজটা তৈরির কাজ শুরু করে দিতাম। যাতে প্রত্যেকে পারে জানে যে, আমার একটা পরিচয় আছে। আমাদের কমিশনে যখন আমরা সবাই বসেছি, তখন এটা ছিল আমাদের এক নম্বর দাবি। মানুষ তো মনে করে, শ্রমিকরা মনে হয় বেতন চায়, অমুক চায়। কিন্তু তার আগে শ্রমিক চায় তার পরিচয়।

তৃতীয় কাজ হচ্ছে জাতীয় মানদণ্ডগুলো তৈরি করা। এটার জন্য বাংলাদেশে খুব বেশি বাজেট দরকার নাই। সবার সাথে কথা বলেই বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে জাতীয় নূন্যতম মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা, সংগঠন করার অধিকার; এটা করতাম। আরেকটা বলি... চতুর্থটা হলো, প্রত্যেক শ্রমিক যেন তার  আইনানুগ প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত না হয়। তাই তার জন্য অভিযোগ জানাবার এবং সেটা রিড্রেসারের ব্যবস্থা করতাম। সেটা আদালতের মাধ্যমে না, মানে সেটা একটা মধ্যস্থতার মাধ্যমে যেন হয়, সে ব্যবস্থা নিতাম। কারণ, দেশে প্রতিদিন শুধু গাড়িতে দাগ লাগার অজুহাতে কতজন ড্রাইভারকে চাকরি থেকে বিদায় দেওয়া হয়, মাসের মাঝখানে সেটা, আমরা কিন্তু অনেকেই খোঁজ রাখি না। তাদের যাওয়ার কোনও জায়গা নাই।

বাংলা ট্রিবিউন:   আমরা দেখেছি, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবিতে শ্রমিক নেতারা দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু গার্মেন্টসের বাইরে অনেক খাতের শ্রমিক আছেন, যাদের মজুরি নির্ধারণের কোনও ভিত্তিই নেই। এই বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: এ কারণেই আমরা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি মানদণ্ডের কথা বলছি। বর্তমানে অনেক খাতে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের কোনও ভিত্তি নেই। এমনকি একজন ভালো নিয়োগকর্তাও জানেন না, একজন শ্রমিককে ন্যায্যভাবে কত মজুরি দেওয়া উচিত।

আমরা চাই, সরকার জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে একটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করুক। তখন একজন গৃহশ্রমিক থেকে শুরু করে সব ধরনের শ্রমিকের ক্ষেত্রেই একটি মানদণ্ড থাকবে। বাস্তবে অধিকাংশ মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে ঠকাতে চান না। কিন্তু কী পরিমাণ মজুরি ন্যায্য, সে বিষয়ে কোনও নির্ধারিত মানদণ্ড না থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

বিষয়টি আমি যাকাতের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। মানুষ জানে, নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকলে কতটুকু যাকাত দিতে হবে। কারণ সেখানে একটি নির্ধারিত মানদণ্ড আছে। কিন্তু শ্রমিকের মজুরির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এমন কোনও মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়নি। ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না, কত দিলে সেটি ন্যায্য হবে। তাই জাতীয় মজুরি মানদণ্ড নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলা ট্রিবিউন:   বাংলাদেশের শ্রম খাতকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ে যেতে হলে সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট সবার কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ: প্রথমত, জাতীয়ভাবে একটি ন্যূনতম মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের  কিছু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা শোষিত না হয়। আইনকে সেই সুরক্ষা দিতে হবে। এই কয়টা জিনিস করলে আন্তর্জাতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবো। আরেকটি হচ্ছে, সম্মিলিতভাবে আলোচনার ব্যবস্থা করা।