২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। ওই বছরের ১৮ নভেম্বর গণমাধ্যমকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও বস্তুনিষ্ঠ করতে ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ নামে একটি ১১ সদস্যের একটি কমিশন গঠন করা হয়।। কিন্তু কমিশনের দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমান সরকারও সেসব সুপারিশ গুরুত্ব দেয়নি। এ নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান সাংবাদিক কামাল আহমেদ। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের মাত্র ছয় মাস এখনও পূর্ণ হয়নি। তাদের নানান ধরনের অগ্রাধিকারের প্রশ্ন আছে, একটু সময় তাদের লাগতেই পারে। আমরা তাদের আরেকটু সময় দিয়ে দেখি, কী হয়?
বাংলা ট্রিবিউন: গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে?
কামাল আহমেদ: সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি, সেটা তো সবাই দেখছেন। কারণ বাস্তবায়ন হলে গণমাধ্যমে কিছু না কিছু পরিবর্তন আমরা দেখতে পেতাম।
বাংলা ট্রিবিউন: জুলাই আন্দোলনের পর দেশে কাঙ্ক্ষিত কোনও পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন?
কামাল আহমেদ: একটা দিক থেকে পরিবর্তন আমরা দেখছি, সেটা হচ্ছে— কেউ এখন আমাদের কাজ করার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করছে না। বিশেষ করে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনও ধরনের হস্তক্ষেপ করছে না, কোনও সংবাদপত্র অফিসে সরকারের কোনও দফতর থেকে টেলিফোন আসছে না, গোয়েন্দাদের টেলিফোন আসছে না। এমনকি টেলিভিশন স্টুডিওতে কোনও টকশোতে কাকে রাখতে হবে, সে ধরনের কোনও ইন্সট্রাকশন আসছে না। সেই স্বাধীনতাটা এখন আছে। এই স্বাধীনতাটা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ছিল। কিন্তু আর যে সবপরিবর্তন দরকার, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা, সাংবাদিক-সাংবাদিকতার সুরক্ষা, সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা এগুলোর প্রশ্নে সুপারিশের কোনোটাই বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলা ট্রিবিউন: সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় নিয়ে করণীয় কী?
কামাল আহমেদ: আমরা বিভিন্ন সময় আক্রমণের শিকার হয়েছি, হচ্ছি এবং এটা হয়তো আরও অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না— একটা আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা তৈরি হয়। সাংবাদিকদের ওপরে হামলা করলে, সাংবাদিকদেরকে হুমকি দিলে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করলে, সাংবাদিকদের অধিকার খর্ব করলে— সেই খর্বকারী বা অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে, তার জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকবে— সেরকম আইন হতে হবে। সেই আইন হলে, সেই আইন কার্যকর করবে কে, সেটাও ঠিক করতে হবে। সেটাও যেন সেই ব্যবস্থায় থাকে। তাহলে একটা প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। আমরা এখনও জানি যে, দেশের ফৌজদারি আইন, দেশের সাধারণ অপরাধের যেসব আইনগুলো আছে— সে আইনে সাংবাদিকের ওপর হামলা হলে মামলা করা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি মামলা করতে পারেন, কিন্তু দেখা যায় যে, ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকের মামলা পুলিশ নিচ্ছে না। আহত সাংবাদিকের মামলা নিচ্ছে না। আবার মামলা নিলেও সেই মামলার তদন্ত হয় না। সেই মামলার বিচার হয় না। আমরা জানি, সাগর- রুনি হত্যার বিচার এখনও হয়নি। এরকম অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে যে, সাংবাদিকরা আহত ও নিহত হয়েছেন। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। কিন্তু তাদের সেই মামলার বিচার হয়নি। কারণ দেশে যে প্রচলিত আইনি ব্যবস্থা, সে ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না। সে আইনে সাংবাদিকতার জন্য আলাদা করে সুরক্ষার কোনও ব্যবস্থা নেই। প্রাতিষ্ঠানিক কোনও কাঠামো নেই এবং সেই কারণে এটা হচ্ছে না।
বাংলা ট্রিবিউন: গণমাধ্যমের কাক্ষিত পরিবর্তন আসেনি, এটা কি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার কারণে?
কামাল আহমেদ: সংস্কার কমিশন যে সুপারিশগুলো করেছিল, সেই সুপারিশগুলোর প্রতি সবাই সমর্থন জানিয়েছিল, অংশীজনরাও। অংশীজন বলতে গণমাধ্যমের মালিকরা, গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় নেতৃত্ব যারা আছেন, সেই সম্পাদকরা, যে সাংবাদিকরা কাজ করেন– সেই সাংবাদিকদের ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন সংস্থাগুলো, আর নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও। বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন, যাদেরকে বলে সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো, তারাও এটাকে সমর্থন করেছিল। শুধু দেশের মধ্যে নয় বাইরে আন্তর্জাতিক পরিষদেও যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন, সেসব সংস্থা ও এনজিও তারাও এই সংস্কার কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়েছিল। সুতরাং এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে কিছুটা পরিবর্তন যে হতো, এটাতে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ তারা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে, বাস্তব অবস্থার বিশ্লেষণ থেকে নিশ্চিত প্রান্তে পৌঁছেছিলেন যে, এই কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবসম্মত এবং এগুলো হওয়া দরকার। কিন্তু অন্তর্বর্তী অন্তর্বর্তী সরকার বলেছিল, তারা এটা করবে, কিন্তু করেনি। রাজনৈতিক দলগুলো বলেছিল যে, তারা এটা সংস্কার সমর্থন করে। কিন্তু এখন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে। এখন তারা এটা কখন করবে আমরা বুঝতে পারছি না। সুতরাং এই প্রশ্নগুলো আসলে সরকারকেই আপনাদের করতে হবে। সরকারের কাছে জানতে চাইতে হবে যে, এই সংস্কারগুলো তারা করবে কিনা, বা করলে কবে হবে? কীভাবে হবে?
বাংলা ট্রিবিউন: গণমাধ্যম কমিশন কেন জরুরি?
কামাল আহমেদ: আমরা বলেছিলাম, এটা একটা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হবে। সরকার গণমাধ্যমে যাতে হস্তক্ষেপ না করে, সে কারণে এই প্রতিষ্ঠান চেয়েছিলাম। গণমাধ্যমের প্রতিনিধি, অংশীজনরাই গণমাধ্যমকে স্বনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করবেন। সম্পাদকরা জাতীয় পর্যায়ে একটি ইথিক্যাল মান নির্ধারণ করবেন, নৈতিক মান নির্ধারণ করে দেবেন যে, নীতি-নৈতিকতা মেনেই সাংবাদিকতা হবে। অর্থাৎ কাউকে হয়রানি করা, তথ্য দিয়ে কিংবা বিকৃত তথ্য দিয়ে বা খণ্ডিত তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা, কারও স্বার্থ হাসিল করা, ব্যক্তিগোষ্ঠী বা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল, ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করার জন্য যদি গণমাধ্যমকে ব্যবহার করার চেষ্টা হয়, সেগুলো যাতে না হয়, সেগুলোর প্রতিকার করতে পারে— এরকম একটা নীতিমালা সম্পাদকরা তৈরি করবেন। সেই নীতিমালা কেউ অনুসরণ করছে কিংবা অনুসরণ করছে না, ব্যত্যয় হচ্ছে কিনা, সইটা বিচার করবে এই স্থায়ী কমিশন গণমাধ্যম কমিশন।
গণমাধ্যম কমিশন এই স্বনিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াটা কার্যকরভাবে যদি করতে পারে, পরিচালনা করতে পারে, তাহলে সরকারের হস্তক্ষেপ-মুক্ত থাকতে পারবো আমরা। আর সেটা না হলে সরকার যদি কোনও কিছু করে, সরকার একবার হস্তক্ষেপ করা শুরু করলে, তার রাজনৈতিক স্বার্থে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সংবাদ মাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ করতে শুরু করবে। তাতে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: সংস্কার কমিশনের সুপারিশ যেহেতু বাস্তবায়ন হচ্ছে না, সরকার যদি সহযোগিতা না করে, তাহলে কীভাবে গণমাধ্যম কমিশন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে?
কামাল আহমেদ: সরকার যদি সহযোগিতা না করে, কমিশন গঠনের জন্য আইন না করে, তাহলে তো কমিশন হচ্ছে না। সেটাই জন্য তো আইন লাগবে। আমরা যেটা সুপারিশ করেছি, সেই প্রক্রিয়ায় স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, সেটার উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। সরকার তো বলছে করবে। এখন তাদেরকে একটু সময় হয়তো দিতে হবে। কারণ সরকারের মাত্র ছয় মাস এখনও পূর্ণ হয়নি। তাদের নানান ধরনের অগ্রাধিকারের প্রশ্ন আছে, একটু সময় তাদের লাগতেই পারে। আমরা তাদের আরেকটু সময় দিয়ে দেখি, কী হয়?