যুক্তরাজ্যে সারোয়ার দম্পতির ৫০ লাখ পাউন্ড স্কুল ফি আত্মসাৎ, কাঠগড়ায় ‘টাইগার মম’

যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্ডিফ সিক্সথ ফর্ম কলেজের দাতব্য তহবিলকে ব্যক্তিগত ‘পিগি ব্যাংক’ বা জমানো টাকার বাক্সের মতো ব্যবহার করে বিলাসবহুল জীবনযাপনের অভিযোগ উঠেছে মালয়েশীয় বংশোদ্ভূত এক দম্পতির বিরুদ্ধে। 

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) মারথার টিডফিল ক্রাউন কোর্টে এ সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক পরিচালক নাদিম সারোয়ার (৫০) ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের ফি বাবদ সংগৃহীত অর্থ থেকে অন্তত ৫০ লাখ পাউন্ড আত্মসাতের দায় স্বীকার করেছেন। তবে তার সাবেক স্ত্রী ইয়াসমিন সারোয়ার (৪৮) নিজের বিরুদ্ধে আনা ক্ষমতার অপব্যবহার, চুরি, ঋণদাতাদের ঠকানো এবং অর্থপাচারের মোট নয়টি অভিযোগ অস্বীকার করে বিচার প্রক্রিয়া মোকাবিলা করছেন।

আদালতে প্রসিকিউটর মার্ক কটার কেসি জুরিদের জানান, মালয়েশিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে এসে সারোয়ার দম্পতি কলেজ পরিচালনার জন্য পরিচালক ও ট্রাস্টি হিসেবে মোটা অঙ্কের বেতন গ্রহণ করতেন। কিন্তু নিজেদের লোভ চরিতার্থ করতে তারা দাতব্য তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি কেনা, বিদেশে অর্থপাচার এবং বিলাসবহুল জীবনে তা ব্যয় করেন। ১৭ বছর বয়সে এ-লেভেল সম্পন্ন করতে মালয়েশিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে আসেন ইয়াসমিন সারোয়ার। পরে ২০০৪ সালে নিজ বাড়িতে একটি ছোট টিউশনি গ্রুপ থেকে তিনি প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু করেন এবং কঠোর শৃঙ্খলার কারণে পরিচিতি পান ‘টাইগার মম’ হিসেবে। প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত দাতব্য মর্যাদা পেয়ে দ্রুত প্রসার লাভ করে এবং ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের জাতীয় এ-লেভেল ফলাফলের র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থান অর্জন করে। চীন ও আলবেনিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হয়, যেখানে বোর্ডারদের বাৎসরিক ফি ছিল ৭৫ হাজার পাউন্ডের বেশি। ২০১৬ সালে বিবিসি-র তথ্যচিত্র ‘ব্রিটেন্স ব্রেনিয়েস্ট স্কুল’-এ কলেজটি বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।

পরিকল্পিতভাবে ফি সরিয়ে মালয়েশিয়ায় পাচার

আদালতকে জানানো হয়, একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে কলেজের সব আয় ও কর-সুবিধার অর্থ শুধুমাত্র শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যয় করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু প্রসিকিউশনের অভিযোগ, সারোয়ার দম্পতি নিয়মতান্ত্রিকভাবে সেই অর্থ লুট করেছেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে, প্রতিষ্ঠানের মূল দাতব্য অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি সমনামীয় একাধিক ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা হতো। শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪১ লাখ পাউন্ড টিউশন ফি মূল দাতব্য অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে এসব গোপন অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা শনাক্ত করেছেন, ইয়াসমিন সারোয়ার কলেজের অর্থ দিয়ে কার্ডিফের সিনকোয়েডে ১১ লাখ পাউন্ডের একটি বিলাসবহুল বাড়ি কেনেন এবং একই সময়ে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত তার মায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১১ লাখ পাউন্ডের বেশি অর্থ পাচার করেন। প্রসিকিউটর জানান, ২০১৩ সালে তিনি কলেজের পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করে দুটি আলাদা ভূঁইফোড় কোম্পানি খোলেন। অভিযোগ রয়েছে, স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে স্বামীর হাত থেকে সম্পদ গোপন রাখতে এবং বিদেশে টাকা পাচারের সুবিধার্থে এসব ভুয়া বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন তিনি।

আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ জানায়, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিচালনা পর্ষদে সচেতনভাবেই জবাবদিহিতা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। ট্রাস্টি বোর্ডে প্রবীণ শিক্ষক জন প্রাইস-টমাস ও তার পরিবারের সদস্যদের রাখা হলেও তারা আর্থিক তদারকিতে কার্যকর ছিলেন না। অন্যদিকে বোর্ডের অপর চারজন ট্রাস্টি ছিলেন সারোয়ার দম্পতির প্রত্যক্ষ আত্মীয়—যার মধ্যে নাদিম সারোয়ারের বোন, কাজিন এবং ইয়াসমিনের বোন অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছাড়াই দম্পতি নিজেদের ইচ্ছামতো মোটা অঙ্কের বেতন ও আর্থিক সুবিধাদি নিতেন। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার অজুহাতে প্রাইস-টমাস পরিবার পদত্যাগ করলে এমন এক অভিভাবককে ট্রাস্টি করা হয়, যিনি ইংরেজি ভাষায় স্বাভাবিক লেখাপড়া জানতেন না।

২০১৫ সালের শেষ দিকে কলেজের তৎকালীন পাস্টোরাল সার্ভিসেস প্রধান গ্যারেথ কোলিয়ার প্রথম অনিয়ম শনাক্ত করেন এবং প্রতিষ্ঠানে ভয়ভীতির পরিবেশের অভিযোগ তোলেন। ব্যবসায়িক সফরের খরচের হিসাব চাইলে নাদিম সারোয়ার তাকে টাকার ভর্তি একটি বাদামী কাগজের ব্যাগ দেখিয়ে সেখান থেকে ইচ্ছামতো নগদ অর্থ তুলে নিতে বলেন। পরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন অর্থ পরিচালক ড্রু লুইস-রবসন কলেজের হিসাবে ব্যাপক গরমিল পান এবং একজন অর্থ সহকারী প্রায় ১৮ লাখ পাউন্ডের কোনও হদিস পাচ্ছিলেন না। ওই সহকারী অনিয়মের প্রশ্ন তুললে চ্যারিটি কমিশনের অডিটের সময় তাকে জোরপূর্বক ছুটিতে পাঠানো হয় এবং চাকরিচ্যুতির শর্ত হিসেবে গোপনীয়তা চুক্তিতে (এনডিএ) স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন ইয়াসমিন।

তদন্ত ও আদালতের বিচার কার্যক্রম

অর্থের হিসাবে লাগাতার গরমিলের কারণে প্রতিষ্ঠানের মূল নিরীক্ষক দল ২০১১ সালের আর্থিক হিসাব জমা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর ২০১৩ সালে অভিযুক্তরা অপেক্ষাকৃত কম কঠোর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট রগু শিবাপালানকে (৪১) নিয়োগ দেন। শিবাপালান কোনও যাচাই-বাছাই ছাড়াই দম্পতির দেওয়া ভুয়া তথ্য গ্রহণ করে অডিট প্রতিবেদন তৈরি করেন। কোম্পানি আইনের ৫০৭ ধারা অনুযায়ী বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য সংবলিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেওয়ার অপরাধ ইতিমধ্যেই স্বীকার করেছেন শিবাপালান।

নিয়মমাফিক বার্ষিক বিবরণী দাখিল না করায় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে চ্যারিটি কমিশন প্রতিষ্ঠানে সরাসরি পরিদর্শন চালিয়ে আর্থিক অনিয়মের সত্যতা পায় এবং একজন প্রশাসক নিয়োগ দেয়। পরে ২০১৮ সালে বহুজাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ডিউকস এডুকেশন’ কলেজটি কিনে নেয়; ফলে বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে এই দুর্নীতির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আদালত নাদিম সারোয়ারের সাজা ঘোষণার আগে তাকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেন, তবে বিচারক সেলিয়া হিউজ স্পষ্ট জানিয়েছেন তার কারাগারে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। হিসাবরক্ষক শিবাপালান নিঃশর্ত জামিনে রয়েছেন। ইয়াসমিন সারোয়ারের বিরুদ্ধে মারথার টিডফিল ক্রাউন কোর্টে শুরু হওয়া এই বিচার কার্যক্রম আগামী ১০ সপ্তাহ ধরে চলবে।