বাধ্যতামূলক ধর্মশিক্ষার দাবি

‘কাকরাইল ও টঙ্গীতে সাদপন্থিদের কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হবে না’

তাবলিগ জামাতকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশ থেকে বাধ্যতামূলক ধর্মশিক্ষার দাবি করা হয়েছে। ‘দাওয়াত ও তাবলিগ, মাদারেসে কওমিয়া এবং দ্বীনের হেফাজতের লক্ষ্যে’ ওলামা মাশায়েখ বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ইসলামি মহাসম্মেলন থেকে ৯ দফা ঘোষণায় এ দাবি করা হয়।

দেশের কওমি মাদ্রাসার শীর্ষ আলেমদের উপস্থিতিতে লিখিত দাবি পড়ে শোনান কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড-বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক।

যদিও এই সম্মেলনে কওমি আলেমদের একটি প্রভাবশালী অংশ শরিক হননি। এর মধ্যে চরমোনাই পীরপন্থি আলেম, আল হাইয়াআতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়াহর চেয়ারম্যান মাওলানা মাহমুদুল হাসানসহ রাজনীতি থেকে দূরে থাকা শীর্ষ আলেমরাও রয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগপন্থি আলেমরাও নীরব রয়েছেন এই ইস্যুতে।

মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা একাধিক আলেম জানান, বিগত কয়েক বছর ধরেই তাবলিগের দুই পক্ষ স্বাভাবিকভাবে কার্ক্রম চালিয়ে আসছে। হঠাৎ কোনও কারণ ছাড়া সরাসরি বিরোধিতা শুরু করেছেন হেফাজত ও রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কওমির শীর্ষ আলেমরা।

‘সোমবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দফতরে বৈঠকেও যোগ দেননি তারা, অথচ বিগত আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে বৈঠকে যোগ দিয়েছেন এই আলেমরাই। যারা মঙ্গলবার সমাবেশ করেছেন।’

হঠাৎ বিরোধিতা কেন, এ বিষয়ে সোমবার মধ্যরাতে মহাসমাবেশের আয়োজকদের একজন বলেন, ‘মাওলানা সাদ ২০১৮ সালের পর আসতে পারেননি। তাকে এবার ইজতেমায় আনার পরিকল্পনার কথা আমরা জানতে পেরেছি। কাকরাইলের নেজাম ভাগাভাগি নিয়েও তাদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। এজন্য এসব মোকাবিলা করতেই মহাসমাবেশ ডাকা হয়েছে।’

মঙ্গলবার ভোর থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসেন অংশগ্রহণকারী কওমি মাদ্রাসার আলেম ও শিক্ষার্থীরা। ঢাকার বাইরে থেকে যোগ দেন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও আলেম। মহাসমাবেশে ৯টি দাবি করা হয়। এর মধ্যে প্রথম দাবিতে বলা হয়েছে, হঠাৎ করেই কওমি মাদ্রাসায় হস্তক্ষেপের পাঁয়তারা চলছে। যদিও কীসের হস্তক্ষেপ তা উল্লেখ করেনি আয়োজকেরা।

মহাসমাবেশে বক্তব্য রাখছেন এক আলেম

মাহফুজুল হক দাবিতে বলেন, ‘আমরা লক্ষ করছি ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পরও কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপর ওই ফ্যাসিস্ট সরকারের ঘাপটি মেরে থাকা একটি বিশেষ মহল সুকৌশলে হস্তক্ষেপের পাঁয়তারা করে চলছে।’

দ্বিতীয় দাবিতে রয়েছে, সাধারণ শিক্ষা সিলেবাসের সর্বস্তরে ধর্মশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয় দাবিতে বলা হয়েছে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে মজলুম আলেম-ওলামা ও তৌহিদি জনতার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সব মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

চার নম্বরে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে সারা দেশ থেকে আগত নবীপ্রেমিক নিরীহ ছাত্র-জনতা ও মুসল্লিদের ওপর বর্বরোচিত ও নৃশংস গণহত্যার দোষীদের অবিলম্বে শাস্তির আওতায় এনে বিচার কার্যকর করতে হবে। সারা দেশের আলেম, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতার নামে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

পাঁচ নম্বর দাবিতে ২০১৮ সালের পহেলা ডিসেম্বর টঙ্গী ময়দানের জোড়ের প্রস্তুতিমূলক কাজে অংশগ্রহণকারী মাদ্রাসার নিরীহ ছাত্র-শিক্ষক এবং সাধারণ তাবলিগি সাথী ভাইদের ওপর সাদপন্থিরা পুলিশ প্রশাসনের গুটি কয়েক অফিসারের সহযোগিতায় নৃশংস হামলা চালানোর অভিযোগ করা হয়। বলা হয়, এ মহাসম্মেলন থেকে ওই হামলাকারী ও তাদের সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানানো হচ্ছে।

ছয় নম্বর দাবিতে বলা হয়, ‘স্বঘোষিত আমির মাওলানা সাদ সাহেব কোরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যা, নবী-রাসুল ও সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা-বিশ্বাসবিরোধী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। আরও উল্লেখ্য যে দাওয়াত ও তাবলিগের এই মকবুল মেহনত যুগ যুগ ধরে হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.), হজরত মাওলানা ইউসুফ (রহ.) ও হজরত মাওলানা এনামুল হাসান (রহ.)-এর উসুলের ওপর পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু মাওলানা সাদ সাহেব তাবলিগ জামাতের স্বীকৃত উসুল তথা নীতিমালা উপেক্ষা করে নিজস্ব মতের ভিত্তিতে পরিচালনা করার অপপ্রয়াস চালায়।’

‘এ কারণে দারুল উলুম দেওবন্দসহ উপমহাদেশের প্রখ্যাত উলামায়ে কেরাম তার গোমরাহিপূর্ণ বক্তব্য ও অবস্থানের ব্যাপারে উম্মাহকে সতর্ক করেছেন। তাই ইতোপূর্বে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান সাদ সাহেবকে বাংলাদেশে আসতে বাধা দিয়েছে বিধায় বর্তমান সরকারের কাছে অদ্যকার মহাসম্মেলন থেকে জোর দাবি জানানো হচ্ছে যে কোনও অবস্থাতেই তাকে বাংলাদেশে আসতে দেওয়া যাবে না।’

সাত নম্বরে বলা হয়, ‘উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে শুরারি নেজামে পরিচালিত বিশ্ব ইজতেমা এক পর্বে আয়োজন করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। তাই আগামী বিশ্ব ইজতেমা দুই পর্বেই অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি ও ০১-০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ শুক্র, শনি ও রবিবার এবং দ্বিতীয় পর্ব ০৭-০৮-০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ শুক্র, শনি ও রবিবার করার তারিখ আজকের এ মহাসম্মেলন থেকে ঘোষণা করা হলো। এ ব্যাপারে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছি।

‘কাকরাইল মসজিদ ও টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমার ময়দানের যাবতীয় কার্যক্রম উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে শুরারি নেজামে পরিচালিত হবে। উক্ত স্থানগুলোতে সাদপন্থিদের কোনও কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হবে না’ বলা হয় আট নম্বর দাবিতে।

নয় নম্বর দাবিতে ‘কাদিয়ানি অনুসারীদের অবিলম্বে অমুসলিম ঘোষণা’ এবং ‘কাদিয়ানিদের ইসলামি পরিভাষা ব্যবহার নিষিদ্ধ করার’ কথা বলা হয়েছে।