মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই বিশ্বজগত পরিচালনা করা এবং মানুষের পারস্পরিক প্রয়োজন পূরণের জন্য স্বয়ং মানুষের মধ্যেই মর্যাদাগত পার্থক্য রেখে দিয়েছেন। কেউ শাসক, কেউ শাসিত; কেউ বাদশাহ, কেউ প্রজা; কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র; কেউ মনিব, কেউ খাদেম বা কর্মচারী। কিন্তু মানুষের মধ্যকার এই মর্যাদার পার্থক্য, এই স্তরভেদ এবং পদমর্যাদার দিক থেকে এই উঁচু-নিচু কেবল এ জন্যই যে, একজনের প্রয়োজন অন্যজনের মাধ্যমে পূরণ করার জন্য।
পদমর্যাদার এই পার্থক্য এ জন্যও নয় যে, এটি বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হবে; যে ব্যক্তি উচ্চ পদমর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী, সে অন্য নিম্নস্তরের মানুষকে তুচ্ছ ও হীন মনে করবে। বিশেষত ইসলামের শিক্ষা এ বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট; ইসলাম কখনোই এই অনুমতি দেয় না যে, ধনী দরিদ্রের সঙ্গে এবং মালিক কর্মচারী ও শ্রমিকদের সঙ্গে তুচ্ছ ও খারাপ আচরণ করবে।
এ প্রসঙ্গে মধ্যপন্থি ও সর্বোত্তম আদর্শ তো সেটিই, যা মহানবী (সা.) তাঁর অধীনস্থদের, গোলামদের ও কর্মচারীদের সঙ্গে অবলম্বন করেছেন। তাদের সঙ্গে তিনি যে উত্তম আচরণ ও সুন্দর ব্যবহার করেছেন এবং তাঁর সাহাবারা (রা.) কর্মচারীদের সঙ্গে যে সদাচরণ করেছেন, এ বিষয়ে তাঁর ও তাদের শিক্ষা ও নির্দেশনাগুলো আজও দেদীপ্যমান।
মহানবী (সা.) খাদেম, অধীনস্ত ও কর্মচারীদের অধিকারের গুরুত্বের ওপর এত বেশি জোর দিয়েছেন, তিনি তাঁর মৃত্যুশয্যায়, জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতেও নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি বিধানের পাশাপাশি খাদেম ও কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের উপদেশ দিয়ে গেছেন ও অসিয়ত করেছেন।
মহানবী (সা.) খাদেম ও গোলাম শ্রেণিকে যাদের সে সময়ে একেবারেই তুচ্ছ ও নিচু শ্রেণির মনে করা হতো, তাদের মর্যাদা উন্নীত করে ভাইয়ের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। অর্থাৎ একজন মানুষ যেমন নিজের ভাইয়ের সঙ্গে সমতা ও সমঅধিকারের আচরণ করে, গোলাম ও কর্মচারীদের সঙ্গেও যেন তেমন আচরণ করা হয়, রাসুল (সা.) তার ওপর জোর নির্দেশ দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কর্মচারীরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তায়ালা তাদের তোমাদের অধীনে দিয়েছেন। সুতরাং যার ভাই তার অধীনে থাকে, সে যেন তাকে তা-ই খাওয়ায় যা সে নিজে খায় এবং তাকে তেমনই পরায় যেমন সে নিজে পরে। তাদের ওপর এমন কাজের বোঝা চাপিয়ে দিও না, যা তারা করতে সক্ষম নয়। আর যদি তাদের কষ্টকর কাজ দাও, তবে তাদের সহযোগিতা করো।’ (সহিহ বুখারি)
খাদেম ও মজদুর যেহেতু সেও একজন মানুষ, তারও পরিবার-পরিজন আছে, তারও ব্যক্তিগত প্রয়োজন রয়েছে। তাই তার মজুরি ও পারিশ্রমিক নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে হবে, টালবাহানা করা যাবে না। রাসুল (সা.) দ্রুত মজুরি পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘মজদুরের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও।’ (ইবনে মাজাহ) অর্থাৎ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর কিংবা নির্ধারিত সময়ে পারিশ্রমিক আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
মজুরি পরিশোধে টালবাহানা করার বিষয়ে মহানবী (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তিন শ্রেণির লোক এমন আছে, কিয়ামতের দিন আমি তাদের বিরোধী হব। তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে কোনও শ্রমিককে মজুরিতে নিয়োগ করে, তার কাছ থেকে পুরো কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তাকে তার মজুরি দেয় না।’ (সহিহ বুখারি)
একইসঙ্গে শ্রমিকের কাজের পরিমাণও নির্ধারিত হওয়া উচিত। এমন নয় যে, তার সামর্থ্য ও শক্তির বাইরে অতিরিক্ত কাজ দিয়ে তাকে ভারাক্রান্ত ও ক্লান্ত করে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘গোলামের কাছ থেকে এমন কাজ নিও না, যা তার শক্তি ও সামর্থ্যের বাইরে।’ (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)
উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্যগত নীতিমালার দৃষ্টিতে কর্মচারীর জন্য যেসব কাজ ছয় ঘণ্টা করা সম্ভব, সেসব কাজের জন্য ছয় ঘণ্টা; আর যেসব কাজ আট ঘণ্টা করা সম্ভব, সেসবের জন্য আট ঘণ্টা দায়িত্ব নির্ধারিত হবে। কিছু লোক অল্পবয়সী শিশু ও বৃদ্ধদের দিয়ে তাদের শক্তি ও সামর্থ্যের বাইরে কাজ করিয়ে নেয়, এটিও অপরাধ। স্থায়ী কর্মচারীদের জন্য সপ্তাহে এক দিন ছুটি থাকা উচিত এবং আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যও অবকাশ দেওয়া উচিত। (রদ্দুল মুহতার)
কাজের ক্ষেত্রে মনিবকেও তার কর্মচারীকে সহায়তা করা উচিত, পুরো কাজের বোঝা একমাত্র তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। যেমন-সে যদি কোনও ভারী বোঝা বহনকরে এবং তা তুলতে তার কষ্ট হয়, তবে মালিকেরও উচিত কিছুটা হাত লাগানো। মহানবী (সা.) খাদেমের কাজে সহযোগিতা করার ওপর সওয়াব ও প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মানুষ ভুলের পাত্র। মানুষ হিসেবে শ্রমিক ও কর্মচারী থেকে যদি কোনও ভুল হয়ে যায়, তবে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা উচিত, তাকে তিরস্কারের লক্ষ্যবস্তু বানানো বা কঠোর ভাষায় আক্রমণ করা যাবে না। সামান্য ছোটখাটো ভুলের জন্যও বারবার তাকে ধরা বা তার ওপর কঠোরতা করা অনুচিত। এ বিষয়ে মহানবী (সা.) এর কর্মপদ্ধতি আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আজকের পরিস্থিতি এমন, কর্মচারী ও শ্রমিকদের দ্বারা কোনও ভুল হয়ে গেলে ক্ষমা ও উদারতা তো দূরের কথা, আমরা তাদের তিরস্কার ও কটুকথার মাধ্যমে আক্রমণ করি, এমনকি মারধরও করি। অথচ সেও একজন মানুষ; তার হৃদয়েও ব্যথা ও কষ্ট থাকে, তার মনেও আঘাত লাগে এবং তার শরীরও যন্ত্রণাবোধ করে।
তাই মানুষ হিসেবে তার সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে হবে। সারকথা হলো, কর্মচারীদেরকে হেয় ও তুচ্ছ মনে করা যাবে না; বরং তাদের সঙ্গে সদাচরণ এবং যথাসম্ভব সমতা ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে। তাদের প্রয়োজন ও চাহিদার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে, তাদের খাবার-দাবার, পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থার দিকেও নজর রাখতে হবে।
যদি তারা কোনও কষ্টসাধ্য কাজে ব্যস্ত থাকে, তবে তাদের সহযোগিতা করা উচিত; তাদের প্রহার করা যাবে না, তাদের সঙ্গে অশালীন বা কটু ভাষায় কথা বলা যাবে না, তাদের অভিশাপ বা লানত করা যাবে না। বরং তাদের উৎসাহ দিতে হবে, তাদের ভুলত্রুটি উপেক্ষা করতে হবে, তাদের জন্য দোয়া করতে হবে, কখনও বদদোয়া করা যাবে না। আর তাদের পারিশ্রমিক ও মজুরি সময়মতো পরিশোধ করতে হবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষক









