পবিত্র কোরআন ও সুন্নতে রাসুল (সা.) এর এর মধ্যে গভীর অনুসন্ধান এবং মানুষের জীবনাচার নিয়ে চিন্তা করলে মানুষ মানবজীবন, পৃথিবী ও আসমানে আল্লাহর চিরাচরিত আচরণ এবং অভ্যাস সম্পর্কে একটি মৌলিক ধারণা অর্জন করতে পারে। মানুষের সঙ্গে আল্লাহ কী আচরণ করবেন কোরআনে সে সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত বিবৃত হয়েছে। একইসঙ্গে তাতে সমাজ, রাষ্ট্র এবং জনগণের জন্য প্রণীত ও প্রচলিত নিয়ম-নীতি, বিধি-বিধানের বিষয়েও নির্দেশনা এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ এই সব বিধান বর্ণনা করে তোমাদের জন্য সৌভাগ্যের পথ স্পষ্ট করতে চান এবং পূর্ববর্তীদের জীবন-চরিত্র তুলে ধরতে চান এবং আল্লাহ তোমাদের গোনাহগুলো ক্ষমা করে পুণরায় তোমাদের অনুগ্রহ করতে চান।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৬)
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কোরআন আমাদের এসব নিয়ম-নীতি অনুসরণের উপদেশ দেয় এবং পূর্ববর্তীদের সঙ্গে আল্লাহর আচরণ কেমন ছিল, তাও দেখতে বলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুসলমানরা, তোমাদের আগেও মানবজাতিকে বহু বিধান দেওয়া হয়েছিল। অতএব, পৃথিবীতে বিচরণ কর, লক্ষ্য কর মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের পরিণাম কী হয়েছে। এটা মানব জাতির জন্য স্পষ্ট ব্যাখ্যা আর কেবল পরহেজগারদের জন্য পথপ্রদর্শক ও উপদেশ।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৭-১৩৮)
সমাজে কোরআনে বর্ণিত এসব বিধি-বিধান বাস্তবায়নকারীদের দুনিয়া ও আখেরাতে পৃথক পৃথক সুফল রয়েছে। বিখ্যাত গবেষক শায়খ আলি মুহাম্মদ আস সাল্লাবি বলেন, আমি উপরোক্ত বিষয় নিয়ে বেশ গবেষণা করেছি এবং ব্যক্তিজীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামি অনুশাসন ও বিধি-বিধান বাস্তবায়ন করে উসমানীয় সুলতানরা পৃথিবীতে বহুবিধ সুফল ভোগ করেছেন। প্রথমত, তারা খেলাফত ও সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেছেন। উসমানীয় সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনকারী উসমান গাজী থেকে শুরু করে বিশেষত সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের জীবনচরিতে দেখেছি যে তারা এবং তাদের পরবর্তী সুলতানরা নিজের জীবন এবং পরিবারে ওপর ইসলামি নিদর্শন ও অনুশাসন প্রতিষ্ঠায় বেশ যত্নশীল ও আগ্রহী ছিলেন। তারা এটি আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে করেছেন, যা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা তাদের ক্ষমতাবান করেছেন এবং তাদের কোমরকে মজবুত করেছেন। সর্বোপরি তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে রাজত্ব দান করেছেন।
যেসব ভূখণ্ডে তাদের রাজত্ব পৌঁছেছে সেখানে তারা ইসলামি অনুশাসন কায়েম করেছেন। তাদের এই সফলতা আল্লাহর চিরাচরিত দান, যারা জমিনে তার হুকুম প্রতিষ্ঠা করে তিনি তাদের এমনই সম্মানিত করেন, যা অপরিবর্তনীয়। পূর্ববর্তী মুমিনদের মতো এ শ্রেণির মুমিনদেরও প্রতিশ্রুতি দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদের এ বলে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদের যমিনের প্রতিনিধিত্ব প্রদান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদের।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৫৫) উসমানীয়রা ঈমান উপলব্ধি করতে পেরেছিল, আল্লাহর আইন অনুসারে প্রচেষ্টা করে তারা তার সুফল পেয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তাদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে তারা স্থিতিশীলতা ও সর্বজনীন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছিল। এশিয়া মাইনর অশান্ত ছিল। এখানের বেশিরভাগ রাষ্ট্রই লেগে ছিল একে অন্যের বিরুদ্ধে। আল্লাহ উসমানীয়দের মাধ্যমে এসব রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তারা উসমানীয়দের নেতৃত্বে আল্লাহর রাস্তায় লড়াইয়েও নামেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বিরাট একটি এলাকায় স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা দান করেন, যেখানে উসমানীয়রা ইসলামি বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আমি দেখেছি, উসমানীয়দের খেলাফত প্রাপ্তির পর আল্লাহ তাদের স্থিরতা ও সুরক্ষা দানের পাশাপাশি সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী এমন সব আসবাব-পত্রেরও মালিক বানিয়েছিলেন, যা দিয়ে তারা তাদের বিজিত ভূখণ্ড শত্রুর রক্তচক্ষু থেকে নিরাপদ রাখতে পারেন। ন্যায়পরায়ন মুমিনকে এ দানও আল্লাহর স্বাভাবিক অভ্যাস। তিনি বলেন, যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে জুলুমের সঙ্গে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা ও তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ৮২)
তৃতীয়ত, ইসলামি অনুশাসন মানলে তিনি বান্দাকে সাহায্য ও বিজয় দান করেন। উসমানীয়রা যে ভূখণ্ডেই পা ফেলেছে সেখানেই আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করেছে। আর আল্লাহর দ্বীনকে যে সাহায্য করে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন এ বিষয়টিও উসমানীয়দের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। কেন না, যে আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করে আল্লাহ শত্রুর বিরুদ্ধে নিজ শক্তি ও কুদরত দ্বারা তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। তারা এমন যাদের আমি যমিনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, জাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৪০-৪১) মানব ইতিহাসে আজ পর্যন্ত এমন ঘটনা ঘটেনি যে, কোনও জাতি আল্লাহর হেদায়াত অনুসরণ করেছে আর আল্লাহ তাদের শক্তি-সামর্থ, রাজত্ব ও নেতৃত্ব দান করেননি।
চতুর্থত, আল্লাহর হুকুম পরিপালনে সীমাহীন মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে। জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য উসমানীয়রা যে সম্মানে ভূষিত হয়েছে তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে ও থাকবে। কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘সমস্ত মান মর্যাদা তো আল্লাহ, তার রাসুল ও মুমিনদেরই; কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।’ (সুরা মুনাফিকুন, আয়াত: ৮)
পঞ্চমত, যে বান্দা তার রবের নির্দেশনা অনুসরণ করে তিনি মানুষের কাছে তাকে মূল্যায়িত করেন। মূল্যায়নের দিক থেকে সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের যুগ ছিল অনন্য। তিনি এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলেছিলেন যাদের মধ্যে উন্নত চরিত্র, সম্ভ্রান্ততা, সাহসিকতা এবং দানশীলতার সবাবেশ ঘটেছিল। তারা আল্লাহর নেয়ামত ও পুরস্কারের আশা করতো এবং তার আজাবকে ভয় করতো। যাদের হাত ধরেই সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহের নেতৃত্বে রাসুল (সা.) এর কনস্টান্টিনোপল সম্পর্কিত সেই ঐতিহাসিক হাদিস বাস্তবায়িত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘নিশ্চিতরূপে তোমরা কুসতুনতিনিয়া (কনস্টান্টিনোপল বা আজকের ইস্তাম্বুল) জয় করবে। সুতরাং তার শাসক কতই না উত্তম হবে এবং তার জয় লাভকারী সৈন্যরাও কতই না উত্তম হবে! (মুসনাদে আহমদ)।
বিখ্যাত গবেষক শায়খ আলি মুহাম্মদ আস সাল্লাবির প্রবন্ধ অবলম্বনে