ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত অপরাধীর বিচার মবের মাধ্যমে করার সুযোগ আছে?

মব জাস্টিস বলা হয় উত্তাল বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে বিচারকে। এটি এমন একটি প্রবণতা, যেখানে জনতা আইন নিজ হাতে তুলে নিয়ে কাউকে শাস্তি দিতে উদ্যোগী হয়। এটি কোনও কোনও সময় পরিকল্পিতভাবে হয়, আবার কখনও ঘটে হঠাৎ ও তাৎক্ষণিক উত্তেজনায়। কখনও কোনও ব্যক্তি প্রকৃত অপরাধী হতে পারেন, তবুও ইসলামের দৃষ্টিতে এভাবে মব গঠন করে বিচার বা শাস্তি দেওয়ার কোনও অনুমতি নেই।

মব জাস্টিস সাধারণত ঘটে যখন কাউকে অপরাধী বলে সন্দেহ করা হয় বা জনতা তাকে অপরাধের সঙ্গে জড়িত মনে করে। প্রথমে দুয়েকজন নিজেদের হাতে বিচার শুরু করে, পরে আশপাশের মানুষ এতে যোগ দিলে এক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনেক সময় ‘নিরীহ’ মানুষেরও মৃত্যুর কারণ হয়। কোনও মানুষ কখনও ভুলক্রমে অপরাধী বিবেচিত হতে পারে। মবের কারণে অপরাধী না হয়েও তার জীবনের বিনাশ ঘটার শঙ্কা থাকে।

ইসলাম স্পষ্টভাবে মব জাস্টিসকে সমর্থন করে না। ইসলামে বিচারব্যবস্থা একটি নির্ধারিত, ন্যায়ভিত্তিক ও সুসংগঠিত পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কোনও ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপরাধী ঘোষণা করা কিংবা নিজ হাতে শাস্তি দেওয়া ইসলামি শরিয়তে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গোনাহ। শাস্তি কার্যকর করার ক্ষমতা কেবল সরকার কিংবা সরকার মনোনীত প্রতিনিধির। এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (আল-মাওসু আতুল ফিকহিয়্যাহ, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২৮০)

ইসলামের দৃষ্টিতে ন্যায়সংগত কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কারও জন্য দণ্ড কার্যকর করার ক্ষমতা নেই। এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন, ইসলামী দণ্ডবিধি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করা হয় যখন করণীয় কাজ ত্যাগ এবং বর্জনীয় কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে শাস্তি দেওয়া হয়। (আল হিসবাহ, পৃষ্ঠা: ৪৫) অতএব, কেউ প্রকৃত অপরাধী হলেও তাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোনও ব্যক্তির নেই। এটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বাধীন বিষয় এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে এই কর্তৃত্ব যাওয়ার অর্থ হলো, অরাজকতা সৃষ্টি হওয়া; যা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে।

বর্তমান যুগের আলেমরাও এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন। ঢাকার ধামরাইয়ে অবস্থিত জিয়াউল উলুম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও গবেষক আলেম মুফতি রেজাউল হক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, মব জাস্টিস, মব ভায়োলেন্স কিংবা মব কালচার– সবকিছুর মূলেই রয়েছে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া; যা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম ও দণ্ডনীয় অপরাধ।

পবিত্র কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, মব জাস্টিসের ফলে প্রাণহানি, সম্পদহানি, সামাজিক অস্থিরতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়। এটি জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। অথচ পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘...যে কেউ কোনও ব্যক্তিকে হত্যা করল– অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা বা জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করার অপরাধ ছাড়া সে যেন সব মানুষকে হত্যা করে ফেললো...।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩২)

মব কালচার যে ভয়াবহ অপরাধ এবং তা কুফরি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে, রাসুল (সা.) এর বিদায় হজের ভাষণের একটি বাণীটিতে চোখ বুলালেই তা দেখতে পাওয়া যায়। যেখানে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য আফসোস অথবা ধ্বংস! তোমরা আমার পরে একে অপরের গর্দানে আঘাত করে কুফরির দিকে ফিরে যেও না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪০৩) এ হাদিসে স্পষ্টভাবে যারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা উপেক্ষা করে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, তাদের এ কাজকে কুফরির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই ভয়াবহ আজাবের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং অশান্তি সৃষ্টির জন্য দেশের মধ্যে দৌড়ঝাঁপ করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি কেবল এই যে তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত পা কেটে ফেলা হবে অথবা দেশ থেকে তাদের নির্বাসিত করা হবে। এটা দুনিয়াতে তাদের লাঞ্ছনা আর আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩৩)

মুফতি রেজাউল হক মুহাম্মদ আবদুল্লাহর মতে, এই আয়াতে উল্লেখিত ‘অশান্তি (সন্ত্রাস) সৃষ্টি করা’র অর্থ ব্যাপক। রাহাজানি, ডাকাতি, অন্যায়ভাবে হত্যা, দূরভিসন্ধি, বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা, ফেতনা সৃষ্টি, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে সন্ত্রাসী হামলা (মব ভায়োলেন্স) ইত্যাদি সবকিছু এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আর এসব অপকর্ম অপরাধের শাস্তিও তাই, যা আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে শুধু প্রাণহানি আর সম্পদহানি ঘটে না; বরং জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রতি বিনষ্ট হয়, জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়।’ এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হত্যা অপেক্ষা জঘন্যতম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯১)

মুফতি রেজাউল হক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, ‘আর এসব কিছুই শরিয়তের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সব স্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ইসলামের মৌলিক চাহিদা। ইসলাম শান্তি-শৃঙ্খলা পরিপন্থি সব কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার নির্দেশ দিয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মব কালচার ব্যর্থ রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট লক্ষণ। তাই কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই অসভ্যতা বন্ধ করা রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য।’

রাজধানীর গুলিস্তান পীর ইয়ামেনী জামে মসজিদের খতিব মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজীও মব বিষয়ে প্রায় অভিন্ন মত ব্যক্ত করলেন। তিনি বলেন, ইসলামে বিচার ব্যবস্থার একটি নির্ধারিত, ন্যায়ভিত্তিক ও সুসংগঠিত পদ্ধতি রয়েছে। কোনও ব্যক্তির অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণ, সাক্ষ্য ও যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার করতে হবে। মব জাস্টিস অর্থাৎ বিচার বহির্ভূত হামলা ও হত্যা ইসলাম কোনও অবস্থাতেই সমর্থন করে না। আইন হাতে তুলে নেওয়া অত্যন্ত গর্হিত, নিন্দিত ও নিষিদ্ধ কাজ। ইসলাম কোনও ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার অনুমতি দেয় না। এটি ফিতনা ও বিশৃঙ্খলার কারণ। প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা জুলুম।’

সারকথা হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত অপরাধীকেও মব গঠনের মাধ্যমে বিচার বা শাস্তি দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই; বরং এটি শরিয়তবিরোধী, হারাম ও সমাজবিধ্বংসী অপরাধ।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও মাদ্রাসা শিক্ষক