হজ পরবর্তী জীবন যেমন হবে

আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরের এই মোবারক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেন– যেন সে জীবনে অন্তত একবার হলেও বায়তুল্লাহ (কাবাঘর) তাওয়াফ এবং রাসুল (সা.) এর রওজা জিয়ারত করতে পারে।

বায়তুল্লাহর এমন এক আকর্ষণ রয়েছে, যা মুসলমানকে বারবার তার দিকে টেনে আনে। এর বরকত ও নূর কেবল ওই ব্যক্তিই প্রকৃতভাবে উপলব্ধি করতে পারে, যিনি সেখানে গিয়ে নিজের অন্তর দিয়ে তা অনুভব করেছে।

বায়তুল্লাহ শরিফের দিকে দৃষ্টি পড়লে অন্তরের যে পরিবর্তন ঘটে, তা অন্যকে বোঝানো আসলে অসম্ভবই বটে। এটি শব্দের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত আত্মিক এক গভীর অনুভূতি। এটি সেখানে গিয়েই কেবল অনুভব করা যায় যে, আমি আগে কোথায় ছিলাম, আর এখন কোথায় আছি?

কতই না সৌভাগ্যের বিষয় যে, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে তাঁর ঘর এবং তাঁর প্রিয় নবী (সা.) এর রওজা জিয়ারতের সুযোগ দিয়েছেন। আর আপনি নিজ চোখে দেখেছেন আপনার মতোই পৃথিবীর নানা প্রান্তের মুসলমানরা বর্ণ, জাতি, গোত্র, ভাষা ও সামাজিক পার্থক্য ভুলে গিয়ে, দুই টুকরো সাদা ইহরামের কাপড়ে নিজেদের গোনাহের বোঝা লুকিয়ে, অশ্রুসজল চোখে ও কাঁপা ঠোঁটে একাগ্রচিত্তে উচ্চারণ করছে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।’

হজ বাহ্যিকভাবে একটি কষ্টসাধ্য ফরজ ইবাদত। এর জন্য যেমন বেশ অর্থ ব্যয় করতে হয়, তেমনই সহ্য করতে হয় শারীরিক কষ্টও। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা প্রবলভাবে জেগে ওঠে এবং সত্যিকারের ‘প্রেম’ জাগ্রত হয়, তখন কষ্টের অনুভূতিই থাকে না, অর্থের চিন্তাও আসে না। তখন শুধু একটিই আকাঙ্ক্ষা থাকে আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর পরিচয় অনুসন্ধান এবং সবশেষ তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন।

হজের উদ্দেশ্য থাকে একটাই, আমাদের এই ইবাদত যেন আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর আনুগত্য করো, তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের আমলসমূহ নষ্ট করো না।’ (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৩৩)।

হজ কবুল হওয়ার সবচেয়ে বড় আলামত হলো, মানুষ গোনাহযুক্ত জীবন ত্যাগ করে সততা ও নেকির জীবন গ্রহণ করবে। বায়তুল্লাহ শরিফ ও রাসূল (সা.) এর রওজা থেকে যে বরকত ও নূর সে হৃদয়ে ধারণ করে ফিরেছে, তা যেন নষ্ট না হয়। নিজের দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আল্লাহর বিধান ও রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ অনুযায়ী গড়ে তোলে এবং হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদ (আল্লাহ ও বান্দার হক) আদায়ে কোনও অবহেলা না করে।

সে যেন সর্বদা নিজের হৃদয়কে ইবাদতে ব্যস্ত রাখে, জিহ্বাকে আল্লাহর জিকিরে সিক্ত রাখে, সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সামনে রাখে এবং জাতীয়, আঞ্চলিক ও পারিবারিক রীতিনীতির ওপর রাসূল (সা.) এর সুন্নাহকে অগ্রাধিকার দেয়। নিজের ব্যক্তিগত ও গোপন জীবনকে গোনাহমুক্ত রাখে; আর যদি কখনও গোনাহ হয়ে যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে।

কল্যাণকামিতার অনুভূতিকে নিজের আবেগের ওপর প্রাধান্য দেয়। গরিব, অসহায়, দরিদ্র, এতিম ও হকদারদের যথাসম্ভব সাহায্য করে এবং মজলুমদের পাশে দাঁড়ায়। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী চলার চেষ্টা করে এবং অপ্রয়োজনীয় ও অনৈসলামিক কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে।

মোটকথা, সে যেন এই আয়াতের বাস্তব রূপ হয়ে ওঠে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না...।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০৮)

জীবনে আবার হজের সৌভাগ্য হবে কিনা তা অনিশ্চিত। তাই এই নিয়ামতের জন্য শোকর আদায় করা উচিত এবং জীবনে এমন পরিবর্তন আনা দরকার, যাতে হজের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়। যেমনই আল্লাহ তায়ালা হজ করার তাওফিক দিয়েছেন, ঠিক তেমনই তা যেন তিনি কবুলও করে নেন। আর সবসময় আমাদের এই দোয়া করা উচিত যে, আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের বারবার এই মহা সৌভাগ্য লাভের তাওফিক দান করেন।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষক