শহীদে কারবালা হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) এর মর্যাদা

জান্নাতে যুবকদের নেতা, রাসুল (সা.) এর দৌহিত্র, হজরত ফাতিমা (রা.) এর নয়নের মণি, সাইয়্যিদিনা হুসাইন ইবনে আলী (রা.) হিজরির পঞ্চম বছরে জন্মগ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে তার মুখে মধু দেন। এরপর তাঁর বরকতময় জিহ্বা দিয়ে তার মুখ স্পর্শ করেন, তার জন্য দোয়া করেন এবং তার নাম রাখেন ‘হুসাইন’। হুসাইন (রা.) এর পবিত্র চেহারা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর উজ্জ্বল চেহারার সঙ্গে এবং তার পবিত্র দেহ রাসুল (সা.) এর পবিত্র দেহের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল।

হজরত হুসাইন (রা.) এর মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হাসান ও হুসাইন জান্নাতের যুবকদের নেতা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৬৮) তিনি আরও ইরশাদ করেন, ‘হাসান ও হুসাইন এই পৃথিবীতে আমার দুটি সুগন্ধময় ফুল।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৭০)

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রাসুল (সা.) তাঁর হুজরা মুবারক (কক্ষ) থেকে এমন অবস্থায় বের হয়ে এলেন যে, তাঁর এক কাঁধে হজরত হাসান (রা.) এবং অন্য কাঁধে হজরত হুসাইন (রা.) ছিলেন। তিনি আমাদের কাছে এসে বললেন, ‘যে এ দুজনকে ভালোবাসে, সে আমাকে ভালোবাসে; আর যে এ দুজনের সঙ্গে শত্রুতা করে, সে আমার সঙ্গেই শত্রুতা করে।’

হজরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, এক রাতে তিনি রাসুল (সা.) এর খেদমতে উপস্থিত হন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বাইরে বেরিয়ে এলেন, তাঁর হাতে কিছু ছিল; কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন না সেটি কী। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কী বহন করছেন?’

তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর চাদর সরিয়ে দিলেন। তিনি দেখলেন, রাসুল (সা.) এর দুই পাশে হজরত হাসান ও হজরত হুসাইন (রা.) রয়েছেন। রাসুল (সা.) বললেন, ‘তারা দুজন আমার সন্তান এবং আমার দৌহিত্র।’

এরপর তিনি দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি এ দুজনকে ভালোবাসি; আপনিও এদের ভালোবাসুন এবং যে তাদের ভালোবাসে, তাকেও ভালোবাসুন।’

হজরত ফাতিমাতুয যাহরা (রা.) বলেন, আমি হাসান ও হুসাইনকে নিয়ে রাসুল (সা.) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! তারা আপনার দুই দৌহিত্র। তাদের কিছু দেন।’ তখন রাসুল (সা.) ইরশাদ করলেন, হাসানের জন্য আমার গাম্ভীর্য ও নেতৃত্ব, আর হুসাইনের জন্য আমার সাহস ও উদারতা।

নবী কারিম (সা.) আরও ইরশাদ করেন, ‘হুসাইন আমার থেকে, আর আমি হুসাইন থেকে। হে আল্লাহ! যে হুসাইনকে ভালোবাসে, আপনিও তাকে ভালোবাসুন।’ তিনি আরও ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি জান্নাতের যুবকদের নেতাকে দেখতে চায়, সে যেন হুসাইন ইবনে আলীকে দেখে।’

কারবালার নাম আজও আমাদের ঠোঁটে উচ্চারিত হলে সাইয়্যিদিনা হজরত ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (রা.) এবং তার পবিত্র আত্মোৎসর্গকারী সঙ্গীদের সাহস, বীরত্ব ও শাহাদাতের স্মৃতি একসঙ্গে ভেসে ওঠে। কারবালার কথা যেখানেই আলোচিত হয়, সেখানে বিশ্বস্ততা, আত্মত্যাগ ও নিবেদনের এক অমর ইতিহাস আপনাআপনিই মন ও মস্তিষ্কে অনুরণিত হতে থাকে। আজও কারবালার বাতাস ও পরিবেশ সেই অমূল্য চেতনার সাক্ষ্য বহন করে, যা সাইয়্যিদিনা হুসাইন ইবনে আলী (রা.) এবং তার আত্মোৎসর্গকারী, বীর ও নির্ভীক সাথীদের অন্তরে উথলে উঠেছিল। যখনই এবং যেখানেই শাহাদাতের ইতিহাস রচিত হবে, কারবালার নাম সেখানে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুল (সা.) এর দৌহিত্র ৭২ জন পবিত্র সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে কারবালায় পৌঁছেছিলেন এবং সেখানে সত্য, ন্যায়, সাহস ও বীরত্বের এক অতুলনীয় ইতিহাস রচনা করেছিলেন। সাইয়্যিদিনা হুসাইন ইবনে আলী (রা.) যখন তার নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীদের নিয়ে কারবালার উদ্দেশে রওনা হন, তখন সব প্রশ্নের উত্তরে তিনি একটি কথাই বলেছিলেন, ‘আমি (আমার নানা) রাসুল (সা.) কে স্বপ্নে দেখেছি। তিনি আমাকে দৃঢ়ভাবে একটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আমি অবশ্যই সেই কাজ সম্পন্ন করবো, তাতে আমার ক্ষতি হোক বা লাভ।’ তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, সেই স্বপ্নটি কী ছিল? তিনি বলেছিলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমি তা কাউকে বলিনি এবং আমার প্রতিপালক মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বলবোও না।’

পৃথিবীর ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠা মানুষের জন্য শিক্ষা ও উপদেশে পরিপূর্ণ। বিশেষ করে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন শিক্ষা ও ফলাফল সামনে আনে, যা অন্য কোনও উপদেশ বা শিক্ষা থেকে অর্জন করা সম্ভব নয়। এ কারণেই পবিত্র কোরআনের একটি বড় অংশ কিসসা (ঘটনাবলি) ও তারিখ (ইতিহাস) নিয়ে গঠিত। কোরআনুল কারিম ঘটনাগুলোর বিভিন্ন অংশ বর্ণনা করে সেগুলোর শিক্ষা ও পরিণতি মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছে।

সাইয়্যিদিনা হজরত হুসাইন ইবনে আলী (রা.) এর শাহাদাত শুধু ইসলামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়; বরং সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসেও এটি এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। এতে একদিকে রয়েছে জালিমদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্মমতার চিত্র; অন্যদিকে রয়েছে আহলে বাইতে রাসুল (সা.) এর এই উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং তার অল্পসংখ্যক সঙ্গীদের বাতিলের মোকাবিলায় যুদ্ধ ও সংগ্রাম, তাতে অবিচল থাকা এবং আত্মত্যাগের এমন বিস্ময়কর ঘটনা, যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এসব ঘটনার মধ্যে আমাদের জন্য হাজারো শিক্ষা ও প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে।