নদী, পানি ও জলকেন্দ্রিক জীবন-সংস্কৃতির গল্পে সাজানো হয়েছে রাজধানীর গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজামণ্ডপ। ‘জলজ’ থিমে তুলে ধরা হয়েছে শুকিয়ে যাওয়া নদ-নদী, জলাধারের সংকট এবং পানিকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনগোষ্ঠীর হারিয়ে যেতে বসা জীবনধারার চিত্র। নান্দনিক সাজসজ্জার পাশাপাশি জলাধার সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরির প্রত্যাশা আয়োজকদের।
২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই পূজামণ্ডপ এবার ১৯তম বছরে পদার্পণ করেছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। উৎসবকে কেন্দ্র করে দুপুরের পর থেকেই গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপে আসতে শুরু করেন বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীরা। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষও আসেন মণ্ডপে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি।
সরেজমিনে দেখা যায়, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে এসেছেন। দর্শনার্থীদের কেউ প্রতিমার সামনে প্রণাম ও প্রার্থনা করছেন, কেউ নান্দনিক সাজসজ্জার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। কেউ আবার দলবদ্ধ হয়ে গল্পে মেতেছেন কিংবা পাশের খাবারের স্টল থেকে বিভিন্ন খাবার কিনে খাচ্ছেন।
‘জলজ’ থিমে জলকেন্দ্রিক জীবন-সংস্কৃতির গল্প
গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় গোপাল রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এবার আমাদের থিম হচ্ছে ‘জলজ’। অর্থাৎ, জলের সঙ্গে সম্পৃক্ত যা কিছু আছে; জলের ভেতরে, জলের ওপরে এবং জলকে ঘিরে যা কিছু, সবই আমাদের থিমের অংশ। এর কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু আমরা দেখছি, ধীরে ধীরে আমাদের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। নদী ও জলের সঙ্গে সম্পৃক্ত যেসব জনগোষ্ঠী রয়েছে, তারাও হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অনেক কৃষ্টি-সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি প্রবেশপথ তৈরি করেছি, যেখান থেকে মনে হবে, একটি জলাধারের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করছেন। ভেতরে ঢুকলে নদী ও জলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন উপকরণ দেখতে পাবেন। মাছ ধরার সরঞ্জাম থেকে শুরু করে শেওলা; এ ধরনের নানা বিষয় সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর আমরা যেখানে প্রতিমা স্থাপন করেছি, তার ঠিক পেছনে শঙ্খ রয়েছে। শঙ্খের সামনে মা বসে আছেন। আমরা যেসব খাবারের পাত্র ব্যবহার করছি, সেগুলোও শতভাগ ডিসপোজেবল।’
পরিবার নিয়ে পূজামণ্ডপে এসেছেন সুদীপ্ত মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘এবারের মণ্ডপ তৈরির পুরোই ডিফারেন্ট। খুব সুন্দর হয়েছে। আর যেটা থিম বলেছে সেটা আসলেই সত্যি। সব নদী তো আমরা নষ্ট করে ফেলছি। এগুলো বাঁচিয়ে রাখা দরকার।’
নিরাপত্তায় সতর্ক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
মণ্ডপের সাজসজ্জার পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রবেশপথে এসআরবি সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। গেটের ভেতরে ছিলেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। মণ্ডপ এলাকায় এসআরবি সদস্যদের টহলও ছিল। পাশের ভবনের ছাদে পুলিশ সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা যায়। মণ্ডপের ভেতরে পুলিশ, এসআরবি ও আনসারের কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসআরবির এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তিনটা টিম এখানে আছি নিরাপত্তার জন্য। যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। যাতে কোনো মব সৃষ্টি না হয়। এই কারণে আমাদের কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।’
পূজামণ্ডপে ঘুরতে আসা সমীরন কুমার বলেন, ‘সারা দিনে তিনটা পূজামণ্ডপে গিয়েছি। সবগুলোর নিরাপত্তাই আমার কাছে ভালো লেগেছে। এখানেও (গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপ) বেশ নিরাপত্তা রয়েছে। পুলিশ-র্যাব (এসআরবি) সদস্যরা ভালোই আছে দেখলাম।’
গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. মামুনুর হক বাপ্পী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নিয়মিত ফোর্স মোতায়েনের পাশাপাশি অতিরিক্ত সদস্যও রাখা হয়েছে। এ ছাড়া একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে যেকোনো ধরনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাড়া দেওয়া হবে। কেউ মোবাইল হারালে বা অন্য কোনো সমস্যায় পড়লে কন্ট্রোল রুম থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মণ্ডপের ফ্লোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পাশের ছাদগুলোতেও সদস্যদের রাখা হয়েছে।
এই নিরাপত্তাব্যবস্থা দশমী পর্যন্ত থাকবে কি না জানতে চাইলে এডিসি বাপ্পী বলেন, “হ্যাঁ, একেবারে দশমী পর্যন্ত থাকবে। ছাদে মোতায়েন করা ফোর্সও থাকবে। তবে আমরা নিয়মিত পরিবর্তন করব। অর্থাৎ, রোটেশনের মাধ্যমে দায়িত্বে থাকা সদস্যদের পরিবর্তন করা হবে।”
নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না বা প্রস্তুতি আরও বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, আলহামদুলিল্লাহ। গুলশান বিভাগের আওতায় বনানী ও গুলশানের যেসব কার্যক্রম রয়েছে, সেগুলোর উপস্থিতি মূল মণ্ডপকেন্দ্রিক। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রাখছি এবং তাদের সঙ্গে মিটিং করছি। মিটিংয়ে তাদের যেসব পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে, সেগুলোর আলোকে আমরা কাজ করছি। এখন পর্যন্ত সবকিছু ভালোভাবেই চলছে।”
যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে বাড়তি ব্যবস্থা
পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও জোর দিয়েছে ডিএমপি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের ট্রাফিকের উপকমিশনার মো. তারেক জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট নরমাল যেরকম থাকে, তার চেয়ে এখানে ফোর্স বাড়ানো হয়েছে। এবং আমাদের এই ট্রাফিকের ক্ষেত্রে আমাদের এই একটা গেট থাকবে, যেই গেটে যারা ভিআইপি বা তারা চলাচল করবে, আর আরেকটি গেট রয়েছে, যে গেট দিয়ে সাধারণ সকলেই চলাচল করতে পারবে। তো সেই জায়গাটা আমরা মেইনটেইন করবো।’
পার্কিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে এখানে যেহেতু পার্কিংয়ের একটা সমস্যা রয়ে গেছে, তো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে, এখানে কোনো গাড়ি এসে পার্ক করে রাখবে না। এসে ড্রপ করে চলে যাবে। এভাবে পার্কিং সমস্যাটা কিছুটা আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি।’
নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্ট আয়োজকরা
গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় গোপাল রায় পূজামণ্ডপের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের তেমন কোনো উদ্বেগ নেই। এখানে পর্যাপ্তসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। পুরো মণ্ডপ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবাতি রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে আরও অনেক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করছি, মা যদি কৃপা করেন, তাহলে কোনো রকম অসুবিধা হবে না। ভক্ত ও সাধারণ দর্শনার্থীদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই। কোনো সতর্কতার প্রয়োজন হলে আমরা আগেই জানিয়ে দেব। আমরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছি এবং সবার সহযোগিতা পাচ্ছি। আপনারা সবাই আসুন এবং পূজা উপভোগ করুন।’