মির্জা ফখরুল বলেন,‘এই রায় সম্পর্কে গতকাল (সোমবার) মন্ত্রিসভায় কয়েকটা কমেন্ট করা হয়েছে, যেটা সত্যিই উদ্বেগজনক। আমাদের সবার আশা-ভরসার শেষস্থল বিচার বিভাগ,আপিল বিভাগ। সেখান থেকে যখন একটা রায় আসে, কিছু অবজারভেশন আসে, তখন সমগ্র জাতি যে শুধু মেনে নেয় তা নয়,তারা সেটাকে মানতে চেষ্টা করে। সেখানে তারা (ক্ষমতাসীনরা) বলছেন যে জনমত তৈরি করবেন। কার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করবেন? এই ১৬ কোটি মানুষের মনের যে চিন্তা-ভাবনা যে রায়ের মধ্য দিয়ে এসেছে, যে অবজারভেশনের মধ্য দিয়ে এসেছে, তার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করবেন?’ সরকারের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘জনগণ আপনাদের সঙ্গে থাকবে না। জনগণ সঙ্গে নেই বলেই আপনারা এই সমস্ত কথা বলছেন।’
সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলেও মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘আমরা বার বার বলেছি, এই সরকারের নৈতিক কোনও অধিকার নেই ক্ষমতায় থাকার। কারণ যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারা সরকার দাবি করেন, সেই নির্বাচন তো হয়নি। ১৫৩টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে কোনও নির্বাচনই হয়নি। এই দেশের মানুষ জানে, সমগ্র বিশ্বের মানুষ জানে- এটা একটা কারচুপি ও ভুল নির্বাচন হয়েছে।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন,‘আমরা তাকে অত্যন্ত সজ্জন মানুষ হিসেবে জানি। ইদানিং খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলছেন। তার কথায় আমরা সবাই বেশ আমোদ পাই। উনি গতকাল বলেছেন বিএনপি নাকি আদালত আর বিদেশিদের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় যেতে চায়। আমি বলতে চাই, কার কথা কে বলে? এই খায়রুল হক (সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক) রায়ের ওপরে আপনারা ক্ষমতায় টিকে আছেন। এদেশের সব মানুষ জানে কোন বিদেশিদের কর্মতৎপরতায় আপনারা ক্ষমতায় টিকে আছেন। সুতরাং বিএনপিকে এ কথা বলবেন না।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে জনগণ। যতবার বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, জনগণের ভোটের মধ্য দিয়ে এসেছে, অন্য কোনও পথে আসেনি। অন্য কারও সঙ্গে আঁতাত করে, অন্য কারও সঙ্গে সমঝোতা করে বা রাতের অন্ধকারে বিএনপি ক্ষমতায় আসেনি।’
বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন,‘খুব দুঃসময় আমাদের জন্য। যখন গণতন্ত্রের মূল্যবোধগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, যখন সরকার সচেতনভাবে সেগুলো ধ্বংস করে দেয়, মানুষের অধিকার লুণ্ঠন করে নেয়। সরকার তার অতীত যে আকাঙ্ক্ষা একদলীয় ব্যবস্থা কায়েম করবে, সেই লক্ষ্যে তারা সব ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের কাজে এগিয়ে চলেছে। আজকে কথা নেই বার্তা নেই মানুষকে তুলে নিয়ে যায়, গুম করে দেয়। হাজার হাজার তরুণকে তারা হত্যা করেছে, শতাধিক মানুষকে তারা গুম করেছে, জোর করে তুলে নিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত সারাদেশে আমাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৭৪ হাজার। ১০ লাখের বেশি নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। আমরা জরিপ করাচ্ছি। আমাদের লোকজন বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় গিয়ে সেসব তথ্য তুলে নিয়ে আসছেন। প্রতিদিন নতুন নতুন করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এটার উদ্দেশ্য একটাই, আমাদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা, আমাদের দেশের জনগণের কল্যাণে জন্য কাজ করতে না দেওয়া।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি কথা আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে-এই সরকার এমনি এমনি ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না। এই সরকারকে বাধ্য করতে হবে জনগণের যে দাবি সেই দাবি মেনে নেওয়ার জন্য। সেই দাবি কি? এখন জনগণ চায় একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন। যে নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সেই নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচনে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হবে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার হতে হবে। অন্যথায় নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না। লড়াই করে আমাদের অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে।’
সহায়ক সরকার সংবিধানে নেই– ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের এরকম বক্তব্যের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন,‘আপনারা যখন কেয়ারটেকারের দাবি তুলেছিলেন তখন কি তা সংবিধানে ছিল। মূল বিষয়টা কি? জনগণ যা চায়, যা প্রয়োজন, সেই প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে সবাই একমত হয়ে সেই পরিবর্তনগুলো আনতে হবে। সংবিধান কোনও বাইবেল নয় যে এটা পরিবর্তন করা যাবে না।’
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমি মর্মাহত হয়েছি, আজকে সব কাগজে দেখলাম যে, আমাদের ষোড়শ সংশোধনীর উপরে সুপ্রিম কোর্টের যে ঐতিহাসিক যুগান্তকারী একটি রায় দিয়েছেন, এই রায়ের ওপরে মন্ত্রিসভা আলোচনা করেছেন, সেখানে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আমি আতঙ্কিত বোধ করছি কারণ, তারা বলেছেন যে তারা জনমত সৃষ্টি করবেন। বাংলাদেশে তারা (ক্ষমতাসীনরা) জনমত সৃষ্টি করবেন এই রায়ের বিরুদ্ধে। মানেটা কি? এর মানেটা হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তারা জনমত সৃষ্টি করতে চান। তারা তো তাহলে নিজেরাই প্রমাণ করে দিচ্ছেন তারা স্বাধীন বিচার বিভাগে বিশ্বাস করে না। আমি বলতে চাই, যারা এই যুগান্তকারী রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তারা বাংলাদেশকে ভালোবাসেন না, দেশে স্বাধীন বিচার বিভাগ চান না।’
আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবের চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো প্রসঙ্গে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দুই বছর সরকার এক্সটেশন দিয়েছে উইদাউট কনসালটেশন অব চিফ জাস্টিস। আজকে এজে মোহাম্মদ আলী সাহেব রিট ফাইল করে এসেছেন। তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আর থাকলো কোথায়? তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না।’
আলোচনা সভায় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে বক্তব্যে রেখে অর্থমন্ত্রী আদালত অবমাননা করেছেন। আমরা বলতে চাই, তিনদিনের মধ্যে অর্থমন্ত্রীকে মাফ চাইতে হবে। নইলে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হযেছে।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সুপ্রিম কোর্ট শাখার সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদলের পরিচালনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন,জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া,ব্যারিস্টার আমীনুল হক, আহমেদ আজম খান, নিতাই রায় চৌধুরী বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মীর নাসির, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এ জে মোহাম্মদ আলী প্রমুখ।
/সিএ/এএম