সারা দেশের অন্তত ৪৪ জেলা ও মহানগরে বিএনপির গণমিছিল কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, গণমিছিল করতে গিয়ে প্রায় সব এলাকায় পুলিশের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে নেতাকর্মীদের।
শনিবার (২৪ ডিসেম্বর) কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পঞ্চগড়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এক বিএনপি নেতা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত শতাধিক নেতাকর্মী। পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন আরও শতাধিক। সবমিলিয়ে আহত ও আটক হয়েছেন অন্তত দুই শতাধিক।
বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, পঞ্চগড়, নীলফামারী, ফরিদপুর, গাজীপুর, রাজশাহী, মাগুরা, নোয়াখালী, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির গণমিছিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাধা দিয়েছে। বাধার পরও গণমিছিল হয়েছে এসব জেলা ও মহানগরে। এসব কর্মসূচিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন।
গণমিছিল পূর্ব বক্তব্যে বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলেন, দেশ সঠিকভাবে পরিচালনা না করায় আওয়ামী লীগের কপালে দুঃখ আছে। দেশের মানুষ রাজপথে এই সরকারের ফায়সালা করবে। অবিলম্বে সরকারকে পদত্যাগ করে বিএনপির ১০ দফা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান নেতারা।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সারা দেশে দলীয়ভাবে তথ্য পেয়েছি যুগপৎ গণমিছিল থেকে আটক হয়েছেন শতাধিক নেতাকর্মী। শুধু পঞ্চগড় জেলায় আহত হয়েছেন ৫০ জনের মতো। এছাড়া আরও কয়েকটি জেলায় ২০-২৫ জন আহত হয়েছেন। প্রায় সব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বাধা দিয়েছেন। বোদা উপজেলার ময়দানদিঘি ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ আরেফিন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন।
দলীয়ভাবে দাবি করা হয়েছে, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা, মেহেরপুর, পিরোজপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জামালপুর, লালমনিরহাট, বরিশাল, সুনামগঞ্জ, বান্দরবান, নওগাঁ, নাটোর, ভোলা, কুড়িগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, বগুড়া, হবিগঞ্জ, খুলনা, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, ময়মনসিংহ, যশোর, রাঙামাটি, চাপাইনবাবগঞ্জ , মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, জয়পুরহাট, পাবনা, মাগুরা, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, সিলেট, চুয়াডাঙ্গা, হবিগঞ্জ, রাজশাহী ও গাজীপুরে গণমিছিল হয়েছে।
বাংলা ট্রিবিউনের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শনিবার নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ সংলগ্ন ওয়াসা মোড়ে মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির গণমিছিল শুরু হয়। মিছিলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ চট্টগ্রামের স্থানীয় নেতারা অংশগ্রহণ করেন। মিছিলের আগে বক্তব্যে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে আমরা ১০ দফা দিয়েছি। এই দাবি উত্থাপনের পর যারা সরকারকে পছন্দ করে না, যারা গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক, সব দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি ১০ দফাকে সমর্থন করেছেন। আজ যুগপৎ আন্দোলনের জন্য তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। আমরা এই যুগপৎ আন্দোলনের ১০ দফা দাবি আদায়ের জন্য প্রথম কর্মসূচি হিসেবে গণমিছিল করেছি।’
কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আগামী ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে। ১০ দফার ভিত্তিতে বাংলাদেশে যে অবৈধ কর্তৃত্ববাদী সরকার, তার পতন ঘটাতে হবে।’
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, গণমিছিল শুরুর আগে বক্তব্য দেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি সেখানে উল্লেখ করেন, ‘আওয়ামী লীগের কপালে দুঃখ আছে।’
খুলনা প্রতিনিধি জানান, খুলনায় অনুষ্ঠিত গণমিছিলে কেন্দ্রীয় নেতারা অংশগ্রহণ করেন। গণমিছিল পূর্ব সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। ফলে এ সরকারকেও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করতে হবে।’
বরিশাল প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বরিশালে বিএনপির গণমিছিল হয়েছে। এর আগে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘তারা ভয়ভীতি সৃষ্টি করে দখল চালিয়ে যাবে। দেশের মানুষ ভয়কে জয় করে ফেলেছে। এই সরকারের পতনের জন্য এখন তারা রাস্তায় নেমেছে। আমাদের জয় সুনিশ্চিত। কোনও শক্তি, কোনও গুম-খুন ও নির্বিচারে হত্যা এই জনগণকে থামাতে পারবে না।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘যে জন্য দেশ স্বাধীন করেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। সেটার কিছুই আজ নেই। পাকিস্তানি শাসকরা যা করেছে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার তার চেয়েও বেশি করছে। তবে জনগণের আন্দোলন কেউ ঠেকাতে পারেনি। আইয়ুব খান-ইয়াহিয়া খান পারে নাই, এরশাদও পারে নাই। দেশের মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। সেজন্য জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে, জীবনও দিয়েছে। কাজেই জয়লাভ না করা পর্যন্ত সরকার পতনের এই আন্দোলন চালিয়ে যাবো।’ শনিবার বিকালে ময়মনসিংহ নগরীর টাউনহল মোড়ে বিএনপির গ্রেফতারকৃত নেতাদের মুক্তিসহ ১০ দফা দাবিতে গণমিছিলের আগে এসব কথা বলেন টুকু।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, জেলা বিএনপির গণমিছিলে বাধা দিয়েছে পুলিশ। আটক হয়েছেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব শরিফউজ্জামান শরিফসহ আট নেতাকর্মী।
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে থেকে গণমিছিল শুরু করেন নেতাকর্মীরা। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে নেতৃত্ব দেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু।
রাঙামাটি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শনিবার বিকালে পৌরসভা প্রাঙ্গণে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে গণমিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বনরুপা মোড়ে শেষে হয়। সেখানে সমাবেশে বিএনপির কেন্দ্রীয় উপ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক দীপেন দেওয়ান বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ গ্রেফতারকৃত দলের সব নেতাকর্মীকে মুক্তি দিতে হবে।’
সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বাতিল ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে গণমিছিল করেছে নীলফামারী জেলা বিএনপি। শনিবার সকালে পুলিশের বাধায় বিএনপির দলীয় কার্যালয় থেকে গণমিছিল বের করতে চেয়ে ব্যর্থ হন নেতাকর্মীরা। পরে শহরের ডালপট্টি এলাকার মুন্সীপাড়া থেকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল আলমের নেতৃত্বে গণমিছিল বের করা হয়। শহরের বড় বাজার পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়।
বগুড়া জেলা প্রতিনিধি জানান, শহরে সমাবেশ শেষে শনিবার দুপুর ১টার দিকে আমান উল্লাহ আমানের নেতৃত্বে খেলার মাঠ থেকে আদালতপাড়া হয়ে নবাববাড়ি সড়কে দলীয় কার্যালয় পর্যন্ত গণমিছিল করা হয়। তবে মিছিলটি শহরের সাতমাথার দিকে যেতে চাইলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়।
শনিবার বিকালে নারায়ণগঞ্জের মিশনপাড়ায় হোশিয়ারি সমিতি মিলনায়তনের সামনের সড়কে জেলা ও মহানগর বিএনপির গণমিছিলের আগে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, জানান বাংলা ট্রিবিউনের স্থানীয় প্রতিনিধি।
মিছিলপূর্ব সমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ইঙ্গিত করে জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘একজন ব্যক্তি রাজনীতি বিবর্জিত বক্তব্য রাখেন, তিনি মাঝেমধ্যে বলেন, “খেলা হবে”। আমি সেই নেতার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, ১০টি খেলায় বিএনপি জিতেছে। আগামী ৩০ তারিখ ঢাকায় যেই খেলা হবে, সেই খেলায় বিএনপি জিতবে ইনশাআল্লাহ।’
এদিকে, গণমিছিলের পর শনিবার রাজধানীর ঢাকায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির দফতরের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বশীল সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে জনগণ অনুমান করেছিল আজ বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সশস্ত্র হামলা করা হবে। জনগণের অনুমানই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। পঞ্চগড়সহ অন্যান্য স্থানে হামলা, হত্যা এবং নির্যাতন পূর্বপরিকল্পিত। দেশকে বিরোধীদল শূন্য করতে সরকারের নীলনকশার অংশ হিসেবে পঞ্চগড়ে আব্দুর রশিদ আরেফিনকে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যার দায় সম্পূর্ণ সরকারের।’
প্রিন্স অভিযোগ করেন, গাজীপুর জেলা ও মহানগর বিএনপির শান্তিপূর্ণ গণমিছিল কর্মসূচিতে পুলিশ হামলা করেছে। এ সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের বেধড়ক লাঠিচার্জ করে, টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে ও সাউন্ড গ্রেনেড হামলা চালায়। আটক করে নিয়ে যায় ২৫-৩০ নেতাকর্মীকে। এছাড়া, নীলফামারী জেলা বিএনপির গণমিছিলে পুলিশের হামলায় ১০ জন নেতাকর্মী আহত হন। গতরাত থেকে মাগুরা জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আহসান হাবীব কিশোরের বাসভবন পুলিশ ঘেরাও করে রাখে। সেখান থেকে দুজন বিএনপির কর্মীকে আটক করে নিয়ে যায়। ফরিদপুরে গতরাতে ১২ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আজ পূর্বনির্ধারিত গণমিছিলে পুলিশ ন্যক্কারজনকভাবে বাধা দেয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে নোয়াখালীতে গণমিছিলের প্রস্তুতি সভায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৭ জনকে আটক করে নিয়ে যায়।
প্রতিবেদন তৈরিতে বাংলা ট্রিবিউনের চট্টগ্রাম, বরিশাল, নীলফামারি, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, রাঙামাটি, দিনাজপুর, ফরিদপুর, বগুড়া, কুমিল্লা প্রতিনিধিদের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।