রাজনৈতিক দলে নারী নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি আছে, বাস্তবায়ন নেই

দলীয় পতাকা

রাজনৈতিক দলের সর্বস্তরে নেতৃত্বে নারীদের অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়ন নেই। আগামী চার বছরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটি স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি নেই। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ কোনও দলেই নারী নেতৃত্ব ১২ শতাংশ অতিক্রম করেনি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ জারির পর গত ৮ বছরে দলগুলোর নারী নেতৃত্ব বৃদ্ধির হার মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।

২০০৮ সালে দেশের সব রাজনৈতিক দলের মত নিয়ে সংগঠনের প্রতিটি স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন বিগত নির্বাচন কমিশন। এরপর ওই অনুযায়ী গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ২০০৮ জারি হয়। এতে বলা হয়, ২০২০ সালের মধ্যে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের সর্বস্তরের কমিটিতে ৩৩ ভাগ নারীকে রাখা হবে। ওই প্রতিশ্রুতি পূরণের নিশ্চয়তা দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কমিশনে নিবন্ধন করে। প্রতিশ্রুতির পর প্রত্যেক দল সম্মেলনের মাধ্যমে গঠনতন্ত্রেও সেই অনুযায়ী ধারা যু্ক্ত করে। কিন্তু এরপর ৮ বছর চলে গেলেও দলগুলোর প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

গত ২০০৮ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দুটি সম্মেলনের মাধ্যমে দুই দফায় নতুন নেতৃত্ব নিয়ে এলেও এতে নারীর অন্তর্ভুক্তি আগের ধারাবাহিকতাই রয়ে গেছে। কমিশনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির আগে ২০০২ সালে এ দলটির যে কমিটি হয়েছিল, সেখানে কেন্দ্রীয় কমিটিতে সভাপতিসহ ৮ জন নারী সদস্য স্থান পেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এরপর ২০০৯ সালের সম্মেলনে এই সংখ্যা একজন বেড়ে দাঁড়ায় ৯-এ।

সর্বশেষ ২০১২ সালের গঠিত কমিটিতে ৭৩ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সভাপতিসহ ১১ জন নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে, তাদের মধ্যে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জোহরা তাজ উদ্দিন মারা যাওয়ায় ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শিরীন শারমিন চৌধুরী স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর এই সংখ্যা কমে আগের মতো ৯-এ এসে দাঁড়িয়েছে। শতাংশের হারে এটা মাত্র  ১২ দশমিক ৩৩। অন্য প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির অবস্থানও এর চেয়ে খব এটা ভালো নয়। বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির ৩৮০ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে নারী রয়েছেন ৪৬ জন। যা মোট সংখ্যার ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সংসদের বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিতে নারী নেতৃত্ব রয়েছে ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এছাড়া নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত অন্য ৩৭টি রাজনৈতিক দলের অবস্থান মোটেও সন্তোষজনক নয়।

এদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটির চিত্রের তুলনায় তৃনমুলের চিত্র আরও খারাপ। সংগঠনগুলোর জেলা, উপজেলা বা নিম্নস্তরের কমিটিতে কেবল মহিলাবিষয়ক সম্পাদকীয় পদে নারী নেতৃত্বের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলগমীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই অনুযায়ী আমাদের গঠনতন্ত্রও সংশোধন করা হয়েছে। সর্বশেষ সম্মেলনের দিনে আমাদের নেত্রী তার বক্তৃতায় নারী নেতৃত্ব বাড়ানোর বিষয়ে কথা বলেছেন। নতুন কমিটিতে আমরা অন্তত ২০ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করব। আশা করছি ২০২০ সালের মধ্যেই আমরা এটা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে পারব।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময় ‍নারী নেতৃত্বকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। গত কয়েকটি কমিটিতে তাদের নারী নেতৃত্ব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আসন্ন সম্মেলনের মাধ্যমে তারা আরও বেশি নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা বিষয়টি কারও ওপর চাপিয়ে দেইনি। রাজনৈতিক দলগুলোর মত নিয়েই এটা করেছিলাম। পরে সেটা আইনও করা হয়। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৮ বছরে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তবে দলগুলো কেন এটা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। বাস্তবায়নের পথে কী বাধা রয়েছে, এটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই সিইসি বলেন, আট বছরের যে অগ্রগতি তাতে বাকি চার বছরে প্রতিশ্রুতি পূরণটাকে দূরূহ মনে হচ্ছে। কমিশন থেকে তদারকি বাড়ানো হলে এবং দলগুলো আরও আন্তরিক হলে হয়তো সম্ভবপর হতে পারে।

নির্বাচন কমিশন সচিব সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সম্প্রতি একটি কর্মশালার সুপারিশের আলোকে আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীদের নেতৃত্বের বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছি। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাদের তাগাদা দিয়েছি। তবে বাস্তবতা হলো, এই বিষয়ে কমিশনের করণীয় খুবই সামান্য। কারণ পুরোটাই দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের এবং এটা তাদেরই বাস্তবায়ন করতে হবে।

/এমএনএইচ/