সরকারের ১৮০ দিনকে যেভাবে মূল্যায়ন করছে বিরোধীদল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের ১৮০ দিন পার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়ে সরকার গঠন করে দলটি। ছয় মাস পূর্তিতে এখন আলোচনায় এসেছে নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারের কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে এবং সরকার দেশ পরিচালনায় কতটা সফল হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে ছয় মাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির দাবি করা হলেও বিরোধীদলীয় নেতাদের মূল্যায়নে চিত্রটি ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, সরকার মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণেই ব্যর্থ হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, জ্বালানি সংকট, গ্যাস ও বিদ্যুতের দুরবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়াকে সরকারের ব্যর্থতার বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন তারা। কেউ কেউ বলছেন, প্রথম ছয় মাসেই সরকার হযবরল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

বিরোধীদলীয় নেতারা মনে করেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দলীয়করণ থেকে বেরিয়ে এসে যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য জায়গায় দায়িত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থে বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দল ও পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সরকারের ছয় মাসে সফলতা খুঁজে পাচ্ছে না জামায়াত

সরকারের ছয় মাসেও কোনো সফলতা খুঁজে পাওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, সব জায়গায় সিন্ডিকেট, দলীয়করণ ও দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। ঘুষ-দুর্নীতির সার্টিফিকেট বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল নিজেই দিয়েছেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে বিরোধী দল আছে বলে সরকার মনে করে না। বিভিন্ন কার্ড, ঠিকাদারি ও নিয়োগ সবই দলীয় লোকদের মধ্যে রাখা হয়েছে। মন্ত্রিসভাও দক্ষতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট এবং নিত্যপণ্যের মূল্যে চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে।

তার দাবি, রাজস্ব বোর্ড তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে না। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে কোনো রকমে অর্থনীতি টিকে আছে। রপ্তানি ও বিনিয়োগ নেই, সর্বত্র অচলাবস্থা।

সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে জামায়াতের এই নেতা বলেন, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা। তার ভাষায়, এর মাধ্যমে সরাসরি জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিতে বলেছেন, অথচ এখন নিজের সেই অবস্থানই ভঙ্গ করেছেন।

‘বিএনপি সরকারের ছয় মাসেই হযবরল অবস্থা’, বলছে এনসিপি

বিএনপি সরকারের ছয় মাসেই দেশে হযবরল অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, এই সরকার সব জায়গাতেই ব্যর্থ। মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সমাধানেও ব্যর্থ হয়েছে। কোনো সমস্যারই সমাধান করতে পারছে না, বরং দলীয়করণে ব্যস্ত রয়েছে।

তবে পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, সরকারকে জাতীয় স্বার্থে কাজ করতে হবে এবং সবাইকে নিয়ে এগোতে হবে। যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য জায়গায় বসাতে হবে। বিরোধী দলসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার প্রবণতা সরকারের মধ্যে থাকতে হবে।

আতিক মুজাহিদ বলেন, আগের মতো রাজনীতি এখন নেই। জাতীয় পর্যায়ে সবাইকে যুক্ত করেই রাজনীতি করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে সবার অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সরকারের ভাষ্যে বহুমাত্রিক অগ্রগতি

তবে সরকারের পক্ষ থেকে ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন বিরোধীদের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত ১৮ জুলাই সরকারের পাঁচ মাস পূর্তি উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছিলেন, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১৫০ দিনে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা, কূটনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

অর্থনীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে বলেছেন, বর্তমান সরকার রিজার্ভ পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ ফেরাতে কাজ করছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো ছয় মাসের মধ্যে চালুর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। মাহদী আমিন জানিয়েছেন, সরকারের ১৮০ দিনের মধ্যে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা হবে।

সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসেই নারীকেন্দ্রিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। বড় আকারে কৃষক কার্ড চালুর পাশাপাশি প্রবাসী কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড, ই-হেলথ কার্ড, ফুয়েল পাস, এলপিজি কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড নিয়েও উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।

নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী রেলপথ মন্ত্রণালয় ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছরের পৃথক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। অচল ডেমু ট্রেন সচল, নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু এবং বুলেট ট্রেন সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান সাফল্য হিসেবে ইউএনজিএ প্রেসিডেন্সি অর্জনের কথা বলা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং প্রকাশিত ই-বুক অনুযায়ী, প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে প্রায় ২০০টি উদ্যোগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। সরকারের দাবি, এর ফলে জনজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।