সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় কলেবর বাড়িয়ে মন্ত্রিসভায় রদবদল করেছে বিএনপি। নতুন করে পাঁচজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হয়েছেন, একই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি পেয়ে মন্ত্রী হয়েছেন একজন। শুক্রবার (২১ আগস্ট) তারা শপথ নেওয়ার পর দিবাগত মধ্যরাতে নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করা হয়।
মন্ত্রিসভার নতুন চার মন্ত্রী হলেন, ড. আবদুল মঈন খান, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সাচিং প্রু জেরী ও ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। নতুন দুই প্রতিমন্ত্রী হলেন হুমায়ুন কবির (টেকনোক্র্যাট) ও মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। তাদের মধ্যে পাঁচজন বিএনপির এবং একজন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান।
ছয় মাসের মাথায় এই রদবদলের কারণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। এছাড়াও একই মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ, একজন পূর্ণমন্ত্রীকে সরিয়ে একই পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা এবং শরিক দলের একজন নেতাকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে।
কেউ কেউ এটিকে সরকারের ‘স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ হিসেবেই দেখছেন। কারও কারও মতে, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ সরকারের ভেতরের ‘অস্থিরতার’ ইঙ্গিতও দেখছেন। সামনে আরও রদবদল হতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
কে কোন দায়িত্বে?
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হওয়ায় তার ছেড়ে দেওয়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন নতুন মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা রশিদুজ্জামান মিল্লাত একই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হয়েছেন। এই মন্ত্রণালয়ের আগের মন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা) এখন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী।
বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ে আগে থেকেই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। নতুন মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ পেয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা জহির উদ্দিন স্বপনকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে।
নতুন প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ)। টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হওয়া হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও দায়িত্বে বহাল থাকছেন। ফলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন দুজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করবেন। মন্ত্রণালয়টির মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে আছেন ড. খলিলুর রহমান।
দুই প্রতিমন্ত্রী নিয়েই চলবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়?
মন্ত্রিসভার রদবদলের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে মন্ত্রণালয়টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। সভাপতি প্রার্থী হিসেবে জাতিসংঘে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, তিনি মন্ত্রিত্ব ছাড়বেন না, তবে ছুটি নিতে পারেন। এরপর থেকেই তিনি এক বছরের জন্য ছুটিতে যাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
এ ক্ষেত্রে দুই প্রতিমন্ত্রীর একজনকে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে। তবে দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
শরিকদের আরও সুখবর আসছে?
নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। তবে সরকারের শুরুতে মাত্র তিনটি দলের প্রধানকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়। সংসদীয় আসন অনুপাতে বিএনপির ৩৬টি আসনের মধ্যে একটিও শরিকদের ছাড় দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে কয়েকজন শীর্ষ নেতা পরোক্ষভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
এমন পরিস্থিতিতে গত ২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনায় শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে নৈশভোজ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে কয়েকজন শরিক নেতা নিজেদের প্রত্যাশা পূরণ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। শরিকদের মধ্যে সরকার মাত্র তিনটি দলের প্রধানকে মূল্যায়ন করেছে এবং সবাইকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে—এ নিয়ে আলোচনা হয়।
এরপর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে পূর্ণমন্ত্রী করায় সরকার ভিন্ন বার্তা দিতে চায় বলে মনে করেন জোটের এক শীর্ষ নেতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নেতা জানান, সামনের রাজনৈতিক কঠিন পরিস্থিতি বিবেচনায় হয়তো ঐক্যকে সুসংহত করতে চায় বিএনপি। এ কারণে সামনে মাহমুদুর রহমান মান্না, সাইফুল হক বা উবায়দুল্লাহ ফারুককেও মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। যদিও বিষয়টিকে এভাবে দেখতে চান না কেউ কেউ। তাদের মতে, শরিকদের যেভাবে মূল্যায়ন করার কথা, সেভাবে করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মন্ত্রিসভার রদবদল সরকার তার প্রয়োজন অনুযায়ী করতেই পারে। সেটি নিয়ে কিছু বলার নেই।’
পার্থকে মন্ত্রী করায় সামনে শরিকদের আরও মূল্যায়নের ইঙ্গিত আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমনটি মনে হচ্ছে না। সরকার হয়তো শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে নৈশভোজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।’
অস্থিরতা নাকি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া
ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভা রদবদলকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে দুই ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, সরকার মুখে না বললেও ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। আবার ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এটিকে কাজের গতি বাড়াতে সরকারের স্বাভাবিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেকোনও সরকারই প্রশাসনের গতি বাড়াতে এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবে বলা যায়, মির্জা ফখরুল যেহেতু রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, সেখানে একজনকে দিতেই হবে। আর অন্যরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেননি, এ কারণেও সরকারপ্রধানকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের সদরে-অন্দরে কোনও অস্থিরতা যে চলছে না, সেটিও বলা যাচ্ছে না। কারণ জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে সরকার এক ধরনের বেকায়দায় আছে। এর প্রভাব হয়তো এসব মন্ত্রণালয়ের ওপরও পড়েছে। সে কারণে সরকারের নীতি নির্ধারকদের এই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।’
তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক এবং দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ছয় মাসে সরকারের মন্ত্রীদের ভালো পারফরম্যান্স নেই। এ সময়ে নিজেদের প্রয়োজনেই মন্ত্রিসভায় রদবদল আনা হয়েছে। তবে তাদের ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী।’
যদিও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, সব সরকারই কাজের গতি আনতে প্রয়োজন অনুযায়ী মন্ত্রিসভায় রদবদল করে। এটি ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই।
নতুন যুক্ত হওয়া দুই প্রতিমন্ত্রীর একজন হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুক্ত করা হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ে আগে থেকেই প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামা ওবায়েদ ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন। এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী এক বছর তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত থাকবেন। ফলে কাজের সুবিধার জন্য এবং গতি বাড়াতে সরকার যে সিদ্ধান্তই নেবে, সে অনুযায়ী টিমওয়ার্ক হিসেবে আমরা কাজ করবো।’
শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানোর পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নবনিযুক্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেন, মন্ত্রিসভার রদবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। দেশের সমস্যাগুলো সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণভাবে অবগত। দেশকে একটি গতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং বিশ্বের বুকে দেশের সুনাম পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তিনি কাজ করছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের কিছু মন্ত্রণালয় শূন্য হয়েছে। সেখানে নতুন মন্ত্রী যুক্ত হবেন। আর কাজে গতিশীলতা আনতে রদবদল আনা হবে। এটিই সাধারণ বিষয়, এ নিয়ে ভিন্ন কারণ খোঁজা অবান্তর।’