ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই মন্ত্রিসভার আকার আরও বড় করেছে বিএনপি। শুক্রবার (২১ আগস্ট) মন্ত্রিসভায় নতুন করে পাঁচজন সদস্য যুক্ত এবং একজনকে প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি দিয়ে পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে। ফলে মন্ত্রিসভার আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। এদিকে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের দফতর পরিবর্তন করে তাকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। এরফলে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩-তে।
ছয় মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভার আকার ও উপদেষ্টার সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ একে দলীয় লোকদের পুনর্বাসন এবং তোষামোদির পুরস্কার হিসেবে দেখছেন। তবে সরকার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাজের গতি আনার জন্যই মন্ত্রিসভার কলেবর বাড়ানো হয়েছে।
‘দলীয় লোকদের পুনর্বাসনে রাষ্ট্রকাঠামোকে ব্যবহার করছে বিএনপি’
বিএনপি দলীয় লোকদের পুনর্বাসনে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকাঠামোকে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছেন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার এ পর্যন্ত যত নিয়োগ দিয়েছে—মন্ত্রী, তারপরে সরকারি বিভিন্ন পদে জেলা পরিষদ, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান; সবগুলো হলো দলীয় লোকদের পুনর্বাসন পলিসি। দলীয় লোকদের পুনর্বাসন করার জন্য বিএনপি রাষ্ট্রকাঠামোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।’
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘যারা অযোগ্য-অপদার্থ, যারা নির্বাচনে পরাজিত হইছে, তাদের পুনর্বাসন করতেছে। আবার যারা জিতে আসছে, সেখানেও বিভিন্ন লোক, বিভিন্ন জনকে পুনর্বাসন করতেছে। এটা রাষ্ট্রের ওপর একটা বড় বোঝা। যদি এমন হতো যে দেশের স্বার্থে, রাষ্ট্রের স্বার্থে এটা প্রয়োজন, তাহলে একটা কথা ছিল।’
তিনি বলেন, ‘সরকার পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনার যে অপরিকল্পিত চিন্তা, তার রিফ্লেকশন হলো এটা। আমার যদি রিভিউ হয় যে না, আমার ছয় মাসের কার্য পরিচালনার জন্য মন্ত্রিসভা বড় করতে হবে কাজের পরিধি এবং প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতে, তা তো না। একজনের কাছে তিন মন্ত্রণালয় রেখে দিছে, আবার আরেকজনকে মন্ত্রণালয় থেকে সরাইয়া উপদেষ্টা করে দিছে—এটা কেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার অবশ্যই রদবদল করবে তার রিভিউতে যদি আসে যে না, এটা বেটার। এই রদবদলে তো সেটার রিফ্লেকশন নাই। নিশ্চয়ই দলীয় ইন্টারেস্টকে সামনে রেখে এটা করা। দেশ এবং দেশের মানুষের ইন্টারেস্টে নয়। আর এটা সরকার পরিচালনার একটা বড় ধরনের ব্যর্থতার খতিয়ান বা রেকর্ড হলো। ব্যর্থতার তালিকায় আরেকটা ব্যর্থতা যোগ হলো।’
‘বিরোধীদলকে ঘায়েল করার পুরস্কার দিচ্ছে সরকার’
সরকার বিরোধীদলকে ঘায়েল করার পুরস্কার দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিরোধীদলকে ছোট করা বা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ যারা করে তাদের সরকার পুরস্কৃত করছে। বিরোধী দলকে কামড়ানো বা মিথ্যা অপপ্রচারের জন্য যদি মন্ত্রিপরিষদ আর উপদেষ্টা, সহকারী—তোষামোদির নানা পথ ক্রিয়েট করে এগুলো করা হয়, তাহলে আল্টিমেটলি রাষ্ট্রকে আর্থিকভাবে তো দেউলিয়ার দিকে নিয়ে যাবে, অন্যদিকে একটা ইন্টারনাল বিশৃঙ্খলা তৈরির দিকেও নিয়ে যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এই জিনিসগুলো থেকে আসলে সরকারের বিরত থাকা উচিত। “রাইট ম্যান ইন রাইট প্লেস”—যদি হয় তাহলে এতে দেশ উপকৃত হবে। এটা দলীয় সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এগুলো করার কারণে দলীয় ইন্টারনাল গ্রুপিং, দ্বন্দ্ব দমন করার জন্য রাষ্ট্রকে ব্যবহার করা, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা, রাষ্ট্রের সম্পদকে ব্যবহার করা—এটা একটা অনৈতিক কাজ। এগুলো সরকারের যে কমিটমেন্ট—দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি যে কমিটমেন্ট, সেই জায়গাটা থেকে সরে আসা এবং দুর্বল করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলকে কঠোরভাবে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে, উগ্র ভাষায়, রসিকতার ছলে ঘায়েল করলো—এটাকে আমার ভালো লাগলো, এটার প্রতিদান-পুরস্কার দেওয়া, এটা তো রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো মূলনীতি হতে পারে না।’
সরকারের আকার ছোট হলে বিশৃঙ্খলা কম হয়
দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর সর্বোচ্চ ৬১ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদের মন্ত্রিসভায়। আর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সরকারে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পান ৬০ জন। সে সময় সরকারপ্রধানের উপদেষ্টা ছিলেন চারজন।
বর্তমান সরকারের ছয় মাসে মন্ত্রিসভায় ৫৬ জন দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর সংখ্যা এখন ১২ জন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বদিউল আলম মজুমদার এই আকারকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনের আগে কয়েকবার বলেছিল ছোট আকারের কার্যকর সরকার গঠন করবে। এখন আর তা দেখা যাচ্ছে না। ছয় মাসের মধ্যে মন্ত্রিত্বের স্বাদ দিয়েছে ৫৬ জনকে। সরকার যত ছোট হবে, কাজ তত ভালো। অতীতে যখনই বড় আকারের সরকার ছিল, বিশৃঙ্খলা তত বেশি ছিল।’
‘কাজের গতি বাড়াতেই আকার বেড়েছে মন্ত্রিসভার’
নতুন যুক্ত হওয়া দুই প্রতিমন্ত্রীর একজন হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুক্ত করা হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ে আগে থেকেই প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামা ওবায়েদ ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন। এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী এক বছর তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত থাকবেন। ফলে কাজের সুবিধার জন্য এবং গতি বাড়াতে সরকার যে সিদ্ধান্তই নেবে, সে অনুযায়ী টিমওয়ার্ক হিসেবে আমরা কাজ করবো।’
মন্ত্রিসভার কলেবর বৃদ্ধি প্রসঙ্গে নতুন যুক্ত হওয়া মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানও কথা বলেছেন। শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারই ধারাবাহিকতায় আপনারা যে প্রশ্নটি করেছেন, তিনি যে মন্ত্রিসভা ছয় মাস আগে গঠন করেছিলেন, এটা সারা বিশ্বের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তারই ফলশ্রুতিতে আজকে তিনি মন্ত্রিসভায় সংযোজন করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের যে সমস্যাগুলো, যে বিষয়গুলো সম্পর্কে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) নিজে সম্পূর্ণভাবে ওয়াকিবহাল রয়েছেন, সেই সমস্যাগুলো দূর করে বাংলাদেশকে একটি গতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের সুনাম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।’








