রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘জয়ী দল সবকিছু পাবে’ এমন একপাক্ষিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে নির্বাহী বিভাগের অতিরিক্ত ক্ষমতায়ন রোধ করতে হবে। একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিতকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও সরকারি প্রভাবমুক্ত করতে হবে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে টিআইবির ধানমন্ডি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘তরুণদের নেতৃত্বে সকল শ্রেণিপেশাসহ সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্রের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও আমাদের রাজনীতি, নির্বাচন ও সংসদ মূলত অর্থ, পেশিশক্তি, ধর্ম, পুরুষতন্ত্র এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতন্ত্র এই পাঁচটি উপাদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় “জয়ী দল সবকিছু পাবে” এমন একপাক্ষিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা আবশ্যক।’
তিনি বলেন, সরকারি দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা থাকলেও নির্বাহী বিভাগকে অধিকতর ক্ষমতাবান করে এমন অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে জবাবদিহি নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করার উদ্যোগগুলো হয় বাতিল করা হয়েছে, অথবা এমনভাবে আইনে পরিণত করা হচ্ছে যাতে সেগুলো বাস্তবে সরকারি কর্তৃত্বের বাইরে যেতে না পারে।
‘মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিতে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গুম প্রতিরোধ আইন, সাইবার সুরক্ষা আইন ও এসআরবি আইনগুলো ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত বিচারবিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোকে অবিলম্বে পুনর্বহাল করতে হবে’, বলেন তিনি।
আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছে জিম্মি থাকতে পারে না উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে সকলের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সুশাসনের স্বপ্ন পূরণে দেশের রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্রে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত দীক্ষার ওপর ভিত্তি করে আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘বর্তমান সরকারের ক্ষমতার উৎস এদেশের জনগণ। দীর্ঘ স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জনগণের রায়ে ও সমর্থনে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর নয়, বরং এটি আপামর জনসাধারণের। রাষ্ট্র ও ক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণ এবং একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বৈষম্যহীন দেশ গড়তে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং যুক্তিসংগত সমালোচনা ও পরামর্শকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত রয়েছে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ পদে বসা ব্যক্তির দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বরং মূল প্রশ্নটি হওয়া উচিত যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হচ্ছে কি না।’
আলোচনায় বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী, রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক তাসনিম জারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
তাসনিম জারা বলেন, ‘নির্বাচন কেবল পাঁচ বছর অন্তর আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জবাবদিহি নিশ্চিতকারী তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো কারো নিয়ন্ত্রণে থাকলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।’
আলোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সংবেদনশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা গ্রহণ, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন ও সরকারি চাকরির ভাইভা নম্বরের মতো প্রক্রিয়ায় বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানানো হয়।