আইনশৃঙ্খলার নেতিবাচক চিত্র: কী বলছেন রাজনীতিবিদরা

বিএনপি সরকারের আট মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর, দখল, চাঁদাবাজি ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশ্লেষকরা। তাদের কেউ সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন, কেউ প্রশাসনের ভেতরের ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন। তবে ক্ষমতাসীন বিএনপি বলছে, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সর্বশেষ গত শুক্র ও শনিবার খোদ রাজধানীতেই ঘটেছে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা। মিরপুরে স্বল্প আয়ের মানুষের কল্যাণে পরিচালিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও চিকিৎসা সামগ্রী ধ্বংস, ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর, গুলিস্তানে জাসদের কার্যালয়ে হামলা ও নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, আদাবরে বাড়ির মালিককে চাঁদাবাজদের হুমকি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতাসহ বেশ কয়েকটি ইস্যুতে চাপের মুখে পড়েছে সরকার।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ঢাকার বাইরের চিত্রও আরও ভয়াবহ বলে মনে করেন কেউ কেউ। এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট বলেন, সরকার এখনই এসব বিষয় শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে না পারলে সামনে বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপির হাইকমান্ড বলেছিল, গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। অথচ এই সময়ে সবকিছুতেই কেমন যেন হ-য-ব-র-ল অবস্থা।

তার মতে, পরিকল্পিতভাবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি পক্ষ তৎপর রয়েছে। এতে সরকারের সুবিধাভোগী কতিপয় নেতাকর্মীও নেপথ্যে ভূমিকা পালন করছেন।

অবশ্য ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বারবার বলে আসছেন, বর্তমান অনেক কিছুই তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। তাই এখনই সবকিছু স্বাভাবিক করা কঠিন। তারপরও সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে।

‘পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি’

জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও রাজনীতি বিশ্লেষক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আসলে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। এর জন্য সরকারই দায়ী। কারণ তারা এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সব জায়গায় দলীয় লোকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে।

রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ঢাকা, সিলেট ও পাবনাসহ বিভিন্ন স্থানে দখলদারির ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, তার নির্বাচনি এলাকা বগুড়ার শিবগঞ্জে তার দল নাগরিক ঐক্যের উপজেলা সাধারণ সম্পাদককে গ্রেফতার করা হলেও জামিনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে কোর্টে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। এর জন্য তিনি বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের দায়ী করেন।

মান্না বলেন, শুধু একটি নয়, এমন অনেক ঘটনাই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে বৃহত্তর স্বার্থে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থেকে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় সংকট আরও বাড়বে।

কেন এই পরিস্থিতি?

সরকারের মাত্র আট মাসের মাথায় দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি হঠাৎ করে এমন হওয়ার আসল কারণ কী—এ নিয়ে একেকজন একেকভাবে মূল্যায়ন করছেন।

কেউ কেউ মনে করেন, যেকোনো সরকার ক্ষমতায় এলেই এক ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি হয়। তারা দলের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক স্বার্থ আদায় করেন। একজনের দেখাদেখি অন্যরাও এমন কাজে জড়িয়ে পড়েন। এ ক্ষেত্রে দলের শীর্ষ নেতাদের উদাসীনতাও কিছুটা দায়ী। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়েও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তাই অনেক কাজই সরকারকে বিব্রত করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত আট মাসে সরকারের কোনও মন্ত্রণালয়ের সাফল্য নেই। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। সব জায়গায় বিশৃঙ্খলা।

তার মতে, এসব সমস্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে সরকার সবকিছুকেই দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করছে। সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় নিয়োগ দিচ্ছে না। পুলিশ বাহিনীতে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের লোকজন আছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। বরং নানা বিতর্কিত কাজে জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু তাদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে না।

তাছাড়া বিরোধী দলকে গুরুত্বহীন প্রমাণ করার একটি প্রবণতা সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এসব কারণে দিন দিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা দেশের জন্য অশনিসংকেত।

সরকারের ভেতরে থেকেও চক্রান্ত?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এক সংসদ সদস্য জানান, প্রশাসনের ভেতরে একটি চক্র সরকারকে ব্যর্থ করার জন্য চক্রান্ত করছে। এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দখলদারিত্ব ও অর্থনৈতিক খাতকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

এতে পতিত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া লোকজন সম্পৃক্ত থাকতে পারেন বলে তার ধারণা।

একই কথা বলছেন প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহতা, দখলদারিত্ব ও মানুষ হত্যা করা এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

এসব অপরাধের বেশিরভাগের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সম্পৃক্ত রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তার দাবি, এখন পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে মারামারি করে ৪০-৫০ জন খুনের শিকার হয়েছেন। কোনও কিছুই সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই।

এসব বিষয়ে প্রশাসনের ভেতর থেকেই একটি পক্ষ কলকাঠি নাড়ছে, হয়তো তারা সরকারকে ব্যর্থ করতে চায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। অথচ আমরা চাই সরকার সফলভাবেই ক্ষমতা চালাক। কিন্তু সরকার বিরোধী দলকে উপেক্ষা করে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে তোষণের নীতি অবলম্বন করছে। অথচ আমরা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করছি।

তার দাবি, সবকিছুতেই সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এ কারণে বিরোধী দলের আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে।

কী করতে পারে সরকার?

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করেন, এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকা কারও জন্যই সুখকর নয়। তাই এ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মানুষের নিরাপত্তা নেই। এমনটি চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে।

কিন্তু বারবার সরকার পরিবর্তন হলে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাই তারা সরকার ব্যর্থ হোক, তা চান না। এ ক্ষেত্রে সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিএনপি যখন সংস্কারের চেয়ে নির্বাচনকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছিল, তখনই তারা বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দলটি অস্থির হয়ে গেছে। এটি তাদের যতটুকু না ভোগাবে, তার চেয়েও বেশি ভোগাবে দেশ ও জাতিকে।

আজকে দেশের যে পরিস্থিতি, তা বিএনপিরই ভুল নীতির ফসল বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই ভুল করেছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকার। তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কঠোর হতে পারেননি।

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বিএনপির উচিত ছিল ক্ষমতার শুরুতেই দলের দখলবাজ-চাঁদাবাজ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তারা তাদের ৬-৭ হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছিল। কিন্তু বর্তমানে পুরোটাই লাগামহীন।

এখনও সময় আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের উচিত দলের ভেতরকার সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সব অপরাধীকে কঠোর বার্তা দেওয়া। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নকে এক নম্বর অগ্রাধিকার দেওয়া। নাহলে দিন দিন এ সরকারের প্রতি জনআস্থা আরও নিচের দিকে চলে যাবে।

বিএনপির মূল্যায়ন

সরকারের আট মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সামগ্রিক দিক নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা এলেও ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। দলটি মনে করে, সরকার একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছে। এ সময়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। তারপরও সরকার সবকিছুতেই আন্তরিকতার সঙ্গে এগোচ্ছে।

এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এমপি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অল্প সময়ে সরকার প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলছেন। আমরা বলবো, কিছু হত্যাকাণ্ড বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, যা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হয়নি।

আবার অনেকে দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করছে। কিন্তু সরকার দলীয় বিবেচনায় কোনও অপরাধীকে ছাড় দিচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, এখন দেশে কাউকে গুম করা হচ্ছে না। বিরোধী দল শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে পারছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া দেশ এখনও সঠিক ট্রেন্ডেই আছে।

তারপরও সরকার সবাইকে নিয়ে সংকট মোকাবিলা করতে চায় বলে জানান সেলিমা রহমান।