এমপি পদ হারালেন মিষ্টি, আপসে রক্ষা পাবেন গাজী নজরুল?

রাজধানীর মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হলো। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকারের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। ইতোমধ্যে তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।

এর আগে দুপুরে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। অন্যথায় কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেন দলীয় হাইকমান্ড।

দলীয় এমপির এই সিদ্ধান্তের বিষয়টিকে ‘যুগান্তকারী’ হিসেবে অনেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে তারা লিখেছেন, অন্যদের জন্য এটি কঠোর সতর্ক বার্তা।

তবে বিএনপির একজন এমপির ব্যাপারে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নৈতিক স্খলনের দায়ে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুলের এমপি পদ বহাল থাকার বিষয়টিকে সামনে আনছেন অনেকে। কারণ দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলায় কারাগারে থাকা অবস্থাতেই সম্প্রতি তার সঙ্গে আপস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার মৃতের স্বজনেরা। আদালত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে এতকিছুর পরও এখনও এমপি পদে বহাল তবিয়তে আছেন গাজী নজরুল ইসলাম। এটি কীভাবে সম্ভব? এমন প্রশ্নও উঠেছে।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা হচ্ছে গাজী নজরুল দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পরও কীভাবে এমপি পদে টিকে রইলেন? তাহলে কি গাজী নজরুল আপসরফা করে রক্ষা পাবেন?

যদিও জামায়াত নেতাদের দাবি কোনও এমপি অভিযুক্ত হলে দল থেকে সর্বোচ্চ বহিষ্কার করার এখতিয়ার আছে। তারা সেটি করেছেন। আর তারা এমপি পদ বাতিলের জন্য স্পিকারকে চিঠিও দিয়েছেন। এর বাইরে দলগতভাবে তাদের কিছু করার নেই। আসলে কি তাই? দলগতভাবে কি তাদের আর কিছুই করার ছিল না। তারা কি শুরুতে দলীয় এমপিকে পদত্যাগ করতে বলতে পারতো না?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজনীতি বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অন্যায় কাজের জন্য ক্ষমতাসীন বিএনপির একজন এমপিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। প্রথমত এই সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। অপরাধীদের বিষয়ে দলীয় এ সিদ্ধান্ত দৃষ্টান্তমূলক হয়ে থাকেবে। দ্বিতীয়ত জামায়াতের একজন এমপিকে নৈতিক স্খলনের দায়ে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু তার এমপি পদ এখনও বহাল আছে। আমরা মনে করি এটি বিস্ময়কর। দলটি চাইলে সেই এমপির পদত্যাগের বিষয়ে তারা কঠোরতা অবলম্বন কর করতে পারতো।‘

প্রিন্স বলেন, ‘নির্দিষ্টি কাউকে শাস্তি দিলেই সব কিছু শেষ হয়ে যায় না, বরং এ ধরনের অন্য ব্যক্তিদের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।’

দলীয় গণতান্ত্রিক ভিত্তির কথা বলছে বিএনপি

সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের দুই এমপির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক পদক্ষেপকে একেকজন একেকভাবে বর্ণনা করলেও বিএনপি দেখছে ভিন্ন দৃষ্টিতে। তারা মনে করেন, বিএনপিতে যত বড় পদেরই থাকুক অন্যায় করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হয় না। অতীতে স্থায়ী কমিটির সদস্যকেও ছাড় দেওয়া হয়নি। আর এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে দলীয় সিদ্ধান্তে পদত্যাগ করার নির্দেশনা একটি কঠোর বার্তা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি সুলতানা আহম্মাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেকোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। তাই অভিযুক্ত হওয়ায় এমপি মিষ্টিকে পদ্যতাগ করার নির্দেশনা দেন‘। তিনি বলেন, মূলত বিএনপি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে লালন করে। তাই যেকোনও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বেগ পেতে হয় না।

অপরদিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ বহাল থাকার সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে দলটিতে গণতান্ত্রিক চর্চা থাকলে তারা আগেই পদত্যাগ করানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারতো।এখন যদি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে আপস করে টিকে যান, তাহলে তো কিছুই করার নেই।

গাজী নজরুল নিয়ে আইনি কাঠামোর দায় কি জামায়াতের নয়?  

নৈতিক স্খলনের দায়ে গত ২২ জুলাই গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। পরদিন দল থেকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে অবহিত করা হয়।কিন্তু এখন পর্যন্ত তার এমপি পদ বহাল রয়েছে। সম্প্রতি সেই এমপির দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। এতে আত্মহত্যা প্ররোচনার দায়ে এমপি নজরুল ও তার প্রথম পক্ষের স্ত্রী মাকসুদাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে  ভুক্তভোগী পরিবারের আপস হয়। এতে গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। এত কিছু পরও গাজী নজরুলের এমপি পদ বহাল থাকা নিয়ে নানা আইনি ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তবে অন্যায়ে জড়িত বিএনপির এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের দলীয় সিদ্ধান্তের পর সামনে আসছে গাজী নজরুলের বিষয়টি। অনেকে প্রশ্ন করেন, তাহলে জামায়াত দলীয়ভাবে তার পদত্যাগ চায় না। যদি চাইতো, তাহলে তো বহিষ্কারের আগেই পদত্যাগে বাধ্য করতে পারতো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিএনপির এমপি ফৌজদারি অপরাধ করেছেন। তাই তাকে শুধু এমপি পদ থেকে সরালেই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নিতে হবে। কারণ রাডডা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলায় তিনিসহ বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়িত। আর গাজী নজরুলের বিষয়ে আমরা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করতে দল থেকে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারপরও সরকার সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে রেখেছে। সে ব্যাপারেও আমাদের দলীয় প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেতা আপত্তি জানিয়েছেন। এরপরও হয়তো আইনি কাঠামোতে তিনি টিকে রয়েছেন। সেখানে আমাদের কিছু করার নেই।