কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ছাত্র রাজনীতির অনুমতি না থাকলেও বহাল তবিয়তে চলছে ছাত্রলীগের রাজনীতি। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্র রাজনীতির নামে টেন্ডারবাজি আর আধিপত্য বিস্তার করাই তাদের কাজ। যার সর্বশেষ বলি ছাত্রলীগ নেতা খালিদ সাইফুল্লাহ।
কুবিতে টেন্ডারবাজ হিসেবে পরিচিতি আছে ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে ডজনখানেক নেতার। ১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ঠিকাদারিতে আধিপত্য বিস্তার করা নিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ছাত্রলীগ নেতা খালিদ সাইফুল্লাহ নিহত হয়েছেন বলে একাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থী জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলো জানায়, কুবির বিভিন্ন কাজের টেন্ডার ঠিকাদারদের পাইয়ে দিতে এসব নেতা ভূমিকা রাখেন। কিছুদিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের কাজের টেন্ডার হওয়ার কথা রয়েছে। এ কারণে এখন থেকে চলছে আধিপত্য বিস্তারের মহড়া। এরই বলি হয়েছেন খালিদ সাইফুল্লাহ।
ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সম্প্রতি সংঘর্ষের আশঙ্কা সৃষ্টি হলেও প্রশাসন সঠিক পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী, কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টেন্ডারবাজিতে জড়িত উল্লেখযোগ্য ছাত্র নেতারা হচ্ছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মাসুম, যুগ্ম আহ্বায়ক আল-আমিন অর্ণব ও যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ শাহরিয়ার মাহমুদ। এ তিনজন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে গেলেও এখনও তাদের ছত্র ছায়াতেই চলছে টেন্ডারবাজি।
সাবেক আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মাসুম ও ধীরেন্দ্রনাথ হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজের মধ্যে আগে থেকেই দ্বন্দ্ব ছিল। ক্যাম্পাসে তাদের দুটি গ্রুপও বিবদমান রয়েছে।
কুবি ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান আলিফ ও সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-এলাহী, মাহমুদুর রহমান মাসুম গ্রুপের হয়ে ক্যাম্পাসে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের গ্রুপের বিপ্লব চন্দ্র দাস সবুজ গ্রুপের খালিদকে গুলি করেছেন বলে অভিযোগ করেন ইলিয়াস হোসেন সবুজ।
এই সবুজ গ্রুপের হয়ে ক্যাম্পাসে টেন্ডারবাজি করে মাজেদ, রুপমসহ কয়েকজন। আর টেন্ডারবাজদের সহযোগিতা করে স্থানীয় সালমানপুর গ্রামের পিচ্চি মাসুম, পিচ্চি সুজন ও আবদুল কাদের সুজনসহ একাধিক বহিরাগত।
অভিযোগ রয়েছে, ‘স’ ও ‘প’ আদ্যাক্ষরের সরকার দলীয় দুই নেতা টেন্ডারবাজিতে ছাত্রলীগ নেতাদের বেশি ব্যবহার করেন।
সূত্র আরও জানায়, কুবির চারটি হলের মধ্যে তিনটি ছাত্র হল। এতে আসন সংখ্যা ৫০০ হলেও ছাত্র ও বহিরাগতসহ থাকছেন সহস্রাধিক।
এবিষয়ে ধীরেন্দ্রনাথ হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সবুজ বলেন, ‘বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান আলিফ মাত্র দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছে। জুনিয়র ছেলেকে সভাপতি করায় কেউ তাকে মানছে না। তার নেপথ্যে রয়েছে সাবেক আহ্বায়ক মাসুম। মূলত নেতৃত্বের দুর্বলতা থেকেই এই কোন্দল। স্থানীয় দুজন মন্ত্রীও কেন্দ্রের কাছে এই কমিটি ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্র এখনও কোনও উদ্যোগ নেয়নি। আমরা চাই বর্তমান কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘খালিদের হত্যাকারী চিহ্নিত অথচ প্রশাসন মামলায় তার নাম পর্যন্ত দেয়নি। প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চাইছে।’
তার সমর্থকরাও সন্ত্রাস ও টেন্ডারবাজিতে জড়িত প্রশ্নে সবুজ বলেন, ‘আমি তাদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি তো কমিটির কেউ নই। বর্তমান কমিটির দায়িত্ব সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করা।’
খালিদ হত্যাকাণ্ড ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মাসুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি দেড় বছর আগে পাস করে বের হওয়ার পর আর ক্যাম্পাসে যাইনি। তবে হ্যাঁ, আমার সমর্থক অছে। আলিফকে সভাপতি করার পেছনে আমার চেষ্টা ছিল। তার মানে এই নয় যে, বর্তমান ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত।’
মাসুম তার প্রতিপক্ষ সবুজকে দায়ী করে বলেন, ‘টেন্ডাবাজি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে সবুজরা জড়িত। সে এক সময় ছাত্রদল করতো। আমার হাত ধরেই ছাত্রলীগে আসে। পরে তার কর্মকাণ্ডের জন্য তার থেকে আমি দূরে সরে যাই।’
টেন্ডারবাজির সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে মাসুম বলেন, ‘আমি বর্তমানে ঢাকায় থাকি। এসবের সঙ্গে আমার কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই।’
এদিকে, কুবিতে সন্ত্রাস ও টেন্ডারবাজি সম্পর্কে ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আল-আমিন অর্ণব নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে বলেন, ২০১৫ সালে বর্তমান কমিটি গঠনের আগেই পড়ালেখা শেষ করে তিনি ক্যাম্পাস ছেড়েছেন।
খালিদের হত্যাকাণ্ডকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে বিশুদ্ধ রাজনীতির চর্চা হওয়া উচিত।’
আরেক সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদও বছর দুয়েক আগেই ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। কুবির বর্তমান ছাত্রলীগ নেতৃত্বের সঙ্গে তার কোনও যোগাযোগ নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
ঘটনা সম্পর্কে জানতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান আলিফকে একাধিকবারে ফোন করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
আর বিপ্লব চন্দ্র দাসের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তার বাবা কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের ঝাড়ুদার বাবুল চন্দ্র দাস জানান, ‘বিপ্লব ঢাকায় ছিল। ঘটনার দিন সবুজ গ্রুপের ছেলেরা তাকে ঢাকা থেকে কুমিল্লায় ডেকে নিয়ে আসে। আমার ছেলে কাউকে হত্যা করেনি। সে ষড়যন্ত্রের শিকার।’
তিনি বলেন, ‘বিপ্লব বর্তমানে বাড়িতে থাকছে না। কোথায় আছে তাও জানা নেই।’
এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আইনুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের গ্রুপিং আগে থেকে ছিল। এটা আমরা জানতাম। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় তাদের সঙ্গে বসেছিও। আমরা পুলিশকেও জানিয়েছি। কিন্তু এতবড় ঘটনা ঘটে যাবে তা ভাবতে পাড়িনি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির অনুমতি নেই, তাহলে ছাত্রলীগ কীভাবে আছে- জানতে চাইলে প্রক্টর বলেন, ‘ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি এখানে কমিটি করে দিয়েছে। এতে তো আমাদের হাত নেই।’
হত্যাকাণ্ডের প্রশাসন কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশ্নে আইনুল হক বলেন, ‘যেহেতু প্রত্যক্ষ দেখিনি কে হত্যা করেছে। তাই অজ্ঞাতনামা আসামিদের নামে প্রশাসন থেকে মামলা করা হয়েছে।’
হত্যাকাণ্ডের পরও কি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রাজনীতি অব্যাহত থাকবে-এ প্রশ্নের জবাবে প্রক্টর বলেন, বিশ্বদ্যিালয় খোলার পর ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে পারবে কি না, সে ব্যাপারে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।’
প্রসঙ্গত, শোকাবহ আগস্টের প্রথম প্রহরে কুবির বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবাসিক হলে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের সময় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কুবির শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সবুজ গ্রুপের সঙ্গে কুবি ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি আলিফ গ্রুপের কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এসময় গুলিবিদ্ধ হয়ে সবুজ গ্রুপের ছাত্রলীগ নেতা খালিদ সাইফুল্লাহ নিহত হন। তিনি নজরুল হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।
আরও পড়ুন: ‘হামার টাকাও নাই, চিকিৎসাও নাই!’
/এপিএইচ/এসটি/