ইইউ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যেসব আলোচনা হলো আ.লীগের

বাংলাদেশ সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদের কাছে নির্বাচনি আইন প্রণয়ন, নির্বাচনি ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন ও সংস্কার এবং ভালো নির্বাচন আয়োজনে নেওয়া সরকারের নানা পদক্ষেপ এবং দলের নির্বাচনি চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেই সঙ্গে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার ও সরকারি দলের সদিচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তারা।

শনিবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে ইইউ প্রতিনিধিদের সঙ্গে সোয়া ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব বিষয় বিশদভাবে তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দলের নেতারা। এ সময় ইইউ প্রতিনিধিদের জানতে চাওয়া বিভিন্ন বিষয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান তারা স্পষ্ট করেন বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া অন্তত চারজন আওয়ামী লীগ নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বৈঠকের প্রথম দিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর পরিবেশ নিয়ে জানতে চান ইইউ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। জবাবে নির্বাচনি আইন প্রণয়নের কথা জানিয়ে বলা হয়, সংবিধান অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বর কিংবা জানুয়ারির শুরুতে নির্বাচন হবে এবং তার অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করা সম্ভব হবে।356560248_1556390228225490_55404377255712256_n

তারা জানান, ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কেন প্রশ্ন তোলা হয়, সেটি জানতে চান ইইউ প্রতিনিধিরা। জবাবে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, ২০১৩-২০১৪ সালে জ্বালাও-পোড়াও করা বিএনপির ওপরও দশম সংসদ নির্বাচনে ১৫৩ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার দায় রয়েছে। দলটি নির্বাচন বর্জন করে উল্টো নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল। আর ২০১৮ সালে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও মনোনয়ন বাণিজ্য এবং অধিকাংশ আসনে ৩-৪ জন প্রার্থী করে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে।

আগামী নির্বাচন নিয়ে জানতে চাইলে ইইউ প্রতিনিধি দলকে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, নির্বাচনি ব্যবস্থা সংস্কার করে অন্যান্য দেশের মতো সময়োপযোগী ও টেকসই করেছে সরকার। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নির্বাচন নিয়ে ৬৬টি আইন ও অধ্যাদেশ করা হয়েছে, তার মধ্যে ৫৫টিই করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। বাকিগুলোর মধ্যে পাঁচটি এক-এগারোর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এবং ৬টি বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সরকারের সময় করা হয়।

বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতারা ইইউ প্রতিনিধিদের আরও জানান, আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত ছিল। সেই আইনটি গত বছর সংশোধন করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার খর্ব করে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। পরে সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশোধনী নিয়ে জানতে চান ইইউ প্রতিনিধিরা। আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, এই আইনে নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা এড়াতে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ব্যালট পেপারে শুধু সিল থাকার বিষয়টি পরিবর্তন করে স্বাক্ষর থাকার বাধ্যবাধকতা যুক্ত করে ভোটের কারচুপির পথ বন্ধ করা হয়েছে নতুন আইনে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনভাবে আলাদা বাজেট করা, ভোটের সময় সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা এবং লাইভ স্ট্রিমিং করার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এখন আর ভোট কারচুপি করার সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৈঠকে অংশ নেওয়া দুই জন আওয়ামী লীগ নেতা নাম প্রকাশ না করারা শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনে সিইসি ও ইসি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে। বিষয়টি তুলে ধরার পরে ইইউ প্রতিনিধিরা আশ্বস্ত হয়েছেন এবং এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একাধিক উপনির্বাচন, পাঁচ সিটির নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা হয়েছে। সরকারি দলের প্রার্থীরা কোনও ধরনের অগ্রাধিকার বা বেশি সুবিধা পাননি। কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিতও হয়েছে। এসব নির্বাচন নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি। নির্বাচনগুলো অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনও একইভাবে অনুষ্ঠিত হবে।

বৈঠকে নির্বাচনি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা উঠলে আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন, কোনও দেশে নিখুঁত নির্বাচনি ব্যবস্থা নাই। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বিরোধীদের একটা প্রবণতা আছে যে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হারলে ভোট সুষ্ঠু হয়েছে আর জিতলে সুষ্ঠু হয়নি বলা হয়। এই প্রবণতা থেকে রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে।

ইইউ প্রতিনিধি দলের কাছে বিএনপির দেওয়া তথ্য ও অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে আওয়ামী লীগ নেতারা বৈঠকে বলেছেন, সেগুলো যাচাই-বাছাই হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। কেননা, সব দলকে নির্বাচনে স্বাগত জানায় সরকার ও আওয়ামী লীগ। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে নানা পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। তারপরও কোনও দল নির্বাচনে না আসলে সংবিধান অনুযায়ী বিদ্যমান আইনে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইইউ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। আমরা আমাদের কথাগুলো তাদের বলেছি। তারা আমাদের কথা কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তারা আশ্বস্ত হয়েছে বলে আমাদের মনে হয়েছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া দলটির দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা আওয়ামী লীগের অবস্থান তাদের কাছে স্পষ্ট করেছি।বৈঠক শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন

বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের যে প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসেছে, আজকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে তারা কথা বলেছে। এখানে মূলত একটা ব্যাপারে আমাদের অঙ্গীকার তাদের চাওয়াটা, সেটা হলো—বাংলাদেশে তারা একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চান এবং আমরাও বলেছি, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধান, সার্বভৌমত্ব, আইনি ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে তারা একটি নির্বাচন দেখতে চায়। তারা নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারে আশ্বস্ত হয়েছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। আমাদের সঙ্গে কী কথা হয়েছে, আমরা তা বললাম।’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধান, সার্বভৌমত্ব, আইনি ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে তারা আগামী নির্বাচন দেখতে চায়। সংলাপ নিয়ে প্রতিনিধি দল কোনও কথা বলেনি। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা সংসদ বিলুপ্তির বিষয় নিয়েও প্রতিনিধি দল কোনও কথা বলেনি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হবে। এখানে পার্লামেন্ট বিলুপ্তির প্রশ্নই ওঠে না। সরকারের পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নই ওঠে না।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে দলটির ৯ সদস্যের প্রতিনিধি দলে ছিলেন— উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ, আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, দফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, তথ্য সম্পাদক সেলিম মাহমুদ, কার্যনির্বাহী সদস্য তারানা হালিম ও মোহাম্মদ এ আরাফাত।

অন্যদিকে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ মূল্যায়ন করতে ঢাকায় আসা রিকার্ডো চেলারির নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৫ সদস্য ছিলেন প্রতিনিধি দলে। সংস্থাটির প্রাক-তথ্যানুসন্ধানী দলের ৬ সদস্য বাংলাদেশে আসলেও একজন আওয়ামী লীগের সঙ্গে হওয়া বৈঠকে ছিলেন না। তবে বৈঠক শেষ ইইউ প্রতিনিধি দলের সদস্যদের পক্ষ থেকে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কোনও ব্রিফ করা হয়নি।

এর আগে সোমবার (১০ জুলাই) ইইউ রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলির গুলশানের বাসায় সংস্থাটির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছিলেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির চার নেতা। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে বৈঠকটি চললেও এ বিষয়ে ইইউ ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি।

প্রসঙ্গত, শনিবার বিকাল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঢাকা অফিসে সফররত প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ মূল্যায়ন করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৬ সদস্যের নির্বাচনি অনুসন্ধানী মিশন গত ৯ জুলাই ভোরে ঢাকায় এসে পৌঁছায়। দুই সপ্তাহের সফর আগামী ২৩ জুলাই শেষ হবে।