জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধে ১৪ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘এখন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে সরকার। সেটার প্রক্রিয়া কী হবে, আইনগত দিক দেখে সরকার শিগগিরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। আমরা আইনগত দিকটি ভালোভাবে দেখে নিতে চাই। যাতে ফাঁকফোকর দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে এ অপশক্তি আর কোনও সুযোগ না পায়।’
মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক যৌথসভায় তিনি এসব কথা বলেন। শোকের মাস আগস্টের মাসব্যাপী কর্মসূচি ঠিক করতে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এ বৈঠক করে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ।
সোমবার (২৯ জুলাই) গণভবনে ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমকে জানানোর কথা উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে হওয়া ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে নেতারা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জামায়াতের অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন সময় দেওয়া আদালতের রায় বিবেচনা করে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধে ১৪ দল সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা ও নাগরিক সমাজ দাবি করে আসছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির গঠিত গণআদালত এবং পরবর্তী সময়ে গণজাগরণ মঞ্চের দাবিও ছিল জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ।’
জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে হাইকোর্টের রায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত বহাল রেখেছেন উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘দেশের গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন না থাকলে কোনও রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন নজির আছে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আদালতে জামায়াতকে দল হিসেবে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দলটি ধর্মের মুখোশ পরা সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। নানা সময়ে তাদের বিরুদ্ধে অপতৎপরতা, নাশকতা, ষড়যন্ত্র এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেশের জনগণও সেটা জানে।’
‘সরকার অসহায় শিক্ষার্থীদের আটক ও নির্যাতন করছে’— বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন বক্তব্যকে ‘নির্লজ্জ মিথ্যাচার’ বলে দাবি করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধীদের চিহ্নিত করছে। আমাদের জানামতে কোনও নিরপরাধ ব্যক্তিকে আটক করা হচ্ছে না। নিরীহ ও সাধারণ শিক্ষার্থী যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেটা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে।’
আওয়ামী লীগ নিজেদের আচার-আচরণে দায়িত্বশীলতাকে গুরুত্ব দেয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘গণগ্রেফতারের নামে কোনও নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে অপরাধী সাব্যস্ত না হয়, গ্রেফতার না হয়; সে বিষয়ে আমাদের দলের সিদ্ধান্ত রয়েছে। কোনও নিরীহ ব্যক্তিকে হয়রানি করা যাবে না। গ্রেফতারের সংখ্যা বেশি দেখানোর জন্য কেউ যাতে নিরপরাধ কাউকে ধরে না ফেলেন। এটা যাতে না হয় সে বিষয়ে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
তিনি বলেন, ‘মির্জা ফখরুলের কাছে সবাই নিরপরাধ, সবাই অসহায়। তাহলে প্রশ্ন, এই ধ্বংসযজ্ঞ চালালো কারা? কারা অগ্নিসংযোগ করলো, রাষ্ট্রের সম্পদ ভস্মীভূত করলো? বাংলাদেশে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ কারা চালিয়েছে? আজ কথায় কথায় সরকার ও আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করা হয়। এ ঘটনা প্রবাহে আমরা আক্রান্ত, আক্রমণকারী ছিলাম না। এখন অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের হাতে অস্ত্র ছিল না। আজ অনেকেই বলে, আওয়ামী লীগের লোকজন কম ছিল, অনুপস্থিত ছিল। আমি বলতে চাই, দলীয় লোকজনকে অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত হয়ে কোথাও অবস্থান নিতে বলা হয়নি। আমরা তো আক্রান্ত হয়েছি। নিরস্ত্ররা সশস্ত্রদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি।’
সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি স্থাপনার কথা উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তাহলে কারা এই নারকীয় বর্বরতার আশ্রয় নিয়েছে? তাদের সঙ্গে আপনি (ফখরুল) জাতীয় ঐক্য করছেন। যারা কারাগারের অস্ত্র লুট করেছে তারা কী আপনার বন্ধু ও দোসর?’
মির্জা ফখরুলকে উদ্দেশ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সব তথ্য আমাদের কাছে আছে। কোথা থেকে নির্দেশ এসেছে, উসকানি এসেছে, কোথায় কোথায় বৈঠক করেছে, অর্থ জুগিয়েছে, কোন কৌশলে অর্থ পাঠিয়েছে, সেটা আমরা জানি। সব ষড়যন্ত্র এখন জাতির কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। মিথ্যার বেসাতি করে, আবোল-তাবোল বলে জাতিকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ নেই।’
ঢাকা মহানগর, মহানগর, জেলা, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যন্ত নেতাকর্মীদের বিরাজমান পরিস্থিতিতে কারফিউ মেনে চলার আহ্বান জানান কাদের। তিনি বলেন, ‘দলীয়ভাবে পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। গুজব ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে। তাদের তথ্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে জানাতে হবে।’
কোটা সংস্কারে সৃষ্ট সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করে মঙ্গলবার একদিনের শোক পালনের কথা জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আজকের দিনটি ঠিক রাষ্ট্রীয় শোক দিবস নয়, এটা সরকারিভাবে শোক পালন, জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় নয়।’
জাতীয় শোকদিবস উপলক্ষে আগস্ট মাসব্যাপী কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি বছরই এ শোকের মাস যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালন করে থাকি। গত কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় জাতীয় শোক দিবস ও শোকের মাসে আমাদের কর্মসূচি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদের মহানগর ও সহযোগী সংগঠন নিজেদের ফোরাম সভা করে কর্মসূচি নির্ধারণ করেছেন।’
বৈঠকে আরও ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম প্রমুখ।