আ.লীগ-জামায়াতের প্রার্থী দেখে কৌশল ঠিক করবে বিএনপি

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। তবে, এরপরও আগে ডিএসসিসিতে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী কে হবেন এবং  ডিএনসিসিতে জামায়াত কোনও প্রার্থী দেবে কিনা, সে বিষয়টি দেখতে চান দলটির নীতিনির্ধারকরা। বিষয়টি দেখেই বিএনপি নিজেদের নির্বাচনের ধরন ও পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করবে। দলটির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে আলাপকালে এমন আভাস পাওয়া গেছে।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন নিয়ে কিছু শঙ্কা রয়েছে দলের ভেতর। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ঢাকা দক্ষিণে বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনকেই রাখবে, নাকি নতুন প্রার্থী দেবে, এ নিয়ে নেতাদের মধ্যে চিন্তা রয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল নতুন কাউকে বেছে নিলে নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে এক ধরনের বার্তা নেবে বিএনপি। আর যদি প্রার্থী অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা কম থাকবে—এমন দাবি দায়িত্বশীল এই সূত্রটির।

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ১৬ জন। এরমধ্যে প্রথম দিন বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) ৮ জন এবং দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার ৮ জন মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। দ্বিতীয় দিন ডিএসসিসিতে ৪ জন এবং ডিএনসিসিতে ৪ জন ফরম কিনেছেন। ডিএসসিসিতে মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে সাঈদ খোকন, হাজী সেলিম ও ফজলে নূর তাপস উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, বিএনপির মেয়র প্রার্থী হিসেবে অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সন্তান প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন ডিএসসিসি থেকে, ড. আসাদুজ্জামান রিপন ও তাবিথ আউয়াল উত্তর থেকে নির্বাচন করতে মনোনয়ন ফরম তুলেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বলছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন কেমন হবে, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বক্তব্য দিয়েছেন। সরকারের রাজনৈতিক সহযোগী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরও নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন আজ। এক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রকাশ্য আলাপে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার পক্ষে মত থাকলেও আদতে ভিন্ন কোনও কৌশল সরকারের কাজ করছে কিনা, তা ভেবে দেখতে হবে।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনই গণতান্ত্রিক দলের একমাত্র মাধ্যম। সেক্ষেত্রে বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) স্থায়ী কমিটির বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে নির্বাচন নিয়ে দলের সিনিয়র নেতারা আলোচনা করবেন।’

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রটির ভাষ্য, ঢাকা সিটি করপোরেশন ভোট কেমন হবে, তার একটি চিত্র পাওয়া যাবে ক্ষমতাসীনদের প্রার্থী নির্ধারণ হওয়ার পর। ডিএনসিসিতে বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলামের জায়গায় নতুন কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা বা পরিস্থিতি সামনে আসেনি। তবে, ডিএসসিসিতে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী একাধিক নেতা মনোনয়ন ফরম তোলায় নতুন চিন্তা সঞ্চারিত হয়েছে বিএনপিতে। এক্ষেত্রে ডিএসসিসিতে প্রার্থী পরিবর্তন করা হলে বর্তমান মেয়রের ব্যর্থতাই প্রমাণিত হবে বলে মনে করছেন বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী দায়িত্বশীল নেতা।

তবে, ডিএসসিসিতে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বলছেন, ‘প্রার্থীকে আমি একজন প্রার্থী হিসেবে দেখি। আমার কাছে সব প্রার্থী সমান। প্রার্থী নামের আগে কোনও বিশেষণ বা কোনও পরিবারের পদবি ভোটারদের কাছে ম্যাটার করে না। এখানে প্রার্থী নয়, লড়াইটা হবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে। সুতরাং কে প্রার্থী হচ্ছেন, এটি কোনও বিষয় নয়। আর বর্তমান মেয়রের কর্মকাণ্ড নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করতে চাই না। কারণ, এটি ভোটাররা বিবেচনা করবেন।’

বিএনপির দায়িত্বশীল একজনের মতে, সরকার কৌশলগত কারণে দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে জেতার কৌশল কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেও ডিএনসিসিতে স্বাভাবিক ভোট বজায় রাখতে পারে। তবে, যেকোনও কৌশল নিলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে ক্ষমতাসীনদের জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে।’

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘বর্তমান স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে একমাত্র সমাধান হচ্ছে মানুষের কাছে ফিরতে হবে। আর মানুষের কাছে ফেরার একমাত্র পথ সুষ্ঠু নির্বাচন। আমরা সে কারণেই বারবার নির্বাচনেই থেকেছি। বর্তমান সরকার, নির্বাচন কমিশন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতীতে যে ভূমিকা পালন করেছে, তা অনেক ভয়ঙ্কর। এতকিছু জানার পরও আমরা ওই অনিয়মগুলো তুলে ধরতেই মানুষের কাছে যেতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখতে চাই, আওয়ামী লীগ পরিবারতন্ত্রের বাইরে আসবে, নাকি বাইরে আসবে না।’

ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) বিএনপির দফতর সম্পাদক সাইদুর রহমান মিন্টু বলেন, ‘পুরুষ কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আজ মোট মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে ২০০টি এবং মহিলা (সংরক্ষিত আসনে) মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে ৫০টি। আগামীকাল শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে বেলা ৩টা পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন ফরম উত্তোলন ও জমা দেওয়া যাবে।’

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর (উত্তর) দফতর সম্পাদক এবিএমএ রাজ্জাক বলেন, ‘পুরুষ কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আজ মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ১৫৯ জন। আর মহিলা (সংরক্ষিত আসনে) মনোনয়ন ফরম কিনেছেন ৩১ জন।’

ডিএনসিসিতে কি প্রার্থী দেবে জামায়াত?
ডিএনসিসিতে নির্বাচনে দুই দফায় জামায়াতের হয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন দলটির ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মো. সেলিম উদ্দিন। নতুন করে তার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা, এ নিয়ে এখনও নিশ্চিত কোনও তথ্য মেলেনি। তবে ডিএনসিসির মূল ও উপনির্বাচনে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। বিএনপির একাধিক নেতা জানান, এবারও জামায়াত প্রার্থী দেবে কিনা, দিলেও প্রত্যাহার করবে কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আগে। এ বিষয়ে মো. সেলিম উদ্দিনের যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আগামীকাল শুক্রবার বিকাল সাড়ে পাঁচটায় ২০ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

বিএনপি-জোটের একটি সূত্র জানায়, শুক্রবারের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রসঙ্গে আলোচনা হতে পারে। প্রথমত, গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জামায়াত যে দূরত্ব তৈরি করেছে, তা কেন, সে প্রসঙ্গটি তোলা হতে পারে। একইসঙ্গে জামায়াত জোটে নিষ্ক্রিয় থেকে অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চে’ কেন যুক্ত হলো, এর ওপর কথা তুলতে পারেন কোনও কোনও নেতা।

সূত্রের দাবি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগে জামায়াতের সম্মতি নিয়েছিল বিএনপি। এরপরও চলতি বছরজুড়ে কেন দূরত্ব রেখে চলেছে, সেই আলোচনাও উঠতে পারে।

জোটের একটি শরিক দলের চেয়ারম্যান বলেন, ‘অনেক দিন পর কয়েকটি পরিস্থিতি সামনে রেখে জোটের বৈঠক হবে। এতে রাজনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি সিদ্ধান্তমূলক কিছু থাকতে পারে। একইসঙ্গে ঢাকা সিটিতে ভোট করার বিষয়ে জামায়াতের মনোভাব জানা যেতে পারে।’

জামায়াতের একজন দায়িত্বশীল নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দলে নতুন আমির নির্বাচিত হয়েছে। সেক্রেটারি জেনারেলও নিযুক্ত হয়েছেন। ফলে, সিটি নির্বাচন বা বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় সিদ্ধান্তমূলক কোনও উদ্যোগ গ্রহণে নিশ্চিতভাবেই দলের শীর্ষনেতারা সময় নেবেন বলেও তিনি মনে করেন।