প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বিএনপি

প্রায় তিন বছর পর আগামী ৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় সফরে দিল্লিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তার ভারত সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে কী কী চুক্তি হয়, কোন বিষয়ে সমঝোতা হয় এবং রাজনৈতিকভাবে ভারত কী বার্তা দেয়—এসব বিষয়কে সামনে রেখে পর্যালোচনায় বসেছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ও দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের বক্তব্যের রেশ ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত সম্পর্কে বার্তা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের আগে অগ্রিম সফরে গিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় নিয়েছে বিএনপি। তার সফরে দুদেশের মধ্যে কী ধরনের চুক্তি হয়, কোন কোন বিষয়ে সমঝোতা হয় এবং চূড়ান্ত অর্থে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে উভয় দেশের সরকারের অবস্থান কী, এ নিয়ে নানামুখী পর্যবেক্ষণ চলছে বিএনপি নেতাদের মধ্যে।

বিএনপির চেয়ারপারসন কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য—সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে ভারতকে সুবিধা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে ক্ষমতাসীন দল বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। সেক্ষেত্রে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সফর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে বিএনপির বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হচ্ছে—আসন্ন নির্বাচনে দলের টিকে থাকার সর্বশেষ লড়াই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের কোনও সিদ্ধান্ত নিজেদের বিবেচনায় ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট’ না হলে সর্বোচ্চ বিরোধিতায় নামবে বিএনপি। এক্ষেত্রে দেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে ঐকমত্যে আসার চেষ্টা করা হবে।

দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এবং এ বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আলোচনায় বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও ভারত মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ নদী কমিশনের ৩৮তম বৈঠকের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

১২ বছর পর অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের পর বাংলাদেশের তরফে বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত জেআরসি বৈঠকে দুই দেশের অভিন্ন নদী বিশেষ করে গঙ্গা, তিস্তা, মনু, মুহুরী, খোয়াই, গোমতী, ধরলা, দুধকুমার এবং কুশিয়ারা সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া বন্যা সংক্রান্ত তথ্য ও তথ্যের আদান-প্রদান, নদীর তীর রক্ষার কাজ, সাধারণ অববাহিকা ব্যবস্থাপনা এবং ভারতীয় নদী আন্তসংযোগ প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা  হয়। জেআরসি বৈঠকে অন্তর্বর্তীকালীন পানিবণ্টন চুক্তির খসড়া কাঠামো তৈরির জন্য তথ্য ও তথ্য আদান-প্রদানের জন্য আরও কিছু অভিন্ন নদী চালু করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।’

বহুল আলোচিত তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত শেষ করার জন্য বাংলাদেশ পক্ষ অনুরোধ করেছে। ভারতীয় পক্ষ চুক্তিটি শেষ করতে তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার আশ্বাস দিয়েছে।’

শুক্রবার (২৬ আগস্ট) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘‘উভয় পক্ষ কুশিয়ারা নদীর অন্তর্বর্তীকালীন পানিবণ্টন বিষয়ে সমঝোতা স্মারকের পাঠ্য চূড়ান্ত করেছে। উভয় পক্ষই এই বিষয়ে ‘অক্টোবর ২০১৯’-এর বাংলাদেশ-ভারত সমঝোতা স্মারক অনুসারে, ত্রিপুরার সাব্রুম শহরের পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে ফেনী নদীর ওপর পানি গ্রহণের স্থানের নকশা এবং অবস্থানের চূড়ান্তকরণকে স্বাগত জানিয়েছে।’

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট যে তারা মনে করেন, বরাবরের মতো এবারও ভারতের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চিন্তা শুরু হয়েছে বিএনপিতে। এক্ষেত্রে ভারত প্রসঙ্গটি নির্বাচনের আগে একটি বিশেষ ‘টুল’ হিসেবে কাজে লাগানোর চিন্তা করছেন সিনিয়র নেতারা। আর এদিকটিকে সামনে রেখে সরকারবিরোধী সর্বদলীয় ঐক্য করতে সর্বোচ্চ ছাড় দেবে বিএনপি। এরইমধ্যে প্রাথমিক ইঙ্গিতও মিলেছে নানাদিক থেকে।

জাতীয় পার্টির একজন প্রভাবশালী নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। সে কারণে নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথাবার্তাও চালাচালি হচ্ছে জাতীয় পার্টির সঙ্গে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের শুক্রবার (২৬ আগস্ট) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও কথা হয়নি। পসিবিলিটি আছে, তবে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে বিষয়টি কোন দিকে গড়াবে।’

সর্বশেষ (১৯ আগস্ট) নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াছ আলীর ছেলে আবরার ইলিয়াছের বিয়েতে মির্জা ফখরুলের সঙ্গে পাশাপাশি ছিলেন জি এম কাদের। তাদের ওই সাক্ষাৎও রাজনীতিতে নতুন ইঙ্গিত দিয়েছে।

বিএনপির একজন প্রভাবশালী দায়িত্বশীল জানান, ভারত সফরের বিষয়টি ইস্যু হয়ে এলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে ইসলামি, বাম, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ছাড় দিয়ে সবাইকে একসঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করবে বিএনপি। ছাড়ের মধ্যে নির্বাচনি আসন, ক্ষমতার শেয়ারিং, সরকার গঠন, মন্ত্রিত্বসহ কার্যকর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর তারই ফলোআপ। তাদের এজেন্ডা তো প্রকাশিত, ক্ষমতায় থাকার এজেন্ডা। এ ধরনের হস্তক্ষেপ তো গণতন্ত্র রক্ষার নয়, বরং রেজিমকে টিকিয়ে রাখার হস্তক্ষেপ। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে হুমকি সৃষ্টি হলে অবশ্যই যেকোনও দেশপ্রেমিক দল, গণতান্ত্রিক দল ন্যাচারালি ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করবে।’

জাতীয় পার্টির সঙ্গে ঐক্য হওয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে যারাই সোচ্চার হবে, তাদের সঙ্গেই আমাদের আলোচনা হতে পারে।’