অবিলম্বে দলে ফিরতে চান অব্যাহতিপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি মনে করেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ভাঙার ষড়যন্ত্র চলছে। একইভাবে সরকারও নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘সুযোগ’ নিতে চাইবে। এ কারণে দলের অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বহিষ্কৃত নেতাদের দ্রুত দলে ফেরানো প্রয়োজন।
সোমবার (২ অক্টোবর) বিকালে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে নজরুল ইসলাম মঞ্জু এসব কথা বলেন। খুলনায় দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এনে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে লিখিত চিঠি ও সংবাদ সম্মেলন করার দায়ে ২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর অব্যাহতি পেয়েছিলেন এই নেতা।
১১ মাস নীরব থাকার পর গত বছরের ২২ অক্টোবর খুলনার বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে ওই বছরের ২০ অক্টোবর সক্রিয় হন মঞ্জু। এরপর থেকে অনুসারীদের নিয়ে দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় রয়েছেন তিনি।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনাকে আহ্বায়ক, তরিকুল ইসলাম জহিরকে ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক ও মো. শফিকুল আলম তুহিনকে সদস্য সচিব করে খুলনা মহানগরীতে নতুন কমিটি করে বিএনপি। প্রায় ২৯ বছর পর নগর কমিটির নেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়ে ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর অনুসারীদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। সেখানে তিনি নতুন কমিটি পুনঃমূল্যায়ন করার আহ্বান জানান। ওই সংবাদ সম্মেলনের পরই শোকজ করা হয় তাকে। তার জায়গায় আনা হয় বিএনপির প্রয়াত নেতা তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে।
সোমবার (২ অক্টোবর) বাংলা ট্রিবিউনের কাছে খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি মঞ্জু উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে বহিষ্কৃত ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত অনেককেই দলে ফেরানো হয়েছে। শুনতে পাচ্ছি, আমাদের খুলনার বিষয়টিও সামনে আসছে। তবে আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া দরকার।
খুলনায় এখনও অসংখ্য নেতাকর্মী দল থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বলে জানান সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বহু নেতাকর্মী বেদনার মধ্যে রয়েছেন। তারা দলের রাজনীতি করে, কিন্তু দলে তাদের নাম নেই। আমরা যারা ৪৪ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতি করি, খুলনায় বিএনপির রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছি, তাদের আজ কোনও দলীয় পরিচয় নেই। হাজার হাজার নেতাকর্মী, অনুসারী বেদনার মধ্যে বসবাস করছেন।’
‘দলে আমরা যারা অব্যাহতিপ্রাপ্ত, পদহীন, পদত্যাগী আছি, সবাই পরিস্থিতির শিকার’ বলে দাবি করেন মঞ্জু। ১৭ বছর ধরে দল ক্ষমতার বাইরে। অথচ ২০ বছরের কর্মীদের আমরা দলে জায়গা দিতে পারছি না। অনেকে আজীবনের নোটিশ পেয়ে গেছেন। তাদের ফেরাতে হবে। দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং আগামী দিনে ক্ষমতায় আসতে, দ্রুত নেতাকর্মীদের দলে ফেরাতে হবে।’
উল্লেখ্য, সাবেক ছাত্রদল নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু ১৯৮৮ সালে খুলনা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। এরপর ১৯৯৩ সালে মহানগরের সাধারণ সম্পাদক, ২০০৯ সালে আহ্বায়ক এবং ওই বছরেই সভাপতি হন তিনি। নজরুল ইসলাম মঞ্জু এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদলের রাজপথের সক্রিয় কর্মী ছিলেন।
১৯৮৫ সালের দিকে তিনি খুলনা মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক হন। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন মঞ্জু।
বিএনপি নেতা নজরুল ইসলামের ভাষ্য, ‘ওয়ান-ইলেভেনের মতো কঠিন বিরুদ্ধ সময়ে যারা দলের সংস্কারপন্থি ছিল, যাদের কারণে খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হয়েছে, তারেক রহমানকে জেলে যেতে হয়েছে, তাদের তো দলে ফেরানো হয়েছে। তাহলে এখন যারা সংগ্রাম করছে, তাদের কেন বাইরে রাখতে হবে। বিএনপি থেকে কেউ অসম্মানিত হয়ে, অবহেলার শিকার বা অমর্যাদার শিকার হয়ে যেন না যায়, সেদিকে শীর্ষ নেতৃত্বকে নজর দিতে হবে।’
‘কেন চলে যাবে, যেতে চাইলেই কি দিতে হবে যেতে’? এই প্রশ্ন রেখে নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘এটা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দায়িত্ব। বিএনপি ক্ষমতার নিয়ামক শক্তি। তিনবার দেশ শাসন করেছে, আগামী দিনেও করবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের পরিচিত বলয়ে আলোচনা আছে, দলে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে গত কয়েক বছরে কিছু নেতাকে বহিষ্কার বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এদের অব্যাহতি না দিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের আস্থায় নিলে দলই উপকৃত হতো বলে মনে করেন কোনও কোনও নেতা।
দলের একজন সিনিয়র নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে ভুল বুঝিয়ে দলের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা মঞ্জুকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্র বলছে, গত তিন থেকে চার মাসে অন্তত অর্ধশতাধিক বহিষ্কৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত তৃণমূল নেতাকর্মীকে বিএনপিতে ফেরানো হয়েছে। ২০১৯ সালের কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের বহিষ্কৃত ১৬ নেতাকেও দলে ফেরানো হয়েছে। আরও শতাধিক নেতাকর্মীকে দলের কার্যক্রমে ফেরানো নিয়েও কাজ করছে বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর বিভাগ।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদ-পদবি সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার ঘটনা থাকতে পারে। কিন্তু যারা দলে লেগে আছে, দলের আদর্শে, নীতিতে বিশ্বাস করে, ধৈর্য ধরতে সক্ষম—তারা তাদের মতো করেই জায়গা করে নেবেন দলে। দলে যারা সক্রিয় তারা ডেফিনেটলি দলে ফিরবেন। আর যারা হালুয়া রুটির ভাগ চায়, তারা তো আন্দোলনের আগেই সটকে পড়েছে।’